আগামীর নেতৃত্ব
এআই-নেটিভ চর্চার সঠিক সময় এখনই
এম এম মাহবুব হাসান
প্রকাশ: ০৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ১২:৩৮
বিশ্বে এখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিছক প্রযুক্তি নয়, এটি সামগ্রিক রূপান্তরের সূচনা। বৈশ্বিক পরিসংখ্যান বলছে, এরই মধ্যে ৭৮ শতাংশ প্রতিষ্ঠান তাদের ব্যবসায়িক কার্যক্রমে এআই প্রযুক্তির ব্যবহার পরীক্ষামূলকভাবে প্রয়োগ করছে। মাত্র তিন বছর আগেও এই হার ছিল ৫৫ শতাংশ। জেনারেটিভ এআইর নিয়মিত ব্যবহারও বেড়েছে– ২০২৩ সালে যা ছিল ৩৩ শতাংশ, তা উন্নীত হয়েছে ৭১ শতাংশে। এসব সংখ্যা শুধু পরিসংখ্যান নয়; বরং সুস্পষ্ট বার্তা– এআই এখন আর ঐচ্ছিক নয়, অপরিহার্য। আরেকটি বিষয় লক্ষণীয়– উন্নত সব দেশ প্রযুক্তি দ্রুত গ্রহণ করছে ঠিকই, কিন্তু প্রায়ই প্রাতিষ্ঠানিক প্রস্তুতি ছাড়া এগিয়ে যাচ্ছে। দক্ষিণ এশিয়ার চিত্র আরও চ্যালেঞ্জিং। ভারত ও পাকিস্তানে অনেক প্রতিষ্ঠান এআই নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করছে। তবে স্থায়ী রূপায়ণ এখনও সীমিত। বাংলাদেশ এই যাত্রায় এখন নবজাগরণের পর্যায়ে আছে বলা যায়।
বাংলাদেশ সরকার ২০২৪ সালে জাতীয় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নীতি গ্রহণ করেছে। এটি নিঃসন্দেহে জরুরি পদক্ষেপ, এটি সবে শুরু। নীতি প্রণয়ন করা আর তা বাস্তবায়ন করা– দুটি সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়। বর্তমানে বাংলাদেশের সব ধরনের আর্থিক প্রতিষ্ঠান এআই ব্যবহারে অগ্রণী ভূমিকা পালন করছে। এটি স্বাভাবিক, কারণ ব্যাংকিং খাত মূলত উপাত্তনির্ভর। এ ছাড়া জটিল সিদ্ধান্ত গ্রহণে এআই এখানে প্রায় অপরিহার্য হয়ে উঠেছে। কিন্তু অন্য সব খাতে অগ্রগতি এখনও পিছিয়ে। সরকারি পরিষেবা, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবায় এআইর একীকরণ এখনও বেশ সীমিত।
এখানেই আমরা মূল সমস্যার মুখোমুখি। এটি প্রযুক্তির সমস্যা নয়; প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কৃতির সমস্যা। একটি প্রতিষ্ঠান চাইলে এআই প্রযুক্তি কিনতে পারে, সফটওয়্যার স্থাপন করতে পারে, এমনকি কর্মীদের প্রশিক্ষণও দিতে পারে।
কিন্তু প্রতিষ্ঠানের ভেতরে যদি এআই-নেটিভ চিন্তাভাবনার সংস্কৃতি না থাকে– যদি নেতারা, মধ্যস্তরের ব্যবস্থাপক ও কর্মীরা এআইকে হুমকি হিসেবে দেখেন এবং শুধু নিজেদের অবস্থানের সুরক্ষায় ব্যস্ত থাকেন– তাহলে সেই প্রযুক্তি অচিরেই ম্রিয়মাণ হয়ে পড়বে, যা পরিণত হবে একটি অপ্রয়োজনীয় বাড়তি খরচে।
দীর্ঘদিন ব্যাংকিং খাতে কাজ করার সঙ্গে এর উন্নয়ন খাতেও কাজ করার সুযোগ হয়েছে। প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের এই ধারাবাহিকতা বেশ কাছ থেকেই দেখেছি। এআই নিয়ে বর্তমানে যে প্রকৃত চ্যালেঞ্জ দেখা যাচ্ছে, তা প্রযুক্তিগত নয়, সাংস্কৃতিক। বিশেষভাবে মধ্যস্তরের নেতারা, যারা আগামী পাঁচ বছরে শীর্ষ নেতৃত্বে আসবেন, তাদের সামনে এটি জরুরি সিদ্ধান্ত– তারা কি এআইকে গ্রহণ করে নতুন পথ তৈরি করবেন, নাকি পুরোনো ধ্যানধারণা আঁকড়ে ধরে পিছিয়ে