ঢাকা শুক্রবার, ১৭ জুলাই ২০২৬

মেসির দুই শিকারি চিতা

মেসির দুই শিকারি চিতা
×

ছবি- এএফপি

সঞ্জয় সাহা পিয়াল, আটলান্টা থেকে

প্রকাশ: ১৭ জুলাই ২০২৬ | ০৮:৪৮

কেউ একজন মাঠে হাতে লেখা কাগজে এক ‘চাবুক’ নিয়ে এসেছিলেন ‘থ্রি লায়ন্স ভার্সেস ওয়ান গোট’। মাঠের ক্যামেরার চোখ তাতে আটকে পড়েছিল। সাহেবদের তিন সিংহের দম্ভের সামনে একা এক ফুটবল-ঈশ্বরের অলৌকিক লড়াইয়ের সরলীকরণ আখ্যান। কিন্তু আটলান্টার মিডিয়া ট্রিবিউনে বসে মনে হচ্ছিল, ইংল্যান্ডের ওই ভক্ত কোথাও একটা সমীকরণ মেলাতে ভুল করে গেছেন। হ্যাঁ, লিওনেল মেসি একাই এই ফুটবল-সাম্রাজ্যের একমাত্র ‘গোট’ (গ্রেটেস্ট অব অল টাইম) বা অবিনশ্বর অধিপতি; কিন্তু ক্যারিয়ারের এই গোধূলিলগ্নে দাঁড়িয়ে শিকারটা তিনি একা ধরেন না। তিনি আসলে শিকার ধরেন তাঁর ড্রেসিংরুমের দুই অতি-হিংস্র, ক্ষুরধার ‘শিকারি চিতা’ দিয়ে; যার একজন এনজো ফার্নান্দেজ, অন্যজন লাউতারো মার্তিনেজ!

তিন সিংহকে আর মাঠে নামতে দেননি তারা, আর্জেন্টিনার এই দুই চিতার ক্ষিপ্রতায় তিন সিংহ ইংল্যান্ডের জার্সির বুকে শুধু লোগো হয়েই আটকে ছিল! এদিন ম্যাচের শুরুতে যেন খুঁজেই পাওয়া যাচ্ছিল না মেসিকে। ইংল্যান্ডের জার্মান কোচ থমাস টুখেল আগের দিনই বলে দিয়েছিলেন, মেসির জন্য ম্যান মার্কারের ব্যবস্থার কথা ভাবছেন। ম্যান মার্কিং ছিল না; জোনাল মার্কিং ছিল। কিন্তু এই ম্যাচে মেসি দেখালেন, হাল না ছেড়ে কীভাবে ফাঁকা জায়গা তৈরি করে নিতে হয়। কীভাবে বাঁ পা, ডান পা– দুটোই ব্যবহার করতে হয় সুযোগ বুঝে, পরিস্থিতি বুঝে। ৮৪ মিনিট পর্যন্ত ০-১ গোলে পিছিয়ে থাকা একটা দলকে উদ্বুদ্ধ করার জন্য যা অত্যন্ত জরুরি। তাঁর দুটো পাস থেকেই গোলের রাস্তা তৈরি হলো ৮৫ ও ৯২ মিনিটে। 

এখনও তাঁকে সামান্য সময় ও জায়গা দিলেই বিপক্ষ শাস্তি পাবে। শেষ পনেরো মিনিটের জন্য যাবতীয় এনার্জি যেন জমিয়ে রেখেছিলেন মেসি। শেষদিকে ড্রিবলিং করলেন তিরিশ বছরের তরুণের মতো। এনজো ফার্নান্দেজ ও লাউতারো মার্তিনেজ তার মর্যাদা দিলেন দুরন্ত দুটো গোল করে। প্রেরণা কাকে বলে! মেসির টাচ ৯৪। ৫৪-এর মধ্যে ৪৩ পাসই সঠিক। প্রতিপক্ষ বক্সে সবচেয়ে বেশি টাচ তাঁর– ৭। সবচেয়ে বেশি সুযোগ তৈরি তাঁর– ৪। ১২ বার ডুয়েল জিতেছেন। মেসির নামই প্রেরণা।

মেসিকে নিয়েই লাউতারোদের স্বপ্ন দেখা। আজকের এই শিকারি চিতা লাউতারো কিন্তু একদিনে এই জায়গায় আসেননি। মেসির একটি প্রতিশ্রুতিই তাঁকে বদলে দিয়েছিল। ক্যারিয়ারে গোলখরায় ভুগতে থাকা স্ট্রাইকারদের মানসিক অবস্থা কেমন হয়, তা লাউতারোর চেয়ে ভালো কেউ জানেন না। ২০২২ কাতার বিশ্বকাপের সময় গোলের সহজ সুযোগ নষ্ট করে তীব্র ট্রোলের শিকার হচ্ছিলেন লাউতারো। ড্রেসিংরুমে একদিন যখন তিনি প্রায় ভেঙে পড়েছিলেন, তখন মেসি তাঁর পাশে গিয়ে বসেন। জড়িয়ে ধরে বলেছিলেন, ‘তুমি শান্ত থাকো। এই ট্রফিটা আমরা তোমার গোল ছাড়াই জিততে পারি, কিন্তু পরেরটা (২০২৪ কোপা আমেরিকা ও ২০২৬ বিশ্বকাপ) জিততে আমাদের তোমার ওই খুনে কামড়টাই লাগবে। আমি তোমার জন্য বল বানাব, তুমি শুধু তৈরি থেকো।’ 

মেসি তাঁর কথা রেখেছিলেন। ২০২৪ কোপা আমেরিকার ফাইনালে মেসির পাস থেকেই লাউতারো গোল করে আর্জেন্টিনাকে চ্যাম্পিয়ন করেন এবং চলতি ২০২৬ বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধেও মেসির সেই জ্যামিতিক অ্যাসিস্ট থেকেই লাউতারো জয়সূচক গোলটি করলেন। ওস্তাদের দেওয়া সেই পুরোনো প্রতিশ্রুতির মূল্য লাউতারো প্রতি ম্যাচে শোধ করছেন।

এনজোর গল্পটা আরও অন্যরকম। ২০১৬ সালে মেসি যখন কোপা আমেরিকার ফাইনালে হেরে সাময়িকভাবে অবসর নিয়েছিলেন, তখন এনজো ছিলেন মাত্র ১৫ বছরের এক কিশোর। মেসিকে ফেরানোর আকুতি জানিয়ে কিশোর এনজো ফেসবুকে একটি দীর্ঘ খোলা চিঠি লিখেছিলেন, যার মূল কথা ছিল– ‘লিও, আমাদের ক্ষমার অযোগ্য ভুলের জন্য আপনি চলে যাবেন না। আমরা আপনাকে শুধু জিততে দেখতে চাই না; আমরা আপনাকে ফুটবল খেলতে দেখে আনন্দ পেতে চাই।’
এনজো যখন ২০২২ সালে জাতীয় দলে প্রথম সুযোগ পান, মেসি নিজেই ড্রেসিংরুমে এসে এনজোকে জড়িয়ে ধরে বলেছিলেন, ‘আমি তোমার সেই চিঠি পড়েছিলাম। এখন তুমি আমার পাশে খেলছ, মাঠে আমার পাশেই থেকো।’ এভাবেই দলের প্রত্যেক জুনিয়রের ফুটবল ক্যারিয়ারে মিশে আছে মেসির অনুপ্রেরণা। তাই শুধু তাঁকে আটকানোর চেষ্টা করলে ধেয়ে আসবেই তাঁর শিকারি চিতারা।

আরও পড়ুন

×