স্ট্রেইট ড্রাইভ
এ পৃথিবী অবাক তাকিয়ে রয়...
ছবি- এএফপি
সঞ্জয় সাহা পিয়াল
প্রকাশ: ১৬ আগস্ট ২০২৬ | ১৭:২৪ | আপডেট: ১৬ আগস্ট ২০২৬ | ১৭:৩৪
সেই কবে ১৮৮২ সালের ওভালে গিয়ে প্রথমবার ব্রিটিশ সিংহকে খাঁচায় পুরেছিল অসিরা, আর বুক চাপড়ে দ্য স্পোর্টিং টাইমস লিখেছিল ইংরেজ ক্রিকেটের ‘মৃত্যুসংবাদ’। কল্পনায় সেই মৃতদেহ দাহ করে ছাই অস্ট্রেলিয়া নিয়ে গিয়েছে বলেও ব্যঙ্গ করেছিলেন সাংবাদিক রেজিনাল্ড শার্লি ব্রুকস। সেই থেকেই তো ছাই-ভস্মের সেই অ্যাশেজ সিরিজ। দেড় শতাব্দী পর ডারউইনের বাইশ গজে আজ কি তবে ক্যাঙারু-বধের পর অস্ট্রেলিয়ান মিডিয়াও নিজেদের ক্রিকেটের অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া করবে?
ডেভিড হুকস (ইনি সেই ভদ্রলোক, যিনি কিনা ২০০৩ সালে বাংলাদেশ অস্ট্রেলিয়ায় খেলতে গেলে সিডনি মর্নিং হেরাল্ডে লিখেছিলেন– এক দিনের টেস্টের জন্য সবাই প্রস্তুত হও) বেঁচে থাকলে আজ হয়তো ঠিক এই হাহাকারটাই করতেন। অথচ কী আশ্চর্য, মাররা ক্রিকেট স্টেডিয়ামে কোনো শোরগোল হলো না, কোনো আগাম দামামা বাজল না; অথচ টেস্ট ক্রিকেটের দীর্ঘ মহাকাব্যে ঘটে গেল এক নিঃশব্দ রূপান্তর-পর্ব!
কোনো সমঝদার বাংলাদেশি চাইলে ডারউইনের এই পুণ্যমাটি মুঠোভরে দেশে নিয়ে আসতেই পারেন। দলের সঙ্গে থাকা নির্বাচক হাবিবুল বাশার সুমনের কাছে সেই প্রত্যাশার কথা রাখতেই হাসিতে সম্মতি দিয়েছেন। এই শতাব্দীর পাকিস্তান যা পারেনি, আধুনিক ক্রিকেটের কোনো শ্রীলঙ্কান মায়াজাল যা করতে পারেনি, দীর্ঘ ২৩ বছর পর অসি মুলুকে ব্রাত্য ও উপেক্ষিত থাকার পর মাত্র এক সপ্তাহের আমন্ত্রণে এসে নাজমুল হোসেন শান্তর বাংলাদেশ সেটাই করে দেখাল! অস্ট্রেলিয়ায় গিয়ে অস্ট্রেলিয়াকেই টেস্টে হারাল। পরাশক্তির অহংকার চূর্ণ করে বাঘেদের এই জিগীষা দেখে আজ ডারউইনের গ্যালারি ছাড়িয়ে গোটা ক্রিকেটবিশ্ব থমকে দাঁড়িয়েছে।
সুকান্তের সেই লাইনগুলো খুব মনে পড়ছে– ‘সাবাস বাংলাদেশ, এ পৃথিবী অবাক তাকিয়ে রয়: জ্বলে-পুড়ে মর ছারখার, তবু মাথা নোয়াবার নয়।’ ডারউইনের সবুজগালিচায় আজ লাল-সবুজের প্রতিনিধিরা যেন সেই অবিনাশী স্পর্ধার এক মহিমান্বিত উপাখ্যানই লিখে গেল!