পড়বেন? এশিয়ার শিক্ষাব্যবস্থা একই চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। সিঙ্গাপুর ২০২৭ সালের মধ্যে সব বিশ্ববিদ্যালয়, পলিটেকনিক ও কারিগরি প্রতিষ্ঠানে এআই সাক্ষরতা বাধ্যতামূলক করতে চলেছে। চীনও একই পথে এগিয়েছে। ভারত চালু করেছে পরীক্ষামূলক কোর্স। কিন্তু বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো এখনও এ বিষয়ে বেশ সংশয়ী। গবেষণা বলছে, দক্ষিণ এশিয়ার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মাত্র ৩ শতাংশ শিক্ষার্থী ভবিষ্যতের জন্য এআই প্রস্তুত করছে।
এটি বিশাল ফাঁক। শিক্ষার্থীরা যখন স্নাতক ডিগ্রি নিয়ে বের হবেন, তখন এমন এক পেশাদার জগতে প্রবেশ করবেন, যেখানে এআই সর্বত্র বিরাজমান, অথচ তাদের অর্জিত দক্ষতা তার জন্য যথেষ্ট প্রস্তুত নয়।
নেতৃত্বের দৃষ্টিকোণ থেকে বিবেচনা করলে আগামী পাঁচ বছর হবে সিদ্ধান্তমূলক। যারা এখন মধ্যস্তরে আছেন এবং আগামী দশকে শীর্ষ নেতৃত্বে যাবেন, তাদের তিনটি প্রশ্নের উত্তর এখনই খুঁজতে হবে।
প্রথমত, আমার প্রতিষ্ঠানে কি সত্যিই এআই-নেটিভ চিন্তাভাবনা আছে, অর্থাৎ আমরা কি দ্রুত শিখি, ব্যর্থতা থেকে শিক্ষা নিই এবং ক্রমাগত পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালাই? নাকি এখনও কঠোর নিয়ম আর ভীতির মধ্যে আটকে আছি?
দ্বিতীয়ত, আমাদের সহকর্মীরা কি এআইর সঙ্গে তাল মিলিয়ে বিকশিত হতে প্রস্তুত? এটি শুধু প্রযুক্তিগত দক্ষতার প্রশ্ন নয়, মানসিক ও মনস্তাত্ত্বিক অভিযোজনের প্রশ্ন।
তৃতীয়ত, আমাদের প্রতিষ্ঠানের নেতৃত্ব কি সত্যিই আমাদের এআইভিত্তিক ভবিষ্যতের জন্য প্রস্তুত করছে, নাকি শুধু প্রান্তে দাঁড়িয়ে থাকব?
এসব কিছুর উত্তর যদি নেতিবাচক হয়, তাহলে পরিবর্তনের সময় এখনই। কারণ, আগামী পাঁচ বছর অপেক্ষা করার জন্য খুব বেশি সময় নয়। এআই নিয়ন্ত্রণ, তথ্য-উপাত্তের গোপনীয়তা ও কর্মীর সুরক্ষা-সংক্রান্ত আন্তর্জাতিক নীতি দ্রুত বদলাচ্ছে। যারা এখনই প্রস্তুতি নেবেন না, তারা আগামী দশকে প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়বেন।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে অবশ্য আমাদের সুবিধা হলো– অন্যদের ভুল থেকে শিখতে পারি। সব উন্নত দেশ কীভাবে এআই রূপায়ণ করেছে, কোথায় ব্যর্থ হয়েছে আর কোথায় সফল হয়েছে, তা দেখছি সরাসরি। এই অভিজ্ঞতা দ্রুততর ও কার্যকর পথ তৈরি করার সুযোগ এনে দিতে পারে। সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এআই সাক্ষরতা তাদের পাঠ্যক্রমে অন্তর্ভুক্ত করতে পারে এখনই। ব্যাংক ও আর্থিক সব প্রতিষ্ঠানে সবচেয়ে দ্রুত তাদের প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কৃতি বদলাতে পারে। বিশেষত এআইকে হুমকি নয়; বরং সহযোগী হিসেবে সবার সামনে আনতে হবে। সরকারি পরিষেবা ও অন্য সব খাত পারে দ্রুতগতিতে পরীক্ষামূলক প্রকল্প চালু করতে।
আগামী পাঁচ বছরে যারা এই তিনটি উপাদানকে একসূত্রে গাঁথতে পারবেন, তারাই নিজেদের প্রতিষ্ঠান ও দেশকে নিয়ে যাবেন সমৃদ্ধ ভবিষ্যতের পথে।
- বিষয় :
- কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা