ঢাকা বুধবার, ২২ জুলাই ২০২৬

ডালাসের কান্না মুছল মেসির হাসিতে

ডালাসের কান্না মুছল মেসির হাসিতে
×

ছবি- এএফপি

সঞ্জয় সাহা পিয়াল, ডালাস থেকে

প্রকাশ: ২৪ জুন ২০২৬ | ০৮:২৪

বত্রিশ বছর আগের এক অভিশপ্ত জুন। এই টেক্সাসের ডালাস থেকেই সেদিন ডোপ টেস্টের খাঁড়ায় কাঁধের কাটা ডানার মতো রক্তাক্ত ও অশ্রুসিক্ত চোখে বিদায় নিয়েছিলেন ডিয়াগো আরমান্দো ম্যারাডোনা । ১৯৯৪ বিশ্বকাপে গোটা আর্জেন্টিনা সেদিন নিমেষেই ভেঙে পড়েছিল এক অতলান্ত বিষাদের কালো অন্ধকারে। নিয়তির কী অদ্ভুত চক্র, দীর্ঘ বত্রিশ বছর পর সেই ডালাসের মাঠ থেকেই ১৮ গোলের বিশ্বরেকর্ড গড়ে এক বুক চিলতে হাসি নিয়ে বীরের বেশে আর্বিভুত হলেন লিওনেল মেসি ! 

এদিন ম্যাচের পর মিডিয়া সেন্টার থেকেই বুয়েন্স আয়ার্সের  টেলিভিশন চ্যানেল ‘টেলিফি’ তাদের লাইভে নিয়ে এসেছিল ১৯৯৪ সালের সেই কান্নার প্রত্যক্ষদর্শী, ৯১ বছর বয়সী প্রবীণতম আর্জেন্টাইন সাংবাদিক এনরিকে মাকায়া মার্কেসকে।  ‘আমরা সেদিন ডালাসে কেঁদেছিলাম। আজ দিয়েগোর সেই অপূর্ণতা জুড়িয়ে দিয়ে লিও আমাদের হাসাল। ঈশ্বর ওকে দীর্ঘজীবী করুন, ও যেন এভাবেই এবার সবাইকে শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত আনন্দ দিয়ে যেতে পারে।’ মাকায়ার কথাগুলো অনুবাদ করেই শোনাচ্ছিলেন তাদের সাংবাদিক মিগুয়েল বোসিও।

বাংলাদেশি বলে এমনিতেই আপন ভাবে তারা। সেই তিনিই শোনাচ্ছিলেন সেবার বোস্টনে নাইজেরিয়ার বিপক্ষে ম্যাচের পর ম্যারাডোনার মুত্র পরীক্ষা করে ফিফা। এরপর এই ডালাস থেকেই ম্যারাডোনাকে নিষিদ্ব করা হয়, ডালাসে সেদিন হাঙ্গেরির বিপক্ষে খেলতে পারেননি তিনি। ম্যারাডোনার সেই কান্নাজরানো উক্তি ‘ ফিফা আমার পা দুটো কেটে নিল।’ আর্জেন্টা্ইন এই সাংবাদিক বলছিলেন আজ মেসির এই অর্জনে কেন তারা এতোবেশি খুশি।– ‘ ডালাসের ফুটবল ইতিহাসে এই ঘটনাই ছিল বত্রিশ বছর ধরে বয়ে বেড়ানো এক গভীর ক্ষত, যা এত বছর পর বর্তমান ২০২৬ বিশ্বকাপে মেসির হাসি আর বিশ্বরেকর্ড দিয়ে মোচন হলো।’ তার দাবি এখন আর্জেন্টিনার সঙ্গে অনেককে দেখা যায়, কিন্তু সেদিন তাদের পাশে কাউকে পাইনি তারা। তাই মেসিকে ঘিরে তাদের আহ্লাদ অনেক অনেক বেশি। আজ মেসির উন্নচল্লিশ তম জন্মদিন, এজন্য মিগুয়েলের চ্যানেল থেকে চারটি প্যানেল কানসাসে মেসিদের টিম হোটেলের সামনে অ্যাসাইন করে রাখা হয়েছে !

