ঢাকা শনিবার, ০৪ জুলাই ২০২৬

হাঁটতে হাঁটতে অসহায় রোজিনা দেখা পেলেন মানবিক ইউএনওর

হাঁটতে হাঁটতে অসহায় রোজিনা দেখা পেলেন মানবিক ইউএনওর
×

ইউএনওর সঙ্গে রোজিনা ও তার সন্তানরা -সমকাল

ঈশ্বরগঞ্জ (ময়মনসিংহ) প্রতিনিধি

প্রকাশ: ০৬ এপ্রিল ২০২০ | ২৩:১১ | আপডেট: ৩০ নভেম্বর -০০০১ | ০০:০০

রাত তখন সাড়ে আটটা। চোখে মুখে আতঙ্ক লেপ্টে আছে মা ও সন্তানদের। দিনভর কিছু খেতে না পেয়ে করুণ অবস্থা। মলিন মুখে রাস্তার ধার ঘেঁষে অবিরাম হেঁটে চলা। কোলে দুই বছর বয়সী ছেলে ইমরান। হাতে কাপড়ের ব্যাগ। মায়ের সঙ্গে হাঁটছে ছয় বছর বয়সী জাহিদুল। তার কাঁধে আরো একটি ব্যাগ। মায়ের পায়ে পা’ মিলিয়ে কতো পথ হেঁটেছে জাহিদুল তা বলা অসম্ভব। 

কনক্রিটের শহর ছেড়ে জন্মভূমে সন্তানদের নিয়ে ফিরে এসেছেন পোশাক শ্রমিক রোজিনা বেগম। করোনাকালে চারদিকে আতঙ্কের মধ্যে রোজিনার এ ঘরে ফেরার দীর্ঘ এক ‘যুদ্ধ’। এমন কঠোরতর পরিস্থিতিতে পড়তে হয়নি ২৬ বছরের জীবনেও। 

রোজিনার বাড়ি ঈশ্বরগঞ্জের রাজিবপুর ইউনিয়নের সুতিভরাট গ্রামে। তিনি ওই গ্রামের আমিনুল হকের মেয়ে। রোজিনা স্বামী আবুল বাশারের বাড়ি মগটুলা ইউনিয়নের মগটুলা গ্রামে। রোজিনা গাজীপুরের মালেকাবাড়ি এলাকায় ‘গিয়াস ফ্যাশন’ নামে একটি কারখানায় শ্রমিক হিসেবে কাজ করেন। তার স্বামী আবুল বাশার মালেকাবাড়িতেই একটি চালের দোকানে কাজ করে। 

করোনা ইস্যুতে সরকারি ছুটি শুরু হলে বন্ধ হয়ে যায় পোশাক কারখানায়। তাই ছুটিতে বাড়ি চলে আসে রোজিনা ও তার স্বামী। রোজিনার ছয় বছর বসয়ী ছেলে জাহিদুলকে বাবার বাড়িতেই রাখতেন। কিন্তু এবার ছুটিতে আসার পর দেশের খারাপ পরিস্থিতির কারণে ছেলেকে সঙ্গে করে নিয়ে যান। সংগ্রাম করে গাজীপুরে যাওয়ার পর জানতে পারেন তাদের কাজে যোগ দিতে হবে না। তাই ফের বাড়ি ফিরে এসেছেন।

কর্মস্থলে যোগ দিয়ে মাস শেষে মাইনে পাবেন এমন আশা নিয়ে গেলেও তা নিষ্ফল হয়ে যায়। বাড়ি ফিরে আসবেন এমন টাকাও নেই রোজিনাদের হাতে। স্বামী আবুল বাশার ৪০০ টাকা ধার করে স্ত্রী-সন্তানদের বাড়িতে পাঠানোর ব্যবস্থা করেন। টাকার অভাবে স্ত্রী-সন্তানদের সঙ্গে আসতে পারেননি আবুল বাশার। সড়কে যানবাহন চলাচলে কঠোরতার কারণে রোজিনাকে বাড়ি ফেরার পথে চরম কষ্ট করতে হয়েছে।

খোলা যানবাহনে অতিরিক্ত ভাড়া গুনতে গুনতে সব টাকা শেষ হয়ে যায় মাঝপথেই। সোমবার সকাল ৯ টায় যাত্রা শুরু করা রোজিনাদের তপ্ত রোদে অনেক পথ হাঁটতেও হয়েছে। সকালে এক মুঠো ভাত খেতে পারলেও দিনভর আর কিছু খাওয়া হয়নি রোজিনার। দুই ছেলেকে নিয়ে মলিন মুখে বাড়ির পথে থাকা রোজিনার অসহায়ত্বের কথা শুনে এক ব্যক্তি আরো ১০০ টাকা দেন তাকে। তা দিয়ে কিছু পথ যেতে পারেন তিনি। পরে রাত ৮টার দিকে মধুপুর বাজারে পৌঁছান রোজিনা। 

কিন্তু রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে রোজিনার মনে আতঙ্ক দেখা দেয়। পেটে নেই খাবার। ওদিকে রাত বাড়ছে। সড়কে নেই কোনো যানবাহন। অনেকক্ষণ যানবাহনের জন্য অপেক্ষার পর নদীর কোল ঘেঁষা গ্রামের ঝোপ-জঙ্গলের সড়ক ধরে বাড়ি যেতে হবে একা হেঁটে, জীবনে কখনও হয়তো কল্পনাও করেনি। তবুও এই করোনাকালে নিরুপায় হয়ে হাঁটতে শুরু করেছিলেন রোজিনা। 

কিন্তু হঠাৎ রোজিনার সামনে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার গাড়ি। সোমবার রাত সাড়ে ৮ টার দিকে রোজিনার দেখা মেলে ঈশ্বরগঞ্জের মগটুলা ইউনিয়নের মধুপুর-রাজিবপুর সড়কের মধুপুর উত্তরবাজারে। ঈশ্বরগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. জাকির হোসেনের রাত্রিকালীন মনিটরিং করার সময় গাড়ির সামনে পড়েন রোজিনা। রোজিনাকে তার গন্তব্যে পৌঁছে দিতে তোলা হয় গাড়িতে। প্রায় ৬ কিলোমিটার দূরে রোজিনার বাড়িতে পৌঁছে দেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা জাকির হোসেন। সেই সঙ্গে রোজিনাকে চাল, ডালসহ কিছু খাদ্যসামগ্রীও তুলে দেন। 

যন্ত্রণাবহুল যাত্রা পথের শেষাংশে মানবিক এক ইউএনওর দেখা মেলা সৌভাগ্য মনে করেছেন রোজিনা। রাতের এই ছোট পথও অনেক দীর্ঘ হতো ক্ষুদা-তৃষ্ণায় কাতর রোজিনা ও তার ছেলের। একজন মানবিক ইউএনওর দেখা মেলায় শেষটা তাদের ‘মধুর’ হয়েছে। সরকারি গাড়িতে যাত্রার শেষ অংশে বাড়ি ফেরার সুযোগ পাওয়ার পাশপাশি খাদ্যসামগ্রী পেয়ে আপ্লুত রোজিনা-চোখের জলে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন ইউএনওর প্রতি। 

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. জাকির হোসেন বলেন, রাত্রিকালীন মনিটরিংয়ের সময় দুই শিশু সন্তান নিয়ে অসহায় রোজিনার দেখা মেলে। ওই অবস্থায় তাকে গন্তব্যে পৌঁছে দেওয়া হয়।


আরও পড়ুন

×