ঢাকা শুক্রবার, ১০ জুলাই ২০২৬

সবুজ ক্যানভাসে আজ লাল কবিতার লড়াই

সবুজ ক্যানভাসে আজ লাল কবিতার লড়াই
×

সঞ্জয় সাহা পিয়াল, কানসাস সিটি থেকে

প্রকাশ: ১০ জুলাই ২০২৬ | ০৭:৩৫

লস অ্যাঞ্জেলেস– বাতাসেই তো সিনেমা সিনেমা গন্ধ! স্টেডিয়ামের পাশেই যেখানে অস্কারের রেড কার্পেট, হলিউডের ক্যামেরার ফ্ল্যাশ আর ব্লকবাস্টার সিনেমার রোমাঞ্চ। যেখানে প্রতিদিন লেখা হয় রোমাঞ্চ আর সাসপেন্সের দুর্দান্ত সব চিত্রনাট্য, সেখানে আজ রাতে সিলভার স্ক্রিনে নয়; ফুটবল দুনিয়ার ব্লকবাস্টার সিনেমাটি মঞ্চস্থ হতে যাচ্ছে ইঙ্গলউডের সোফি স্টেডিয়ামে। লাইট, ক্যামেরা আর অ্যাকশনের দুনিয়ায় সেমিফাইনালে ওঠার লড়াইয়ে আজ মুখোমুখি ইউরোপের দুই সুপারস্টার স্পেন ও বেলজিয়াম। ফিফা র‍্যাঙ্কিংয়ের ৩ আর ৯। যেখানে অদ্ভুত এক সমাপতনে দুই দলের জার্সির রংই লাল। যদিও সেই দুই রক্তিমের ভেতরের দর্শন সম্পূর্ণ আলাদা।

একদিকে স্পেনের ‘লা রোজা’। তাদের ফুটবল আসলে বুট জুতায় লেখা পাবলো পিকাসোর জ্যামিতিক কবিতা। ছোট ছোট পাসের সেই চেনা ‘তিকিতাকা’ যেন ইয়ামাল-পেদ্রোদের কোনো ধ্রুপদি সিনেমা– ধীরে ধীরে জাল বুনে প্রতিপক্ষকে সম্মোহিত করে খুন করা। ঠিক উল্টোদিকে বেলজিয়ামের ‘রেড ডেভিলস’। তাদের খেলা মানেই লস অ্যাঞ্জেলেসের হাই-অকটেন অ্যাকশন থ্রিলার। মাঝমাঠ থেকে কেভিন ডি ব্রুইনার মগজাস্ত্র যখন নিখুঁত থ্রু-বল বাড়ায়, তখন বেলজিয়ান ফরোয়ার্ডদের কাউন্টার অ্যাটাকের গতি পর্দায় জঁ-ক্লদ ভ্যান ড্যামের মারদাঙ্গা অ্যাকশনকেও হার মানাতে চায়। হলিউডের এই তারকাময় মঞ্চে আজ পাসের রোমান্স শেষ হাসি হাসবে, নাকি কাউন্টারের নিখুঁত সার্জারি শেষ ষোলোর বৈতরণী পার করাবে? সোফাইয়ের থিয়েটারে কোন লাল কবিতা আজ অস্কারজয়ী ব্লকবাস্টারের মর্যাদা পাবে– দেখার অপেক্ষায় তা ফুটবলবিশ্ব।

চলতি বিশ্বকাপের পারফরম্যান্সের গ্রাফটা যদি সামনে রাখা যায়, সেখানে লড়াইটা আসলে এক নির্মম ‘ক্লিনিক্যাল’ মেশিনের সঙ্গে এক খামখেয়ালি রাজপুত্রের! স্পেনের এই টুর্নামেন্ট শুরু হয়েছিল কেপ ভার্দের বিরুদ্ধে গোলশূন্য ড্রয়ের একঘেয়েমি দিয়ে। কিন্তু ওটাই তো লা ফুয়েন্তের সেই চেনা স্প্যানিশ তত্ত্ব– আগে প্রতিপক্ষকে মেপে নাও, তারপর কামড় বসাও! সেই মন্থর শুরুর পর স্পেন যা খেলছে, তা স্রেফ প্রতিপক্ষকে পিষে ফেলার নিখুঁত মহড়া। টানা চার ম্যাচ জয়; জালে জড়িয়েছে ৯টি গোল আর নিজেদের গোলবক্সের চারপাশে এমন এক দুর্ভেদ্য দেয়াল তুলেছে যে আজ পর্যন্ত কোনো প্রতিপক্ষ সেখানে একটা আঁচড়ও কাটতে পারেনি! শেষ ষোলোর ডার্বিতে ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোর পর্তুগালকে যেভাবে ইনজুরি টাইমের শেষ সেকেন্ডে মিকেল মেরিনোর ওই এক মরণ-ছোবলে বিদায় করল, তাতেই প্রমাণিত– এই স্পেনের স্নায়ু লোহার চেয়েও শক্ত! আর অন্য প্রান্তে বেলজিয়াম? গ্রুপে পর্বে যারা খাদের কিনারা থেকে হেঁচড়াতে হেঁচড়াতে কোনোমতে নকআউটে উঠেছিল, তারা আচমকাই শেষ ষোলোর মঞ্চে যেন ভোল বদলে ফেলল! ঘরের মাঠে টগবগ করে ফুটতে থাকা স্বাগতিক যুক্তরাষ্ট্রকে যেভাবে ৪-১ গোলে ফালা ফালা করে দিল রেড ডেভিলরা, তা এককথায় অবিশ্বাস্য! এই মুহূর্তে বেলজিয়ান ফুটবলের সবচেয়ে বড় পোস্টার বয় চার্লস ডি কেটেলারা! লুকাকু যখন অফ ফর্মে বা সাইডবেঞ্চে, তখন এই তরুণ ফরোয়ার্ডই হয়ে উঠেছেন রেড ডেভিলদের প্রধান সংহারক। শেষ ষোলোর নকআউটে স্বাগতিক যুক্তরাষ্ট্রের রক্ষণভাগকে একা হাতে তছনছ করে যে জোড়া গোল তিনি করেছেন, তা এককথায় অসামান্য। স্পেনের ডিফেন্সের জন্য সবচেয়ে বড় মাথাব্যথার কারণ হতে যাচ্ছেন এই তারকা। অন্যদিকে থাকছেন লিয়ান্দ্রো ট্রোসার্ড। এই ফরোয়ার্ডকে বলা যায় বেলজিয়ামের সাইলেন্ট কিলার। গ্রুপ পর্বের শেষ ম্যাচে নিউজিল্যান্ডকে ৫-১ গোলে ওড়ানোর ম্যাচে তাঁর জোড়া গোলই বেলজিয়ামকে গ্রুপের গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন করেছিল। উইং ধরে ওপরে উঠে আসা এবং ডি-বক্সের ঠিক বাইরে থেকে ডান পায়ের শটে গোল করার যে সহজাত দক্ষতা তাঁর আছে, তা স্প্যানিশ গোলরক্ষকের জন্য বড় পরীক্ষা হতে যাচ্ছে।