কোথায় টেস্ট র্যাঙ্কিংয়ের মগজে বসে থাকা ক্রিকেটের এক নম্বর রাজাধিরাজ অস্ট্রেলিয়া, আর কোথায় তলানির নবমতম স্থানে ধুঁকতে থাকা এক লড়াকু বাংলাদেশ! বোদ্ধাদের ক্রিকেটীয় খেরোখাতায় এই ম্যাচের ফলাফল তো টসের আগেই একতরফা লিখে রাখা হয়েছিল। অসম, অসমঞ্জস্য এবং অসমাপ্ত এক দ্বৈরথ। হয়েছেও অবশ্য তাই– অসম লড়াইয়েই জিতেছে বাংলাদেশ, প্রথমে অস্ট্রেলিয়াকে ১৯৮ রানে গুটিয়ে দিয়ে; অসমঞ্জস্যও হয়েছে– সেখানে তানজিদ তামিমের সেঞ্চুরি আর মেহেদী হাসান মিরাজের ৬৫ রানের ইনিংসে ভর দিয়ে চার শতাধিক(৪২৬) রান তুলেছে বাংলাদেশ। এবং শেষ পর্যন্ত সাড়ে তিন দিনের অসমাপ্ত এক দ্বৈরথ– অস্ট্রেলিয়াকে দ্বিতীয় ইনিংসেও ২৮৪ রানে গুটিয়ে দিয়েছে হাসান মাহমুদ-মেহেদী হাসানরা। যদিও এই জয়টিকে কেউ কেউ ‘আপসেট’ বলছেন। কিন্তু যেভাবে পুরো টেস্টের এগারো সেশনে পরিকল্পনা অনুযায়ী খেলেছেন শান্তরা, তাতে আপসেট বলাটা অসম্মানের মতোই।
টেস্টটি শুরু হওয়ার আগেও অসি মিডিয়া দুদিন, না তিন দিনে তা শেষ হবে– প্যাট কামিন্সের কাছে জানতে চেয়েছিল। অতিথিদের নিয়ে একটা অবজ্ঞা ছিল তাদের মধ্যে। সেই জেদেই কিনা ট্রাভিস হেড-স্টিভ স্মিথদের অস্ট্রেলিয়াকেই কিনা সাড়ে তিন দিনে স্রেফ মুড়ি-মুড়কির মতো শাসন করল শান্তর বাংলাদেশ! হাসান মাহমুদের সেই সুইং আর মিরাজের ঘূর্ণিজালে যখন তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ল ক্যাঙারুদের দর্প, ডারউইনের আকাশ-বাতাস তখন সাক্ষী থাকল এক নতুন মহাজাগরণের। কোনো অলৌকিক মোজেজা বা ফ্লুক নয়; সাড়ে তিন দিন ধরে ক্রিকেটের কুলীন রাজাদের এভাবে ব্যাকফুটে ঠেলে দেওয়া– তা তো আসলে বাঘেদের এক পঞ্জরীভূত লড়াকু মানসিকতা এবং ক্রিকেট ইতিহাসের তীব্রতম এক বৈপ্লবিক বিবর্তনের নাম! তা ছাড়া এটি অস্ট্রেলিয়ার ‘এ’, ‘বি’ কিংবা ‘সি’ দল খেলেছে বলেও জয়ের মাহাত্ম্য হালকা করা যাবে না। ট্রাভিস হেড, লাবুশেন, স্মিথ, গ্রিন, ক্যারি, কামিন্স, স্টার্ক, হ্যাজেলউড, লায়ন– রীতিমতো অস্ট্রেলিয়ার অ্যাশেজ জয়ী দল এটা।
ম্যাচের মাঝে অসি পেসার হ্যাজেলউড অসহায়ের মতো স্বিকারক্তি দিয়েছিলেন এই বলে যে বাংলাদেশের এই দলের অনেক ক্রিকেটারের ভিডিও তাদের কাছে ছিল না। তারা অনেকটা অচেনা ছিল ! টেস্টের এক নম্বর দলের কেউ যখন এই কথা বলে তখন তার পেশাদারিত্ব নিয়েই প্রশ্ন তোলা যায়। নয়তো তারা যে বাংলাদেশকে নিয়ে উদাসীন ছিলেন সেটা বোঝা যায়। তাদের নতুন মৌসুমের প্রথম ম্যাচ ছিল এটি। অথচ তারা ডারউইনে এসেই ছিল দুই দিন আগে। ব্রিজবেনে দলের কেউ কেউ একসঙ্গে হলেও ক্যাম্পটি বেশি দিনের ছিল না। হয়ত তারা বাংলাদেশের নাম ভেবেই ধরে নিয়েছিল অত পড়ালেখার দরকার নেই। এমনও হতে পারে তারা পড়ে এসেছিল মুশফিক, তাসকিনদের মতো ক্রিকেটারদের, কিন্তু টেস্টের পরীক্ষায় এসেগেছে হাসান মাহমুদ, তানজিদ তামিম, মেহেদী হাসান মিরাজরা। যারা কিনা প্রায় দুই বছর ধরে এই সিরিজের জন্যই মানসিক প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছিলেন। হাসান মাহমুদ ইংল্যান্ডের কেন্টে গিয়ে ট্রায়াল দিয়ে তাদের দলে জায়গা করে নিয়েছিলেন। কাউন্ট খেলার সেই অভিজ্ঞতাটা তিনি কাজে লাগিয়েছেন এই ম্যাচে।
