ফিরে দেখা ২০২০
'বিশ্বকাপ জয়ে বছরটা স্মরণীয় হয়ে থাকবে'
ক্রীড়া প্রতিবেদক
প্রকাশ: ৩০ ডিসেম্বর ২০২০ | ১২:০০ | আপডেট: ৩১ ডিসেম্বর ২০২০ | ০৩:০৮
বিশের বিষে পৃথিবী হয়ে পড়েছিল বিষাক্ত। সভ্য জনপদে মৃত্যুর মিছিল দেখে ক্লান্ত হয়ে পড়েছিল মানুষ। স্বাভাবিক পৃথিবী ফিরে পেতে প্রার্থনা হয়েছে ঘরে ঘরে। তবুও যে পৃথিবী শান্ত হয়নি। তাই করোনা বাস্তবতাকে মেনে এবং মানিয়ে নিয়ে মানুষ অতিক্রম করছে নিউ নরমাল সময়। বিষের বিশ বিদায় নেবে রাত ১২টা ১ মিনিটে। একুশ যেন পয়া হয় এই তো চাওয়া সবার।
তবে এই বিষের বছরেই কল্যাণীর আশীর্বাদপুষ্ট হয়েছে বাংলাদেশের ক্রিকেট। ২০২০ সালের ৯ ফেব্রুয়ারি জিতেছে অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপ। আকবর, শরিফুলদের কাছে বিশ কল্যাণের। স্মৃতির মিনারে চ্যাম্পিয়নশিপকেই রেখেছেন তারা। আকবররা বলছেন, 'এ স্মৃতি কোনোদিন ভোলার নয়।'
টানা দুই বছর কঠোর পরিশ্রমে অর্জিত চ্যাম্পিয়নশিপের জন্য যুবারা বীরের সম্মান পেয়েছিলেন দেশে। বিমানবন্দর থেকে মিরপুর শেরেবাংলা স্টেডিয়ামের পথে পথে জনতার ভালোবাসায় সিক্ত হয়েছিলেন চ্যাম্পিয়নরা। নায়কোচিত সম্মান এখনও তো পান তারা। বিশের বিশ্বকাপ জয়কে স্মৃতির মিনারের চূড়ায় রেখেছেন আকবররা। চ্যাম্পিয়ন অধিনায়ক বললেন, 'ওই ফাইনাল ক্যারিয়ারের সবচেয়ে সেরা অনুভূতি। এর ওপরে কিছু হতে পারে না। অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপ জয় স্মরণীয় ঘটনা। সব ছাপিয়ে স্মৃতিতে এটা রয়েছে এবং থাকবে। এ মুহূর্তে আমি বলব, বছরের শুরুটা এর চেয়ে ভালো হতে পারত না। করোনার কঠিন পরিস্থিতিতেও বিশ্বকাপ জয়ই সেরা প্রাপ্তি।'
বিশ্বকাপজয়ী দলের আরেক সদস্য বাঁহাতি স্পিনার রাকিবুল হাসান সব ভুলে থাকতে পারেন চ্যাম্পিয়ন হওয়ার স্মৃতি আঁকড়ে। গতকাল ফোনে যেমন বললেন, 'বিশ্বকাপ জয় এমন একটা স্মৃতি, যেটা সব সময় অনুভব করি। ওটার কথা ভাবলেই ভালো লাগে। বিশ্বকাপ জয় স্বপ্নের মতো। দুটি বছর আমরা অনেক পরিশ্রম করে শিরোপা নিয়ে আসতে পেরেছি। বাংলাদেশের ক্রিকেটে যেটা গর্ব করার মতো। এককথায় বললে, বিশ্বকাপ জয়ের স্মৃতি ভোলার নয়।' ছিপছিপে পেসার শরিফুলের মননে মগজে স্থায়ী জায়গা করে নিয়েছে বিশ্বকাপ জয়ের স্মৃতি। বাঁহাতি এ পেসার স্মৃতিচারণা করলেন উচ্ছ্বসিত কণ্ঠে, 'উজ্জ্বল স্মৃতি। আমরাই প্রথম বিশ্বকাপ জিতেছি। ২০২০ সালে অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপের পরই করোনা মহামারি দেখা দেয়। খেলাধুলা বন্ধ হয়ে যায়। এটা ভাবলে খারাপ লাগে। তবে করোনার আগের কথা ভাবলে, একটা বিশ্বকাপ জিতেছি, সেটাই সেরা অর্জন।'
