ডুলির ‘অবাস্তব’ দেয়ালে জামালের স্বপ্ন
ছবি- বাফুফে
ক্রীড়া প্রতিবেদক
প্রকাশ: ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ১৫:২৩
যাকে বলে একেবারে প্রি-ম্যাচ ক্লাইমেক্স! ফিফা আসিয়ান কাপ টুর্নামেন্টে বল মাঠে গড়ানোর আগেই লকাররুমের অন্দরে মনস্তাত্ত্বিক লড়াই। একদিকে কোচ থমাস ডুলির খাঁটি জার্মান মগজজাত হিমশীতল বাস্তববাদ– র্যাঙ্কিংয়ের মহাসমুদ্র নাকি রাতারাতি পার হওয়া অসম্ভব, মালয়েশিয়া-ইন্দোনেশিয়াকে হারানোর স্বপ্ন দেখাটাই অবাস্তব। আর ঠিক তার উল্টো মেরুতে দাঁড়িয়ে অধিনায়ক জামাল ভূঁইয়ার চোয়ালচাপা স্পর্ধা; যিনি স্রেফ নিয়মরক্ষার পর্যটক হতে রাজি নন, বরং অতীতের প্রেরণা নিয়ে বুক চিতিয়ে ফাইনাল খেলার স্বপ্ন দেখছেন।
কোচের যুক্তি যেখানে খাড়া দেয়াল তুলে দিচ্ছে, ফুটবলারদের আত্মবিশ্বাস সেখানে সব দেয়াল ভেঙে গুঁড়িয়ে দিতে চাইছে। রণ শুরুর আগেই ডাগআউট আর মাঠের এই পরস্পরবিরোধী সুর বুকে নিয়ে গতকাল শনিবার মাঝরাতে এক অদ্ভুত দোটানার জার্কাতার বিমানে চেপে বসছে বাংলাদেশ দল। ইন্দোনেশিয়ার আকাশে কি তবে ডুলির সংশয়বাদ জিতবে, নাকি জামালের রোমান্টিসিজম?
ভারত না খেলায় হঠাৎ আসা এই আসিয়ান কাপের আমন্ত্রণ বাফুফে ভবনে আনন্দের হাওয়া বইয়ে দিলেও থমাস ডুলির মগজে তা শুরু থেকেই বিষাদের সুর তুলেছে। ডুলির জ্যামিতিক হিসাব খুব পরিষ্কার– ইন্দোনেশিয়া বা মালয়েশিয়ার মতো র্যাঙ্কিংয়ের হাঙরদের সঙ্গে ফাইট দেওয়ার চেয়ে ভুটান-মালদ্বীপের মতো চুনোপুঁটিদের হারিয়ে সাফ ফুটবল উদ্ধার করাই তাঁর মূল লক্ষ্য। গতকাল সংবাদ সম্মেলনেও তিনি সেই ‘সেফ গেম’ খেলার চেনা তাসই চাললেন। ‘কোনো কোচ আপনাকে জাদুকরি পানীয় দিয়ে রাতারাতি ভালো করে দিতে পারবে না। আমরা ১৮০ থেকে ১৫০ র্যাঙ্কিংয়ে পৌঁছাতে চাইলে দুই-তিন বছর সময় লাগবে। ইন্দোনেশিয়া বা মালয়েশিয়ার মুখোমুখি হয়ে হঠাৎ করেই সবাইকে হারিয়ে দেওয়ার ভাবনা অবাস্তব। মাঠে আমাদের ছেলেরা শেষ মিনিট পর্যন্ত লড়াই করবে, যদি দুই-তিন গোলে হেরেও যাই কিন্তু ভালো ফুটবল খেলি। সেটাই আমার কাছে বড় প্রাপ্তি।’
যদিও সেই একই ক্যামেরার সামনে এসে জামাল ভূঁইয়া বলেছেন টুর্নামেন্টে নক আউট পর্বে যাওয়ার প্রাথমিক লক্ষ্যের কথা। ‘কোনো টুর্নামেন্টে গিয়ে শুধু অংশগ্রহণ করব, এভাবে তো হয় না। সবারই স্বপ্ন আছে, আমারও আছে। আমরা নেক্সট রাউন্ডে কোয়ালিফাই করতে চাই। আমরা জানি কাজটা কঠিন হবে। ইন্দোনেশিয়া ও মালয়েশিয়া অনেক শক্তিশালী দল। তবে ২০১৮ সালে আমরা যখন ইন্দোনেশিয়ায় ছিলাম, আমাদের গ্রুপে উজবেকিস্তান, থাইল্যান্ড ও কাতার ছিল। তখন কেউ ভাবেনি আমরা কোয়ালিফাই করব। কিন্তু আমরা ঠিকই শেষ ষোলোতে গিয়েছিলাম। এবারও তেমন কিছু হতে পারে।’
কোচ ডুলির এই ‘অনীহার’ টুর্নামেন্টের আগেই ফুটবলারদের ওপর চলেছিল টানা চার সপ্তাহের এক অমানুষিক ‘হার্ড ট্রেনিং’। দিনে দু-বেলা সেই বুট-ব্লাস্টিং সেশনের সাইড-ইফেক্ট যা হওয়ার তা-ই হয়েছে– তপু বর্মনের মতো রক্ষণভাগের প্রধান স্তম্ভ এখন ইনজুরির আইসিইউতে, মোরছালিনের পায়েও লেগেছে চোটের হালকা আঁচড়। আসিয়ান কাপে ২৫ সেপ্টেম্বর জার্কাতায় মালেশিয়ার (১৩৬ র্যাঙ্কিং) বিপক্ষে প্রথম ম্যাচে মুখোমুখি হবে বাংলাদেশ। গেলোরা বুং কার্নো স্টেডিয়ামেই ২৮ সেপ্টেম্বর হামজাদের প্রতিপক্ষ সিঙ্গাপুর (১৪৮ র্যাঙ্কিং) আর ১ অক্টোবর স্বাগতিক ইন্দোনেশিয়ার (১১৮ র্যাঙ্কিং) বিপক্ষে গ্রুপ পর্বের শেষ ম্যাচ খেলতে নামবে বাংলাদেশ (১৮১ র্যাঙ্কিং)।
দুই গ্রুপের চ্যাম্পিয়ন দল খেলবে ফাইনালে আর রানার্সআপরা খেলবে তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ম্যাচে। অতি-উৎসাহী বাংলাদেশি সমর্থকদের সোশ্যাল মিডিয়ার আকাশচুম্বী প্রত্যাশার বেলুনটাও এদিন এক ঝটকায় ফুটো করে দিলেন ডুলি। ‘ফেসবুকে যারা কথা বলে ফুটবলের বিষয়ে তাদের কোনো ধারণাই নেই। তারা যখন মানচিত্রের দিকে তাকান, তখন বুঝতে পারবেন কোনো কিছুই রাতারাতি আসে না।’