ঢাকা বৃহস্পতিবার, ২৫ জুন ২০২৬

রোনালদোর সিংহ গর্জন, ‘আমি ফিরে এসেছি’

রোনালদোর সিংহ গর্জন, ‘আমি ফিরে এসেছি’
×

ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো

সঞ্জয় সাহা পিয়াল, ডালাস থেকে

প্রকাশ: ২৫ জুন ২০২৬ | ০৭:০৮

কঙ্গো ম্যাচের পর যারা ভেবেছিলেন, ৪১ বছরের এক বৃদ্ধের ফুটবল-অধ্যায়ের অবসান ঘটে গেছে, তারা আসলে প্রকৃতির এক পরম সত্য বিস্মৃত হয়েছিলেন। ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো তো কোনো ক্ষণস্থায়ী মোমবাতি নন যে নিন্দার সামান্য ফুঁতেই তাঁর আলো নিভে যাবে! তিনি এক জীবন্ত আগ্নেয়গিরির জ্বালামুখ; শান্ত অবয়ব দেখে বিভ্রান্ত হয়ে লোকে যাঁকে মাঝেমধ্যে ঘুমন্ত ভেবে ভুল করতে পারে, কিন্তু তিনি মৃত নন। 

হিউস্টনের এনআরজি স্টেডিয়ামের আকাশ সাক্ষী রেখে উজবেকিস্তানের বিরুদ্ধে সেই ঘুমন্ত লাভারই এক রুদ্র মহাবিস্ফোরণ দেখল ফুটবলবিশ্ব। টানা ছয়টি বিশ্বকাপে গোল করার এক অলৌকিক পারিজাতকে দেখল সবাই। ম্যাচ শেষে ক্যামেরার সামনে মুখ নিয়ে তাঁর সেই উদ্ধত সিংহ গর্জন– ‘আই অ্যাম ব্যাক! আই অ্যাম ব্যাক!’ যারা কিছুদিন আগেও তাঁকে ‘দলের স্ট্যাচু’ বলেছিলেন, সেসব ব্রিটিশ সাংবাদিকের উদ্দেশেই কি তাঁর এই ক্ষোভ উগরে দেওয়া? ম্যাচের পর মিক্সড জোনে শান্ত হয়েও নীরব ছিলেন না রোনালদো। ‘এটি এই জন্য বলা, যাতে মানুষ ভুলে না যায়...।’ এদিন তিনি কেবল বক্সে দাঁড়িয়ে না থেকে যেভাবে উইং ও মিডফিল্ডে নেমে এসে স্পেস তৈরি করেছেন, তা কোনো জড়মূর্তির পক্ষে সম্ভব নয়।

এই ম্যাচের ষষ্ঠ মিনিটেই ইতিহাসের পাতায় নিজের নাম অমর করে নেন সিআরসেভেন। জোয়াও ক্যানসেলোর নিখুঁত পাস থেকে বল জালে জড়িয়েই প্রথম ফুটবলার হিসেবে টানা ছয়টি বিশ্বকাপে গোল করার অবিশ্বাস্য রেকর্ড গড়েন তিনি। ৩৯ মিনিটে ব্রুনো ফার্নান্দেজের পাস থেকে করলেন নিজের দ্বিতীয় গোল। এই জোড়া গোলের সুবাদে পর্তুগালের হয়ে বিশ্বকাপে কিংবদন্তি ইউসেবিওর ৯টি গোলের রেকর্ড টপকে ১০টি গোল নিয়ে দেশের হয়ে সর্বোচ্চ গোলদাতা এখন ক্রিশ্চিয়ানো। ৪১ বছর ১৩৮ দিন বয়সে গোল করে রজার মিলারের পর বিশ্বকাপের ইতিহাসের দ্বিতীয় বয়োজ্যেষ্ঠ গোলদাতাও এখন তিনিই। দাম্ভিকতা তাই তাঁকেই মানায়। 

‘আমি সব সময় ফিরে আসি। কখনও একটু দেরিতে আসি। তবে আমি সব সময়ই সেখানে থাকি। গত সপ্তাহটা খুব কঠিন ছিল, একটা অন্ধকার সময় পার করেছি। মনে হচ্ছিল, লোকে যেন আমাকে ফুটবল থেকে আগেই অবসর দিয়ে ফেলেছে! তবে আমি ধরে রেখেছিলাম, হাল ছাড়িনি। কারণ, অন্য যে কোনো কিছুর চেয়ে আমি কঠোর পরিশ্রমে বেশি বিশ্বাস করি।’ 