এক যুগ পর পাকিস্তানে
নিরাপত্তা ইস্যুতে কয়েক দফা তর্ক-বিতর্কের পর জানুয়ারিতে পাকিস্তান সফরে যায় বাংলাদেশ। ২২ জানুয়ারি সন্ধ্যায় চার্টার্ড ফ্লাইটে লাহোরে গিয়ে একদিন পরই টি২০ খেলতে নেমে যান মাহমুদুল্লাহরা। এটি ছিল তিন দফা সফরের প্রথমটি, যেখানে তিনটি টি২০ খেলার কথা ছিল। তবে বৃষ্টির কারণে শেষটিতে বল মাঠে গড়ায়নি। ২০২০ সালের এই সফরটি ছিল গত এক যুগে পাকিস্তানের মাটিতে বাংলাদেশ জাতীয় দলের প্রথম সফর। এর আগে সর্বশেষ ২০০৮ সালের জুনে এশিয়া কাপ খেলতে গিয়েছিল বাংলাদেশ। যে ইস্যুতে দেশটিতে বাংলাদেশ সরকার পাকিস্তানে দল পাঠায়নি, সেই নিরাপত্তার কারণ দেখিয়ে পাকিস্তান সফরে যাননি মুশফিকুর রহিম। টি২০ সিরিজের পর ফেব্রুয়ারিতে একটি টেস্ট খেলতে যান মুমিনুল হকরা। তবে এপ্রিলের তৃতীয় দফার সফরটি করোনার কারণে আর মাঠে গড়ায়নি।
করোনায় মানবিকতা
জনজীবনে স্থবিরতা নেমে আসায় সমাজের বিভিন্ন অংশের মানুষ যখন আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত, তখন সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেন বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড ও ক্রিকেটাররা। ক্রিকেটের সঙ্গে জড়িত অসচ্ছল ক্রিকেটার, কোচ, ক্লাব, মাঠকর্মী থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষকে আর্থিক অনুদান দেয় বিসিবি। জাতীয় ও প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটাররা তাদের এক মাসের বেতনের অর্ধেক দেন ক্রিকেটার্স ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশন গঠিত তহবিলে। ব্যক্তিগতভাবে অসহায় মানুষের প্রতি হাত বাড়িয়ে দেন তারকা ক্রিকেটাররা। এর মধ্যে পছন্দের ও রেকর্ডের স্মারক হয়ে থাকা ব্যাট নিলামে তোলেন সাকিব, মুশফিক, লিটন, সৌম্যসহ অনেকেই। মাশরাফি নিলামে দেন তার 'মাশরাফি' লেখা খোদাই করা শখের ব্রেসলেটটি। বিভিন্ন মানুষকে বড় অঙ্কের আর্থিক অনুদান দেন তামিমও। এ ছাড়া নাম প্রকাশ না করে মানুষের পাশে দাঁড়ান অন্য ক্রিকেটাররাও। নাজমুল ইসলাম অপু নিজ এলাকা নারায়ণগঞ্জে মানুষের জন্য প্রতিনিয়ত ছুটতে ছুটতে একপর্যায়ে পরিবারসহ করোনায়ও আক্রান্ত হন।