যদিও অতীত বলে, স্পেনের চেয়ে ঢের পিছিয়ে বেলজিয়াম। ৪৬ বছর আগে, সেই ১৯৮০ সালের ইউরো কাপে শেষবারের মতো স্পেনকে হারাতে পেরেছিল তারা! তার পর থেকে কেটে গেছে সাড়ে চার দশকের বেশি সময়। বিশ্ব ফুটবলের মানচিত্র বদলে গেছে, কিন্তু লা রোজাদের বিরুদ্ধে রেড ডেভিলদের জয়ের খাতাটা আজও শূন্য! দুই দলের মোট ২২ বারের মুখোমুখি দেখায় ১২ বার জিতেছে স্পেন, পাঁচটি ড্র আর বেলজিয়ামের জয় মোটে পাঁচটিতে; যার সিংহভাগই সেই প্রাক-আধুনিক যুগের প্রাগৈতিহাসিক রেকর্ড! তবে বিশ্বকাপে দুই দলের লড়াইয়ের ইতিহাসটা (১টি করে জয় ও ড্র) আবার এক অদ্ভুত সমান্তরালে দাঁড়িয়ে। ১৯৮৬-এর মেক্সিকো বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে এই বেলজিয়ামই টাইব্রেকারে স্পেনকে কাঁদিয়ে সেমিফাইনালে গিয়েছিল। আর ১৯৯০-তে ইতালি বিশ্বকাপে স্পেন তার মধুর প্রতিশোধ নিয়েছিল ২-১ গোলে জিতে। চার দশক ধরে চলে আসা স্পেনের এই মনস্তাত্ত্বিক আধিপত্যের দেয়াল আজ গুঁড়িয়ে দেওয়ার চ্যালেঞ্জ বেলজিয়ামের সামনে।

ইয়ামালদের গোলকধাঁধাকে যদি আজ বেলজিয়ামের সত্যি সত্যি ভেস্তে দিতে হয়, তবে তাদের আসল অস্ত্রটির নাম কিন্তু কুর্তোয়া! ৬ ফুট ৭ ইঞ্চির এই বেলজিয়ান প্রাচীর যখন গোলপোস্টের নিচে এসে দাঁড়ান, গোললাইনটা যেন তখন আর কোনো সাধারণ জাল থাকে না; ওটা হয়ে ওঠে এক দুর্ভেদ্য কেল্লা! চোট আর ফিটনেসের নানা চড়াই-উতরাই পেরিয়ে এই বিশ্বকাপে তিনি যে ফর্মে আছেন, তা এককথায় অবিশ্বাস্য। সেনেগালের বিরুদ্ধে সেই মরণ-বাঁচন ম্যাচে তাঁর একেকটা শরীর ছুড়ে দেওয়া সেভ না থাকলে বেলজিয়ামের বিশ্বকাপ অভিযান ওখানেই খতম হয়ে যেত। কুর্তোয়া আসলে ফুটবল মাঠের সেই ঠান্ডা মাথার ‘টার্মিনেটর’, যাঁর চোখের দিকে তাকিয়ে প্রতিপক্ষের স্ট্রাইকাররা বক্সের ভেতর পেনাল্টি মারতেও খেই হারিয়ে ফেলেন। আজ স্পেনের নিখুঁত ফুটবলীয় চিত্রনাট্যে যদি কেউ মাটি করে দিতে পারেন, তিনি রিয়াল মাদ্রিদের এই বিশ্বসেরা প্রহরী। স্প্যানিশ ফরোয়ার্ডদের পায়ের জাদুকে পোস্টের নিচে দাঁড়িয়ে কুর্তোয়া আজ কীভাবে রুখে দেন, তার ওপরেই নির্ভর করছে সোফাইয়ের রূপকথা আজ কোন লালে রাঙাবে!

আরও পড়ুন

×