প্রত্যাখ্যানের অধিকারও তাঁকেই মানাই। বারবার মেসির নাম বলে তাঁকে যে খোঁচা দেওয়া হয়, সেটি ভালো করেই জানেন তিনি। তাই এদিন ম্যাচের পর মিক্সড জোনে নকআউট পর্বে সম্ভাব্য মেসি-রোনালদো দ্বৈরথ নিয়ে এক সাংবাদিক প্রশ্ন করলে সৌজন্যতার মধ্যে নিজেকে আটকে রাখেন। ‘আপনাকে কী উত্তর দেব, বুঝতে পারছি না। কারণ, এটি একটি অদ্ভুত প্রশ্ন। এর কোনো অর্থ হয় না।’ তারপর আর ধৈর্য ধরে রাখতে পারেননি। এক সাংবাদিক বিশ্বকাপে মেসির দুর্দান্ত ফর্মের কথা তোলার সঙ্গে সঙ্গেই রোনালদো তাঁর মাথা ঘুরিয়ে প্রশ্ন শেষ করতে না দিয়েই অন্য সাংবাদিককে ইশারা করেন এবং কড়া সুরে বলেন, ‘নেক্সট কোয়েশ্চেন! (পরের প্রশ্ন করুন)।’ আজ এত বছর পরও যে মেসি-রোনালদো দ্বৈরথ চলছে, সেটিই যেন সবার সামনে প্রকাশ্যে এনে দিলেন রোনালদো।

আসলে এদিন দলের আগ্নেয়গিরির মুখ খুলে দিতে একটু কৌশলে বদল এনেছিলেন কোচ রবার্তো মার্টিনেজ। সিলভাকে বেঞ্চে বসিয়ে হুয়াও ফেলিক্সকে নামানো এবং আক্রমণভাগে গতি বাড়ানোই ছিল পর্তুগালের মূল চাবিকাঠি। নুনিও মেন্দেস ও ক্যানসেলো যখনই উইং দিয়ে ওভারল্যাপ করছিলেন, উজবেক রক্ষণভাগ তখন ফুলব্যাকদের সামলাতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। ঠিক এই জায়গাতেই তৈরি হয় রোনালদোর প্রিয় ‘স্পেস’। প্রথমার্ধের ১৭ মিনিটে মেন্দেসের বুদ্ধিদীপ্ত ফ্রি-কিক গোলটির সময় রোনালদো নিজেই ‘ডেকয়’ বা ফাঁদ হিসেবে দাঁড়িয়ে উজবেক ডিফেন্ডারদের বিভ্রান্ত করেন, যার সুবিধা নেয় দল। 

রোনালদো এই ম্যাচে আর প্রথাগত ‘নাম্বার নাইন’ হয়ে বক্সে দাঁড়িয়ে থাকেননি; বরং কিছুটা নিচে নেমে বল রিসিভ করেছেন, যার ফলে উজবেকিস্তানের ফ্যাব্রিও ক্যানাভারোর রক্ষণভাগ তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ে।

ম্যাচ শেষে ফুটবলবিশ্বের পণ্ডিতরাও রোনালদোর এই কামব্যাক দেখে স্তব্ধ। ধারাভাষ্যকার ড্যারেন ফ্লেচার ও ওয়েন হারগ্রিভস যেমন বলছিলেন, ‘রোনালদোকে যারা বাতিলের খাতায় ফেলে দিয়েছিল, তারা ফুটবলীয় মানসিকতাকেই বোঝে না। ৪১ বছর বয়সেও এই তীব্র ক্ষুধা কেবল তাঁর পক্ষেই সম্ভব।’ পর্তুগিজ যুবরাজ বুঝিয়ে দিলেন, ফুটবল মাঠে বয়স কেবল একটা সংখ্যা মাত্র। পর্তুগাল শিবির এখন টগবগ করে ফুটছে, আর তার কেন্দ্রবিন্দুতে জ্বলজ্বল করছেন সেই একই অবাধ্য ধ্রুবতারা– ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো!

আরও পড়ুন

×