ঢাকা শুক্রবার, ০৩ জুলাই ২০২৬

আর্জেন্টিনার আভিজাত্যের সামনে কেপ ভার্দের অদম্য জেদ

আর্জেন্টিনার আভিজাত্যের সামনে কেপ ভার্দের অদম্য জেদ
×

ছবি- এএফপি

সঞ্জয় সাহা পিয়াল, মায়ামি থেকে

প্রকাশ: ০৩ জুলাই ২০২৬ | ০৯:২০ | আপডেট: ০৩ জুলাই ২০২৬ | ০৯:২২

আটলান্টিক তীরের মায়ামি, কী সেই নীল! যেন কোনো রূপকথার রাজকন্যার চোখের অতল গভীরতা। সেই নীল জলরাশি যখন অবিরাম গর্জনে আছড়ে পড়ে সাদা বালুর বুকে, তখন মনে হয় সমুদ্র যেন ফিসফিসিয়ে কোনো এক গোপন প্রেমের উপাখ্যান শোনাচ্ছে এই শহরকে। সারি দেওয়া নারকেল আর পাম গাছের অলস দাঁড়িয়ে থাকা দেখলে মনে হয়, ওরা যেন কোনো এক চিরন্তন ছুটির আমেজে বুঁদ হয়ে অনন্তকাল ধরে পাহারা দিচ্ছে এই তপ্ত বালুকাবেলাকে।

এই শহরেই আজ অবশ্য অন্য এক চড়া সুর, বাতাসে ফুটবল রোমাঞ্চের সুবাস। একদিকে ফুটবল ইতিহাসের সমৃদ্ধ ও পরাক্রমশালী সাম্রাজ্য আর্জেন্টিনা, যাদের পায়ে বিশ্বজয়ের গৌরব। অন্যদিকে আটলান্টিকের ওপর ভেসে থাকা আফ্রিকার মাত্র পাঁচ লাখ জনসংখ্যার এক চিলতে দ্বীপরাষ্ট্র কেপ ভার্দে, যাদের সম্বল শুধুই বুকভরা স্বপ্ন আর অদম্য জেদ। কোটি কোটি ভক্তের আকাশছোঁয়া প্রত্যাশা নিয়ে লিওনেল মেসিরা যখন মাঠের সবুজ ঘাসে পা রাখবেন, তখন ‘ব্লু শার্কস’ নামে পরিচিত আফ্রিকান ছেলেরা চাইবে এই উৎসবের শহরে নিজেদের রূপকথাটা লিখে রাখতে। সাগরের ঢেউয়ের মতোই মেসিদের পরাক্রমের জয়গান নাকি ভোজিনহার ছোট দ্বীপের স্বপ্নের উথাল-পাথাল– তা দেখার অপেক্ষায় ফুটবলবিশ্ব।

কাগজে-কলমে এটি কেবল এক অসম লড়াই-ই নয়, বরং ফুটবল ইতিহাসের এক সম্পূর্ণ অনাবিষ্কৃত অধ্যায়। আন্তর্জাতিক ফুটবলের কোনো মঞ্চে, এমনকি কোনো প্রীতি ম্যাচেও এর আগে আর্জেন্টিনার মুখোমুখি হয়নি কেপ ভার্দে। ফলে মায়ামির হার্ড রক স্টেডিয়ামে যা-ই ঘটবে, তা-ই দুই দেশের ফুটবল ইতিহাসে একদম নতুন রেকর্ড হিসেবে লেখা থাকবে। ফিফা র‍্যাঙ্কিংয়ের খটখটে সংখ্যা বিচারে দুই দলের মধ্যে আকাশ-পাতাল তফাত; একদিকে র‍্যাঙ্কিংয়ের দুই নম্বর আসনে বসা বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা, অন্যদিকে ৬৪ নম্বরে থাকা আফ্রিকার এক চিলতে কেপ ভার্দে।

কিন্তু চলতি বিশ্বকাপের গ্রুপ পর্বে এই ‘ব্লু শার্কস’রা যে লড়াকু গল্পটা লিখেছে, তা যে কোনো বড় দলের জন্য গুরুতর সতর্কবার্তা। নিজেদের প্রথম বিশ্বকাপেই স্পেন, উরুগুয়ে এবং সৌদি আরবের মতো কঠিন প্রতিপক্ষদের নিয়ে গঠিত গ্রুপ ‘এইচ’ থেকে কোনো ম্যাচ না হেরে অপরাজিত রানার্সআপ হিসেবে শেষ বত্রিশে জায়গা করে নিয়েছে তারা। দেশটির প্রেসিডেন্ট হোসে মারিয়া নেভেস বিবিসিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তো বলেই দিয়েছেন তা। ‘আমরা এই বিশ্বকাপে নিজেদের ভাগ্য নিজেরা লিখতে এসেছি, আর তা হলো চ্যাম্পিয়নদের মুখোমুখি হওয়া। আমরা একই মানসিকতা, জেদ এবং জয়ের ক্ষুধা নিয়ে মেসি ও আর্জেন্টিনার সামনে দাঁড়াব। আমি মনে করি কেপ ভার্দে আর্জেন্টিনাকে ১-০ গোলে হারাতে পারে। আমরা এখানে জিততেই এসেছি।’