কে জানত বিষে বিষে এভাবেই ক্ষয়ে যাবে ২০২০ সালটা। ভয়, আতঙ্ক, উদ্বেগ, শিহরণ, মন খারাপ, বিচ্ছেদ, শোক, ঘাবড়ে যাওয়ার এ রকম অভিশপ্ত বছর আমাদের প্রিয় পৃথিবীতে আগে আসেনি কখনও। এই 'বিষ সালটা' নিয়ে সূর্যটা আজ যত তাড়াতাড়ি ডুব দেবে, ততই যেন মঙ্গল। বিষময় বছরটা শুধু অন্ধকার পথে হেঁটেছে তা নয়, আলোকবর্তিকাও দেখিয়েছে। শিখিয়েছে যাপনের সঙ্গে মিশে যাওয়া নতুন নতুন বিদেশি শব্দের গ্রহণযোগ্যতা- নিউ নরমাল, বায়ো-বাবল, আইসোলেশন, কোয়ারেন্টাইন, ওয়ার্ক ফ্রম হোম, সোশ্যাল ডিস্টেন্সিং ও লকডাউন। খেলার মাঠে একের পর এক টুর্নামেন্ট ও লিগ বন্ধ হয়েছে। পিছিয়েছে অলিম্পিক, টি২০ বিশ্বকাপ। স্থগিত হয়েছে টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের বহু ম্যাচ, ফুটবলের বিশ্বকাপ বাছাই। তার মাঝেও ক্রিকেটে বাংলাদেশ যুবাদের বিশ্বজয় ইতিহাসে জ্বলজ্বল হয়ে থাকবে। খেলাধুলা দর্শকদের জন্য এখন শুধুই টিভিতে কৃত্রিম চিৎকার মাত্র! ক্রীড়াঙ্গনের নতুন বছরে আর 'ভার্চুয়াল' নয়, 'অ্যাকচুয়াল' আসুক, এটাই চাওয়া। আমাদের স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীর বছরটায় ক্রীড়াঙ্গনের উঠোনটা উজ্জ্বল হয়ে উঠুক 'বিষমুক্ত' নতুন এক সম্ভাবনার সূর্য নিয়ে
দুই তিন চার
বিদায়ী বছরে বাংলাদেশ দল টেস্ট খেলেছে দুটি, ওয়ানডে তিনটি আর টি২০ চারটি। অথচ টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপ, ওয়ানডে সুপার লিগ আর টি২০ বিশ্বকাপ ও এশিয়া কাপ মিলিয়ে ঠাসা সূচি ছিল পুরো বছরের জন্য। বাংলাদেশ যে দুটি টেস্ট খেলেছে, তার মধ্যে পাকিস্তানের কাছে ইনিংস ব্যবধানে হেরেছে, আর জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে ইনিংস ব্যবধানে জিতেছে। ওয়ানডে তিনটির সবক'টিই ছিল জিম্বাবুইয়ানদের বিপক্ষে, তিনটিতেই জয়। চারটি টি২০'র তিনটির প্রতিপক্ষ ছিল পাকিস্তান, একটির জিম্বাবুয়ে। একটিতে জয়, একটি পরিত্যক্ত আর দুটিতে হার।
অধিনায়ক মাশরাফির বিদায়
পুরো বছরে বাংলাদেশ আতিথেয়তা দিয়েছে কেবল জিম্বাবুয়েকে। আফ্রিকার দেশটি ঢাকায় আসে ফেব্রুয়ারিতে। মিরপুরে সফরের একমাত্র টেস্টের পর সিলেটে অনুষ্ঠিত হয় তিনটি ওয়ানডে। ৬ মার্চ তৃতীয় ওয়ানডের আগের দিন অধিনায়কত্ব ছেড়ে দেওয়ার ঘোষণা দেন মাশরাফি বিন মুর্তজা। ২০১৫ ও ২০১৯ বিশ্বকাপে নেতৃত্ব দেওয়া দেশের সফলতম অধিনায়ক ম্যাচশেষে সতীর্থদের কাঁধে চড়ে এবং মাঠে-মাঠের বাইরের আবেগময় পরিবেশের মধ্যে একটি অধ্যায়ের ইতি টানেন। জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে ওই সিরিজের দ্বিতীয় ম্যাচে ওয়ানডেতে বাংলাদেশের ব্যক্তিগত সর্বোচ্চ রানের আগের কীর্তিকে ছাড়িয়ে ১৫৮ রান করেন তামিম ইকবাল, পরের ম্যাচেই তার রেকর্ড ভেঙে ১৭৬ রানের ইনিংস খেলেন লিটন দাস। দুই ব্যাটসম্যান ওপেনিং জুটির রেকর্ডও গড়েন। সিরিজ শেষে ২০২৩ বিশ্বকাপ পর্যন্ত ওয়ানডে অধিনায়ক হিসেবে তামিমের নাম ঘোষণা করা হয়।