১৯৯৭ সালের কুয়াশাচ্ছন্ন কুয়ালালামপুরে আইসিসি ট্রফি জিতে বিশ্বমঞ্চে জায়গা করে নেওয়ার সেই যে বাঁধভাঙা কান্না, কিংবা ২০০৭-এর ত্রিনিদাদে তারুণ্যের ঔদ্ধত্যে পরাক্রমশালী ভারতকে টুর্নামেন্ট থেকে ছিটকে দেওয়ার সেই অবিশ্বাস্য কীর্তি—বাঙালির আবেগের মণিকোঠায় এদের স্থান চিরন্তন। এর ঠিক দুই বছর পর, ২০০৯ সালে খোদ ক্যারিবীয় দ্বীপপুঞ্জে গিয়ে উইন্ডিজদের হোয়াইটওয়াশ করার সেই মহাকাব্য, কিংবা ঘরের মাঠে ক্রিকেটের জনক ইংল্যান্ডের অহংকার গুঁড়িয়ে দেওয়ার সেই রোমাঞ্চকর টেস্ট জয়—সময়ের নিক্তিতে মেপে দেখুন, সেগুলোর কোনটির মূল্য কিন্তু এক রত্তি কম নয়! প্রতিটি জয়ই ছিল তৎকালীন প্রেক্ষাপটে, তখনকার চড়াই-উতরাইয়ের বাস্তবতায় আমাদের ক্রিকেট ইতিহাসের একেকটি ‘সেরা’ বিজ্ঞাপন।
মাউন্ট মঙ্গানুইয়ের ২০২২ সালে সেই বিখ্যাত টেস্ট জয় কিংবা ২০২৪ রাওয়ালপিন্ডির বুক চিরে ইতিহাস ছিনিয়ে আনা—সবকিছুকে এক লহমায় ম্লান করে দিল ডারউইনের এই ৯ উইকেটের জয়। একে স্রেফ একটা ক্রিকেট ম্যাচ জেতা বললে ক্রিকেটের ব্যাকরণকে অপমান করা হয়; এটি আসলে বাইশ গজের এক নিঃশব্দ, নির্মম সাম্রাজ্য-খর্বতার উপাখ্যান! দীর্ঘ তেইশ বছর ধরে যে ক্রিকেটীয় অস্পৃশ্যতার দেয়াল তুলে লাল-সবুজকে নিজেদের আঙিনায় ঢুকতে দেয়নি অজিরা, সিডনি–মেলবোর্নের মতো স্টেডিয়ামে আমন্ত্রন না জানিয়ে ডারউইনের মতো পার্কে খেলতে ডাকার মতো অবজ্ঞাকে পায়ে মারিয়ে এই জয় ছিনিয়ে নিয়েছে শান্তরা।
ডারউইনের এই মহাকাব্যিক বিজয়ের পর বিশ্ব ক্রিকেটের মানচিত্রে বাংলাদেশের দিকে তাকানোর দৃষ্টিভঙ্গিটাই চিরতরে বদলে গেল; এখন থেকে লাল-সবুজের এই দলটিকে সবাই সমীহ আর পরম সম্মানের চোখে দেখবে। এতকাল যারা বাংলাদেশকে কেবলই ‘কন্ডিশনের সুবিধা নেওয়া’ হোম-টিম কিংবা অঘটন ঘটানো কোনো ক্ষণস্থায়ী দল হিসেবে ভাবত, তাদের সেই পুরনো চশমাটা আজ ভেঙে চুরমার। বিশ্ব ক্রিকেটের কুলীন প্রধানদের ডেরায় গিয়ে, তাদেরই পাতা ফাঁদে তাদের ধুলিসাৎ করে শান্তর দল প্রমাণ করল—বাংলাদেশ এখন আর কোনো ব্রাত্য বা করুণাপ্রার্থী দল নয়, বরং বাইশ গজের এক নতুন পরাশক্তি। ডারউইনের সবুজ গালিচায় আজ যে সম্মানের রাজমুকুট বাঘেরা মাথায় পরল, তা ক্রিকেট বিশ্বের দরবারে বাংলাদেশকে এনে দিল এক পরম স্বীকৃতি ও চিরস্থায়ী কৌলিন্য।
- বিষয় :
- বাংলাদেশ-অস্ট্রেলিয়া
- টেস্ট ক্রিকেট