চাকরি ছেড়ে বাবা-ছেলের খামার
নিজেদের খামারে বাবা শেখ টিপু সুলতানের সঙ্গে ছেলে ফয়সাল আহম্মেদ-সমকাল
তানজীম আহমেদ, বাগেরহাট
প্রকাশ: ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২২ | ১২:০০ | আপডেট: ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২২ | ২২:৩০
একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে প্রকৌশলী হিসেবে চাকরি করতেন ফয়সাল আহম্মেদ। বেতন ছিল ৪৮ হাজার টাকা। ২০২০ সালের শেষের দিকের কথা। হঠাৎ একদিন চাকরি ছেড়ে দেওয়ার কথা ভাবেন তিনি। মনের কথাটি জানান বাবা-মাকে। তাঁরা কোনোভাবেই রাজি হননি। কিন্তু ছেলের কথাটি ফেলতেও পারেননি।
সে দিন বাড়ি ফিরে নদীর তীরবর্তী গাড়ফা ও চর উদয়পুর গ্রামের পতিত ৪৫ শতক জমি বর্গা নিয়ে গড়ে তোলেন মধুমতি এগ্রো ফার্ম। প্রথমে ফার্মে ৫০ হাজার টাকা বিনিয়োগ করে দেশি ফলের চাষ করেন। দুই-তিন মাসের ব্যবধানে ৬ লাখ টাকা বিনিয়োগ করে বারোমাসি তরমুজ চাষ করেন ফয়সাল। কিন্তু নানা কারণে তরমুজ গাছ পচে পুরো টাকাই ক্ষতি হয়। এতে দমে না গিয়ে বিদেশি বিভিন্ন জাতের ফল চাষ করেন তিনি। পরের বছর সফলতার মুখ দেখেন। এক বছরে তাঁর লাভ হয় প্রায় ১৩ লাখ টাকা। ফয়সালের খামারে এখন কাজ করছেন ১২ জন নারী-পুরুষ।
বাগেরহাটের মোল্লাহাট উপজেলার গাড়ফা গ্রামের বাসিন্দা শেখ টিপু সুলতানের ছেলে ফয়সাল। খুলনা পলিটেকনিক থেকে ২০১০ সালে মেকানিক্যাল ট্রেডে ডিপ্লোমা করে বেসরকারি চাকরিতে যোগ দেন।
ফয়সালের বাবা ছিলেন আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়নের সদস্য। প্রায় দুই যুগ আগে পায়ে আঘাত পান তিনি। এতেই চাকরি ছেড়ে চলে আসেন বাড়িতে। শুরু করেন কৃষি খামার ও পণ্য বিপণন। এখন বাবা-ছেলের খামারে জমির পরিমাণ প্রায় ১৫ বিঘা। পুরো জমিই বর্গা নেওয়া। এ জন্য বছরে ব্যয় হয় দেড় থেকে দুই লাখ টাকা।
খামারটিতে মধ্যপ্রাচ্যের ফল সাম্মামের পাশাপাশি চাষ করছেন বাসন্তি বেগুন, ব্লাক বেবি বারোমাসি তরমুজ, টপলেডি পেঁপে, ফিলিপাইনের কালো আখসহ নানা জাতের বিদেশি ফল। সব মিলিয়ে বছরে লাভ ১২ থেকে ১৩ লাখ টাকা।
ফয়সাল জানান, তাঁর খামারে সাম্মাম গাছ ১০ হাজার, বাসন্তি বেগুন ৬০০, টমেটো (বাহুবলি এবং জিরো টু সেভেন) ৭ হাজার, টপলেডি পেঁপে ১০০, ব্লাক বেবি তরমুজ দেড় হাজার এবং ফিলিপাইনের কালো আখ ৩ হাজার। এ ছাড়া বিদেশি আম, লিচু, কাঁঠালসহ নানা জাতের ফলের গাছ রয়েছে।
তিনি বলেন, সাম্মাম চাষে ৭৫ দিন সময় লাগে। এক জমিতে বছরে তিন থেকে চারবার চাষ করা যায়। প্রতিবার চাষ করতে ১০ থেকে ২০ হাজার টাকা ব্যয় হয়। প্রতিকেজি সাম্মাম ১০০ থেকে ২০০ টাকা বিক্রি হয়। এক বছরে সাড়ে ৪ লাখ টাকার সাম্মাম বিক্রি করেন তিনি।
করোনার সময় ইউটিউব দেখে কৃষিতে ব্যাপক আগ্রহ জন্ম হয় বলে জানিয়েছেন ফয়সাল। তিনি বলেন, কৃষির প্রতি ঝোঁক ছিল ছোটবেলা থেকেই। পরিবারের লোকজনও কৃষির প্রতি আগ্রহ ছিলেন। তিনি বলেন, '১০ বছরের চাকরি থেকে জমানো টাকা, বাবার সহায়তা এবং ঋণ করে ২০ লাখ টাকা বিনিয়োগ করি খামারে। প্রথম বছরের আয় থেকে ঋণের টাকা পরিশোধ করেছি।'
শেখ টিপু সুলতান বলেন, 'এখন আমরা বাবা-ছেলে ক্ষেতের দেখাশোনা করি। আল্লাহর রহমতে খুব ভালো আছি।'
উপাজেলা কৃষি কর্মকর্তা অনিমেষ বালা বলেন, সাম্মাম মূলত মরু অঞ্চলের ফল। এ দেশে ফলটি সাম্মাম হিসেবে পরিচিতি পেলেও অনেকে এটাকে রকমেলন বা হানিডিউ মেলনও বলেন। ফয়সাল আহমেদ বাগেরহাটে প্রথম বাণিজ্যিকভাবে ফলটির চাষ করেন। কৃষি বিভাগ তাঁকে সব ধরনের সহযোগিতা করছে।
- বিষয় :
- বাগেরহাট
- বাবা-ছেলের খামার
- খামার