বলয়ে-ঘেরা ঘরোয়া ক্রিকেট
বিভিন্ন পক্ষ থেকে দেশীয় খেলোয়াড়দের নিয়ে একটি টি২০ টুর্নামেন্ট আয়োজনের দাবি উঠছিল কয়েক বছর ধরেই। অবশেষে সেটি বাস্তবায়িত হলো করোনার সুবাদে। নভেম্বরে পাঁচটি দলকে ঢাকায় আয়োজন করা হয় বঙ্গবন্ধু টি২০ কাপ নামের এই টুর্নামেন্টের, যেখানে চ্যাম্পিয়ন হয় জেমকন খুলনা। তার আগে তিন দল নিয়ে অক্টোবরে মাঠে গড়ায় বিসিবি প্রেসিডেন্টস কাপ। পঞ্চাশ ওভারের ওই আসর দিয়েই দেশে ক্রিকেটের বন্ধ দুয়ার খোলা হয়। এই দুটি আসরের মাধ্যমেই নতুন বাস্তবতার বায়ো-বাবলের পরীক্ষা চালায় বিসিবি। করোনার আগে দেশের শীর্ষ ক্রিকেটারদের নিয়ে আয়োজিত হয় আরও একটি আসর। জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারিতে বাংলাদেশ ক্রিকেট লিগের ওই আসরে পূর্বাঞ্চলের হয়ে মধ্যাঞ্চলের বিপক্ষে ৩৩৪ রানের অপরাজিত ইনিংস খেলেন তামিম ইকবাল। বাংলাদেশের প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে এটিই ব্যক্তিগত সর্বোচ্চ।
শোকের বছর
বছরের প্রথম মাসেই ক্রীড়াবিশ্ব শোকে স্তব্ধ হয়ে পড়ে কোবে ব্রায়ান্টের মর্মান্তিক মৃত্যুতে। যুক্তরাষ্ট্রের কিংবদন্তি এই বাস্কেটবল তারকা ক্যালিফোর্নিয়ায় পাহাড়ে ধাক্কায় হেলিকপ্টার বিধ্বস্ত হয়ে মারা যান। এ সময় তার ১৩ বছর বয়সী মেয়েসহ আরও আটজন প্রাণ হারান। কোবের মতো বিশ্বকে নাড়িয়ে দেয় দিয়েগো ম্যারাডোনার মৃত্যুও। বিশ্বকাপজয়ী আর্জেন্টাইন কিংবদন্তি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন ২৫ নভেম্বর। ম্যারাডোনার পরপর পৃথিবী থেকে বিদায় নেন ইতালির ১৯৮২ বিশ্বকাপ জয়ের নায়ক পাওলো রসি ও আর্জেন্টিনার ২০১৪ বিশ্বকাপের কোচ আলেসান্দ্রো সাবেলা। শোকে মর্মাহত হয়েছে ক্রিকেটবিশ্বও। অস্ট্রেলিয়ার সাবেক ক্রিকেটার ও কোচ ডিন জোন্স, 'থ্রি ডব্লিউজ'র স্যার এভারটন উইকসরা মারা যান এ বছর। বাংলাদেশের বাঁহাতি স্পিনের পথিকৃৎ রামচাঁদ গোয়ালা, ভারতের কিংবদন্তি খেলোয়াড় চুনি গোস্বামী আর আফগানিস্তানের ২৯ বছর বয়সী ক্রিকেটার নাজিম তারাকাইয়ের সড়ক দুর্ঘটনার মৃত্যুও ছিল বেদনাবিধুর।