ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

বিছনাকান্দি

জল-পাথরের রাজ্য এখন প্লাস্টিকের ভাগাড়

জল-পাথরের রাজ্য এখন প্লাস্টিকের ভাগাড়
×

ময়লা-আবর্জনায় সয়লাব সিলেটের বিছনাকান্দি পর্যটন কেন্দ্র-ইউসুফ আলী

চয়ন চৌধুরী, সিলেট

প্রকাশ: ০৭ ফেব্রুয়ারি ২০২০ | ১৫:০০ | আপডেট: ০৭ ফেব্রুয়ারি ২০২০ | ১৫:৪১

চারদিকে ছোট-বড় অসংখ্য পাথর। থরে থরে সাজানো পাথরের বিছানা যেন। সবুজ পাহাড় থেকে নেমে আসা নদী ছলছল শব্দে পাথরের সেই বিছানাকে ভিজিয়ে, ডিঙিয়ে ছুটে চলেছে। অপরূপ সৌন্দর্যের এই লীলাভূমির নামও বিছনাকান্দি। প্রকৃতিপ্রেমীদের পদচারণায় দেশের অন্যতম পর্যটনকেন্দ্র হয়ে ওঠা বিছনাকান্দি সিলেটের গোয়াইনঘাট উপজেলার রুস্তমপুরে অবস্থিত। প্রতিদিন হাজারো মানুষের মন কেড়ে নেওয়া বিছনাকান্দির পরিবেশ বিপন্ন হয়ে উঠেছে পর্যটকদেরই অসচেতনতায়। তাদের ফেলে যাওয়া খাবারের প্যাকেট-পানীয়র বোতলসহ প্লাস্টিকের স্তূপ কেড়ে নিচ্ছে বিছনাকান্দির প্রাণ। চলতি শুস্ক মৌসুমে বিছনাকান্দিতে পানির প্রবাহ কমে গেছে। তাতেই বেরিয়ে এসেছে পাথরের ফাঁকে ফাঁকে জমে থাকা প্লাস্টিক বর্জ্য।

সীমান্তের ওপারের পাহাড় থেকে নেমে আসা পিয়াইন নদীর একটি শাখাই বিছনাকান্দির আকর্ষণ। চলতি শুস্ক মৌসুমে নদীর পানি কমায় পাথরের পাশাপাশি দু'পাশে বালুর চর জেগেছে। ঘুরে ঘুরে ক্লান্ত পর্যটকরা চরে বসে বিশ্রাম নিচ্ছেন; খাবারও সেরে নিচ্ছেন অনেকে। এসব খাবারের প্যাকেট-পানির বোতল ফেলার নির্দিষ্ট কোনো জায়গা না থাকায় আশপাশেই তা ছুড়ে ফেলছেন পর্যটকরা। কেউ কেউ বসার  জায়গাতেই ফেলে চলে যাচ্ছেন। এতে পাথরের গুচ্ছের মাঝে পুরো এলাকা যেন প্লাস্টিকের রাজ্য হয়ে উঠেছে। পর্যটকদের ফেলে যাওয়া উচ্ছিষ্ট খাবার পচে দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে। অন্যদিকে অপচনশীল প্লাস্টিক পরিবেশ নষ্ট করার পাশাপাশি নদীর প্রবাহকে করছে বাধাগ্রস্ত।

