খামারির আশার গুড়ে বালি
দেবাশীষ ভট্টাচার্য, শেরপুর
প্রকাশ: ১২ জুলাই ২০২২ | ১২:০০ | আপডেট: ১৩ জুলাই ২০২২ | ০০:৫৫
কোরবানি ঈদকে সামনে রেখে লাভের আশায় পশু পালন করে শেরপুরের অনেক খামারির স্বপ্ন পূরণ হয়নি। ন্যায্য দাম দূরের কথা, লোকসান দিয়ে বিক্রি করতে চেয়েও ক্রেতা পাননি তাঁরা। জেলায় অবিক্রীত রয়ে গেছে ৩১ হাজার পশু। গত বছর এ সংখ্যা ছিল মাত্র পাঁচ হাজার।
গরু বিক্রেতারা বলছেন, এবার হাটে হাটে ঘুরেও তাঁরা বড় গরুর ক্রেতার দেখা পাননি। তাই ভগ্নহৃদয়ে হাট থেকে গরু নিয়ে বাড়ি ফিরে গেছেন আশাহত খামারিরা।
শুধু গরু নয়, এবারের কোরবানির পশুর হাটে বড় ছাগলের দামও ছিল অনেক কম। অনেকে ন্যায্য দামে ছাগল বিক্রি করতে না পেরে জবাই করে মাংস বিক্রি করেছেন।
জেলা প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, এবার কোরবানি উপলক্ষে শেরপুরে বিক্রির জন্য প্রস্তুত ছিল ৮৪ হাজার ৪১৭টি পশু। কিন্তু জেলার ১৮টি পশুর হাটে বিক্রি হয়েছে মাত্র ৫২ হাজার ৭৩৩টি পশু। এতে ৩১ হাজারের কিছু বেশি পশু অবিক্রীত রয়ে গেছে। প্রাণিসম্পদ বিভাগ আশা করেছিল জেলা থেকে কমপক্ষে ১৫-২০ হাজার পশু রাজধানীসহ দেশের বড় হাটগুলোতে বিক্রি হবে। কিন্তু তাদের সে লক্ষ্য পূরণ হয়নি।
ব্যবসায়ী, কৃষক, খামারি, ইজারাদার ও প্রাণিসম্পদ বিভাগের কর্মকর্তারা জানান, শেরপুর, নালিতাবাড়ী, ঝিনাইগাতী ও নকলার পশুর হাটগুলোতে বড় গরুর ক্রেতা আসেন ঢাকা-গাজীপুর ও ময়মনসিংহ থেকে। বন্যাসহ নানা কারণে এবার পশুর হাটে বাইরের পাইকারদের আনাগোনা একেবারেই ছিল না। তাই বড় ও বেশি দামের গরু বিক্রি হয়নি।
শেরপুর জেলা শহরের কান্দাপাড়া মহল্লার খামারি তাহমিদ ইসরাক অলিদ। তিনি ঈদে বিক্রির জন্য তিনটি ষাঁড় লালনপালন করেন। তাঁর ষাঁড় তিনটি জেলায় আলোড়ন সৃষ্টি করে। বড় ষাঁড়টির নাম 'জমিদার'। এর ওজন ৩১ মণ। এছাড়া তাঁর 'রাজা' নামের ষাঁড়ের ওজন ২৫ ও 'বাদশা' নামের ষাঁড়ের ওজন ২২ মণ। এবারের হাটে বড় গরুর চাহিদা ও ক্রেতা কম থাকায় তিন হাট ঘুরে একটি গরুও বিক্রি করতে পারেননি।
তাহমিদ ইসরাক অলিদ বলেন, লাভের আশায় গরু পুষে বোকা বনে গেছেন। তাঁর 'জমিদারে'র পেছনে প্রতিদিন কমপক্ষে ৬০০ টাকা খরচ হয়। দুই বছর আগে তাঁকে এক লাখ ৮০ হাজার টাকায় ক্রয় করেন। শুধু খাবারের হিসাব করলে এ গরুর দাম হয় সাড়ে ৬ লাখ টাকা। কিন্তু ক্রেতারা এর দাম বলেন ৪ লাখ টাকা। রাজার দাম ৩ লাখ ও বাদশার দাম আড়াই লাখ টাকা বলার পর ক্রেতা না পেয়ে তিনটি ষাঁড়কেই তিনি বাড়ি নিয়ে এসেছেন।
সদর উপজেলার বাজিতখিলা ইউনিয়নের পশ্চিম কুমড়ী গ্রামের খামারি সুমন মিয়া। তাঁর ৩০ মণ ওজনের ষাঁড় 'ইউটিউবার'-কে বেশ কয়েকটি হাটে নিয়ে বিক্রি করতে পারেননি। লালনপালনে যা খরচ করেছেন, ইউটিউবারের দাম তার চেয়ে অনেক কম।
তিনি হতাশ কণ্ঠে বলেন, 'আর গরু পালমু না। এক হাটে গাড়ি করে নিয়া গেলে ১৫ হাজার টাকা খরচ হয়। এইভাবে তিনটি হাটে নিয়া গেছি। কিন্তু ক্রেতা পাই নাই। না নেওয়ার মতো দাম করে।'
শেরপুর সদর উপজেলার কামারেরচর হাটের ইজারাদার সুজন কর্মকার বলেন, এবার ইজারা নিয়ে টাকা ওঠাতে পারেননি। সাম্প্রতিক বন্যায় মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। অনেকেই কোরবানি দেননি। আবার গো-খাদ্যের দাম বেশি হওয়ায় খামারিদের গরু পুষতে অনেক বেশি খরচ হয়েছে। সেই তুলনায় দাম ছিল অনেক কম।
জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, তাঁদের লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে এবার পশু বিক্রি কিছু কম হয়েছে। জেলার উদ্বৃত্ত ১৫-২০ হাজার গরু বাইরে যাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু যায়নি ও বিক্রিও হয়নি। জেলায় বড় গরু কেনার মতো ক্রেতা কম। আবার খরচের হিসাব করে অনেকেই গরু বাইরে নিয়ে যাননি।
জেলার সাবেক প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা আব্দুল হাই বলেন, গত কোরবানি ঈদে পাঁচ হাজার পশু অবিক্রীত ছিল।