ঢাকা শনিবার, ০৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬

প্যারাগুয়ের ভাষাতেই জবাব এমবাপ্পের

প্যারাগুয়ের ভাষাতেই জবাব এমবাপ্পের
×

সঞ্জয় সাহা পিয়াল, মায়ামি থেকে

প্রকাশ: ০৬ জুলাই ২০২৬ | ০৯:২৯

আমেরিকার ২৫০তম জন্মদিনে ফিলাডেলফিয়ার মাঠজুড়ে যখন টমাস জেফারসনদের সেই ঐতিহাসিক ‘স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র’ উন্মোচিত হচ্ছে, গ্যালারিতে ১৭৭৬ সালের কায়দায় পরচুলা পরে বসে আছেন মার্কিনিরা। তখনই কিনা ১০০ ডিগ্রি ছোঁয়া কড়া রোদে দিদিয়ের দেশমের ফরাসি দল প্যারাগুয়ের লাতিন ডিফেন্সের কাছে ‘পরাধীনতার দলিলে’ সই করতে চলেছে! বিশ্রী সব ট্যাকল, ধাক্কাধাক্কি, ফাউল। গোল হচ্ছে না কোনোভাবেই, একে একে মেজাজ হারাচ্ছেন ফরাসি ফুটবলাররা, ডাগআউটের সামনে প্রচণ্ড বিরক্ত তাদের কোচ। তেমনই শিকল বাঁধা মুহূর্তে ‘প্যারাগুয়ের ভাষাতেই’ যেন জবাব দিলেন এমবাপ্পে। ফাউল থেকে পেনাল্টি পেয়েই গোল করলেন তিনি। ১-০ গোলের এই জয় শুধু ফ্রান্সকে কোয়ার্টার ফাইনালের টিকিটই এনে দিল না; সঙ্গে এটিও মনে করিয়ে দিল যে তারা গত চারটি বিশ্বকাপের সবকটিতে এই শেষ আটে জায়গা পাওয়া একমাত্র দল। তবে প্যারাগুয়ের একগুঁয়েমি উপেক্ষা করার পর এবার তাদের সামনে আফ্রিকার পাওয়ার হাউস মরক্কো। সেখানেও যে দেয়াল ভাঙার খেলা খেলতে হবে, সেটি জানেন এমবাপ্পে।

প্যারাগুয়ের সঙ্গে ম্যাচটি জিতলেও সেখানে চেনা ফরাসি সৌরভ ছিল না; বরং শারীরিক শক্তি প্রদর্শনের কুৎসিত একটি ম্যাচ দেখেছে ফিলাডেলফিয়ার গ্যালারি। পুরো ম্যাচে ২৪টি ফাউল হয়েছে, তিন-তিনটি হলুদ কার্ড দেখেছে ফ্রান্স– ব্র্যাডলি বারকোলা, মানু কোনে ও মাইকেল অলিসে, যা কিনা নকআউট পর্বে ফরাসিদের জন্য অস্বস্তিকর। ম্যাচ শেষে মিক্সড জোনে এসে অধিনায়ক এমবাপ্পে প্যারাগুয়েকে নিয়ে কটাক্ষও করেছেন, ‘ওরা ভেবেছিল, আমরা মাঠে স্যুট-টাই পরে নামব, চমৎকার সব ওয়ান-টু পাস আর চোখধাঁধানো ফুটবল খেলব। আমরা ওদের বুঝিয়ে দিয়েছি, জেতার জন্য যদি আমাদেরও নোংরা ফুটবল খেলতে হয়, আমরা তাতেও রাজি! এ নিয়ে আমাদের কোনো দ্বিধা নেই।’
প্যারাগুয়ে মাঠে নেমেছিল স্পষ্ট এক ধ্বংসাত্মক স্ট্র্যাটেজি নিয়ে– বল পজেশন ফরাসিদের পায়ে ছেড়ে দাও; কিন্তু নিজেদের বক্সের সামনে এমন এক নিশ্ছিদ্র লাতিন মানবপ্রাচীর তুলে ধরো, যেখানে কিলিয়ান এমবাপ্পে বা উসমান দেম্বেলের গতি এক নিমেষে গতিহীন হয়ে পড়ে। প্রথমার্ধজুড়ে সেই ছকটাই কাজ করছিল নিখুঁতভাবে। ফরাসি আক্রমণভাগের সমস্ত ধার তখন প্যারাগুয়ের ওই অমানবিক শারীরিক আর মারকুটে ফুটবলের দেয়ালে ধাক্কা খেয়ে ফিরে আসছিল। ঠিক যখন মনে হচ্ছিল, লাতিন জেদের কাছে ইউরোপীয় অহংকার আজ ধুলোয় মিশবে, তখনই প্যারাগুয়ের ডিফেন্সের ওই একমুহূর্তের অসতর্কতা আর বক্সের ভেতর ফাউল। ফ্রান্স কাল প্রমাণ করেছে, শুধু নান্দনিক ফুটবলই নয়; প্রতিপক্ষের মারকুটে ও নোংরা ফুটবলকে তাদেরই ভাষাতে জবাব দিয়ে ম্যাচ ছিনিয়ে আনার অমোঘ ইস্পাতকঠিন স্নায়ুটাও এই ফরাসি সাম্রাজ্যের বড্ড চেনা।

আসলে এদিন মেসির সমান ৭ গোল করার বাড়তি আনন্দ থাকার কথা ছিল এমবাপ্পের। কিন্তু সেখানে ম্যাচ শেষে প্রচণ্ড রাগান্বিত দেখায় তাঁকে। তার কারণও অবশ্য রয়েছে।

ম্যাচের পর প্যারাগুয়ের গোলরক্ষক ওল্যান্ডো গিল যখন করমর্দনের জন্য হাত বাড়ান, ফরাসি অধিনায়ক কিলিয়ান এমবাপ্পে তখন সেই রাজকীয় সৌজন্যকে এক নির্মম অবহেলায় উপেক্ষা করে সতীর্থদের জড়িয়ে ধরেন। এই একটা খণ্ডচিত্রই যেন লাতিনদের ড্রেসিংরুমের বারুদ বাক্সে দেশলাই কাঠি ছুঁয়ে দেয়! মেজাজ হারিয়ে প্যারাগুয়ের গোলরক্ষক তখন এমবাপ্পের পিঠ লক্ষ্য করে বল ছোড়েন, মুহূর্তের মধ্যে দুই দলের রিজার্ভ বেঞ্চ ফাঁকা হয়ে প্লেয়াররা আছড়ে পড়লেন মাঝমাঠে একে অন্যের সঙ্গে তর্ক-বিতর্কে। ফুটবল ম্যাচ তো নয়, ফিলাডেলফিয়ার সবুজগালিচা তখন যেন এক আদিম গ্যাং-ওয়ারের কদর্য রূপ ধারণ করে! দিদিয়ের দেশম ও নিরাপত্তাকর্মীদের মরিয়া হস্তক্ষেপে শেষ পর্যন্ত বুড়ো বাঘদের ওই মরণকামড় থামানো যায় ঠিকই; কিন্তু মাঠ ছাড়ার সময় এমবাপ্পের ঠোঁটের কোণের ওই উদ্ধত হাসি বাকি বিশ্বকে স্পষ্ট বুঝিয়ে দিয়ে যায়– সম্রাটকে ছুঁতে হলে শুধু পায়ের ফুটবল নয়, বুকের পাটাও লাগে।

আরও পড়ুন

×