পরিবেশবাদী সংগঠন 'ভূমিসন্তান বাংলাদেশে'র আশরাফুল কবীর বলেন, সিলেটে পর্যটনের অপার সম্ভাবনা রয়েছে; তা সবারই জানা। পরিবেশকে রক্ষা করেও পর্যটনকে বিকশিত করা যায়। এক্ষেত্রে সরকারি উদ্যোগ প্রয়োজন। দুর্ভাগ্যজনকভাবে আমাদের পর্যটনশিল্প অনিয়ন্ত্রিত। পর্যটকদের মধ্যেও সেভাবে সচেতনতা সৃষ্টি হয়নি। বিছনাকান্দিতে যারা বেড়াতে আসেন, তাদের বেশিরভাগের অসচেতনতার ফলে এখানকার পরিবেশ নষ্ট হচ্ছে। তারা পানীয়ের বোতল, খাবার বা চিপসের প্যাকেট যত্রতত্র ফেলে দিচ্ছেন। এতে প্রকৃতিসহ বিছনাকান্দির পরিবেশ ঝুঁকিতে পড়েছে। দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে অচিরেই তা ভয়াবহ পরিস্থিতির সৃষ্টি করবে।

এ ব্যাপারে রুস্তমপুর ইউপি চেয়ারম্যান শাহাব উদ্দিন শিহাব বলেন, বিছনাকান্দিতে পর্যটকের ঢল নামলেও তাদের খাওয়া-থাকার সুযোগ-সুবিধা নেই। ফলে যারা ঘুরতে আসেন, তাদের সিংহভাগই বাইরে থেকে খাবারের প্যাকেট নিয়ে আসেন। খাওয়ার পর প্যাকেটগুলো যেখানে-সেখানে ফেলে দেন। এতে পরিবেশ নোংরা হয়; দুর্গন্ধ ছড়ায়। কয়েকবার ইউনিয়ন পরিষদের পক্ষ থেকে বিছনাকান্দি এলাকা পরিস্কার করা হয়েছিল। দু'তিন দিন পর আগের অবস্থায় ফিরে আসে। পরিবেশ রক্ষা এবং পর্যটকদের সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিতে অতিসত্বর সরকারি উদ্যোগ প্রয়োজন।

পর্যটকরা অভিযোগ করেন, এখানে পর্যটকদের জন্য কোনো সুযোগ-সুবিধা নেই। যারা পানিতে নেমে আনন্দ করেন, তাদের কাপড় পাল্টানোর জন্যও নির্দিষ্ট কোনো স্থান নেই। টয়লেট ব্যবস্থা না থাকায় নারী ও শিশুরা মহাদুর্ভোগে পড়েন।

এ ব্যাপারে ইউপি চেয়ারম্যান শিহাব বলেন, পর্যটকদের জন্য ভাসমান টয়লেট নির্মাণ করা হলেও পরিবেশবাদীদের আন্দোলনের মুখে তা সরিয়ে ফেলা হয়েছে। স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদ পর্যটকদের নিরাপত্তার স্বার্থে বিছনাকান্দিতে সৌরবিদ্যুতের প্লান্ট বসালেও পাথরখেকোরা তা ভেঙে দিয়েছে। বিভিন্ন সময়ে সরকারের এমপি-মন্ত্রীসহ আমলারা বেড়াতে এসে বিছনাকান্দির পর্যটন সুযোগ-সুবিধা বাড়ানোর আশ্বাস দিলেও বাস্তবে তা হয়নি।

এ প্রসঙ্গে গোয়াইনঘাট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা নাজমুস সাকিব বলেন, পর্যটকরা সচেতন না হলে এসব নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন। স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদকে উদ্যোগ নিতে বলা হয়েছে। এছাড়া বিকল্প হিসেবে বিছনাকান্দিতে যারা চিপস্‌, পানিসহ প্লাস্টিক-সংশ্নিষ্ট পণ্য বিক্রি করেন; তাদের নিয়ে কমিটি করে দেওয়া হয়েছে। তারা পরিবেশের বিষয়টি নজরে রাখবেন। এতে পরিস্থিতির উন্নতি হবে বলে আশা করা যায়। তিনি আরও বলেন, পর্যটকদের সচেতন করার জন্য অতীতে সাইনবোর্ড লাগানো হয়েছিল। প্রয়োজনে নতুন করে আবারও সচেতনতামূলক প্রচার চালানো হবে।

আরও পড়ুন

×