মেসির জন্মদিনে তারা কি উপহার দিতে পারে তা নিয়ে নিজেদের মধ্যেই যেন পাল্লাপাল্লিতে নেমেছে আর্জেন্টিনার মিডিয়াগুলো। কিন্তু তারা উপহার দেওয়ার আগেই যে মেসি নিজেই সবাইকে তার বার্থডে গিফট দিয়ে নিয়েছেন।  কাছ থেকে দেখা বলেই দাবি করা, এদিন ম্যাচের শুরু থেকেই দারুন এক প্রশান্তি কাজ করছিল তার মধ্যে। পুরো ম্যাচ জুড়েই তার ঠোঁটের কোণে লেগে রইল এক চিলতে মায়াবী হাসি। যেন তিনি কোনো ফুটবল ম্যাচ খেলতে নামেননি, নেমেছেন শৈশবের রোজারিও-র কোনো এক অলিতে-গলিতে স্রেফ আনন্দ কুড়াতে। ম্যাচে পেনাল্টি মিস করে কিছুটা বিরক্ত ছিলেন বটে, তবে জোড়া গোলে সেই  রাগ গলে একেবারে জল ! ম্যাচের পর মাঠের সাইড লাইনে বেশ কিছু টিভি চ্যানেলে সাবেক অধিনায়ক ও কোচেরা ধারাভাষ্য দিচছেলেন। সেই সাড়ি থেকে বাড়িয়ে দেওয়া কোচ ইয়াোর্গন ক্লপের বুকে আশ্রয় নিতে দেখা যায় মেসিকে। যেন ফিরে যান তার কুড়ি বছরের আগের দিন গুলোয়। ম্যাক্সি রদ্রিগেসের কাছে এগিয়ে আসেন, তার প্রথম বিশ্বকাপের কোচ হোসে পোকারম্যানকে জরিয়ে ধরেন প্রাপ্তির তৃপ্তিতে। এই পোকারম্যান সেই কোচ যিনি ২০০৬ বিশ্বকাপে কিশোর মেসির ওপর আস্থা রাখতে পারেননি। সেবার জার্মানির কাছে কোয়ার্টারে হেরে যাওয়া ম্যাচটিতে এক মিনিটের জন্যও মেসিকে নামানটি তিনি। মিডিয়া সেন্টারে আর্জেন্টাইন সাংবাদিক কুলে বলাবলি চলছিল– মেসির আজ মনটা খুব প্রশান্ত আছে, আজ এই বিশ্বকাপ গোলের রেকর্ড গড়ে তিনি অতীতের সব চাপা রাখা কস্ট ভুলে গেছেন,তা না হলে পোকারম্যানের কাছে ওভাবে এগিয়ে যেতেন না তিনি।

মেসি সত্যিই এদিন বোধহয় একটু বেশিই খোলামেলা ছিলেন। ম্যাচের পর অনেক্ষন গ্যালারির দিকে হাত নাড়িয়েছেন। মিক্সড জোনে এসে সাংবাদিকদের সঙ্গে প্রায় এক ঘন্টা আড্ডাচ্ছলে কথা বলেছেন। এই মেসিকে তার স্বদেশি সাংবাদিকরা খুব বেশি পান না। তাই এদিন মনের সব দরজা খুলে মেসির সঙ্গে কথা বলেছেন তারা। স্প্যানিশে বলা যার অনেক কিছুই তারা প্রকাশ বা প্রচার করেননি, যা করেছেন তাতেও মেসির চোখে মুখে শান্তির ছায়া ফুটে উঠেছিল। পেনাল্টি মিসের ক্ষোভ ঝেড়ে ফেলে মৃদু হেসে মেসি বললেন, ‘পেনাল্টি মিস করায় নিজের ওপর বড্ড রেগে গিয়েছিলাম। কিন্তু দল যেভাবে ঘুরে দাঁড়িয়ে নকআউট নিশ্চিত করল, তাতে আমি খুশি। আজ আমি সত্যিই খুব উপভোগ করেছি। সবশেষে আমি বড় শান্তিতে আছি।’  

লা পুলগা–এই নামেই তাকে ডেকে থাকেন আর্জেন্টাইনরা সংবাদমাধ্যমের মুখোমুখি হন। তাঁর পুরো বক্তব্য জুড়ে ছিল জাতীয় দলের টানা জয় এবং নিখুঁত পয়েন্ট টেবিল ধরে রাখার আনন্দ। ‘আজ এমন একটি মুহূর্ত ছিল যখন আমি প্রচণ্ড হতাশ ও ক্ষুব্ধ হয়ে পড়েছিলাম। পেনাল্টি মিস করার পর নিজের ওপরই ভীষণ রাগ হচ্ছিল, কারণ আমি শটটি খুব বাজেভাবে নিয়েছিলাম।’ তবে দলের ঘুরে দাঁড়ানো নিয়ে স্বস্তি প্রকাশ করে অধিনায়ক। ‘ সৌভাগ্যবশত আমরা পরিস্থিতি নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিতে পেরেছি, লিড নিয়েছি এবং ৩টি গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্ট পেয়েছি। ম্যাচটি অত্যন্ত তীব্র ও প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ ছিল। বিশ্বকাপের প্রতিটি ম্যাচই কঠিন। তবে আমরা আর্জেন্টিনা, আমরা সবসময় জেতার জন্যই মাঠে নামি।’  

টানা দুই ম্যাচে ৫ গোল করার পর ক্লোসার রেকর্ড ভাঙা নিয়ে জানতে চাইলে তিনি মৃদু হেসে বলেন, ‘ দলের জয় ও নকআউট নিশ্চিত হওয়াটাই আসল। এটি আমাদের আগামী সপ্তাহটি শান্তিতে কাটাতে সাহায্য করবে।’ কিছুটা কি পরের ম্যচে বিশ্রাম নেওয়ার ইঙ্গিত ? কিন্তু এটাও ঠিক যে সমর্থকদের আনন্দ দিতে তিনি কখনোই পিছপা হন না। তাই জর্ডানের বিপক্ষে এই ডালাসে পরের ম্যাচেও মেসির হাসি দেখার অপেক্ষা করা যেতে পারে। ‘আমরা ইতিমধ্যে মানুষকে অনেক আনন্দের উপলক্ষ দিয়েছি, তবে আমাদের চেষ্টা থাকবে সামনে তাদের আরও বেশি আনন্দ উপহার দেওয়ার’। এটাই বোধহয় জন্মদিনে মেসির প্রতিশ্রুতি।

আরও পড়ুন

×