তবে এসব তো বলতেই হয়, তিনি নিশ্চয় বলবেন না যে এই ম্যাচটি তারা হারতে পারেন। তবে আর্জেন্টিনা প্রতিপক্ষ নিয়ে সতর্ক। কেপ ভার্দের চেয়েও তাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ হলো ম্যাচটি শেষ ষোলোতে যাওয়ার নকআউট পর্ব। সেখানে কোচ স্কালোনির অতীত অভিজ্ঞতা বলে র‍্যাঙ্কিংয়ের এমন নিচু সারির দলগুলোর বিপক্ষে মাঠের নিয়ন্ত্রণ পুরোপুরি নিজেদের হাতে রাখার জন্য খুবই আক্রমণাত্মক ও কৌশলগতভাবে আধিপত্য বিস্তারকারী ছক বেছে নেয়। প্রথম মিনিট থেকেই বলের দখল (সাধারণত ৭০% বা এর বেশি) নিজেদের পায়ে রাখতে পছন্দ করে।

ছোট ছোট নিখুঁত পাসে প্রতিপক্ষকে চারপাশ থেকে তাড়া করে তারা। যার মূল উদ্দেশ্য হলো ছোট দলগুলোকে বলের পেছনে ছুটিয়ে শারীরিকভাবে ক্লান্ত করে ফেলা এবং তাদের রক্ষণভাগে ফাটল ধরানো। ছোট দলগুলো সাধারণত নিজেদের বক্সে ডিফেন্সিভ দেয়াল তুলে কাউন্টার-অ্যাটাকে ওঠার চেষ্টা করে। স্কালোনি এই ছক ভাঙতে ‘কাউন্টার-প্রেসিং’ ব্যবহার করেন। আর্জেন্টিনা আক্রমণভাগে বল হারালেই মেসি, আলভারেজ বা লাউতারোরা প্রতিপক্ষের ডিবক্সের ঠিক বাইরেই প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি করেন, যাতে ছোট দলগুলো পাল্টা আক্রমণের জন্য বল পাস করার কোনো সুযোগই না পায়।

এসবই আজ কেপ ভার্দের বিপক্ষে চালাতে পারেন স্কালোনি। তবে নিশ্চয় তা বলেকয়ে নয়। বরং কেপ ভার্দের প্রতি সম্মানই দেখিয়েছেন তিনি সংবাদ সম্মেলনে। ‘কেপ ভার্দে নকআউটে কোয়ালিফাই করায় আমি মোটেও অবাক হইনি। তারা গ্রুপ পর্বে নিজেদের প্রতিটি প্রতিপক্ষের জীবন কঠিন করে তুলেছিল। তারা অত্যন্ত শক্ত এক প্রতিপক্ষ এবং আমাদের বিপক্ষেও ওরা মাঠের জীবন কঠিন করে তুলবে। তারা টুর্নামেন্টের অন্যতম ফেভারিট স্পেনকে হতাশ করেছে। উরুগুয়ে কিংবা সৌদি আরবও ওদের হারাতে পারেনি। এ থেকেই তাদের দলগত শক্তিমত্তা এবং আত্মবিশ্বাস সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যায়।’ বরং দলের খেলোয়াড়দের সতর্ক করে দিয়েছেন তিনি এই ছোট্ট ডিনামাইট থেকে বাঁচতে।

‘এবারের বিশ্বকাপে আমরা যা দেখছি, সেই অনুযায়ী আমাদের অত্যন্ত সাবধান থাকতে হবে। ওরা বেশ দ্রুতগতির ফুটবল খেলে এবং ওদের দলে ভালো গুণগত মানের খেলোয়াড় রয়েছে।’

তবে প্রতিপক্ষর চেয়েও আর্জেন্টিনার বেশি অস্বস্তি কিন্তু এই মায়ামিকে নিয়েই। এখানকার প্রচণ্ড গরম আর আর্দ্রতা নিয়ে পর্যটকদের আহ্লাদ থাকতে পারে, ফুটবলারদের জন্য অন্তত তা নয়। এর আগে ডালাসে দুটি ম্যাচই মেসিরা খেলেছেন ছাদঢাকা স্টেডিয়ামে। সেখানে ‘হাইড্রেশন ব্রেক’ ছিল কেবলই কোচের সঙ্গে খেলোয়াড়দের কথা বলে কৌশল ঝালিয়ে নেওয়ার। কিন্তু মায়ামির এই ভ্যাপসা গরমে সেই ব্রেকটা বাস্তবিক অর্থেই কাজে লাগবে।

‘মায়ামির স্থানীয় সময় বিকেল ৭টার কিক-অফ বোঝা কিছুটা কঠিন, কারণ ওই সময়ে ফ্লোরিডায় প্রচণ্ড গরম ও আর্দ্রতা থাকবে। তবে এটা নিয়ে অজুহাত দেওয়ার কিছু নেই, কারণ সব দলই প্রায় একই পরিস্থিতির মুখোমুখি হচ্ছে।’ মায়ামির লোনা বাতাসে আর্দ্রতার যে চড়া সুর, তা ফুটবলারদের শরীরের শেষ রক্তবিন্দু পর্যন্ত পরীক্ষা নেবে ঠিকই, কিন্তু মাঠের আসল সৌন্দর্য বোধহয় লুকিয়ে থাকবে মেসি-ভোজিনহাদের লড়াইয়ে।

আরও পড়ুন

×