বিশ্ব বাঘ দিবস
নানা সংকটে বাঘ বিপদে
মামুন রেজা, খুলনা
প্রকাশ: ২৮ জুলাই ২০২৩ | ১৮:০০ | আপডেট: ২৯ জুলাই ২০২৩ | ০৭:৫১
দূষণ, নির্বিচারে গাছ কাটা, অপরিকল্পিত পর্যটনসহ নানা কারণে সুন্দরবনে কমছে বাঘের অনুকূল পরিবেশ। পিটিয়ে বাঘ হত্যা, শিকারও চলছে সমানতালে। মানুষের এসব আগ্রাসনের পাশাপাশি রয়েছে প্রাকৃতিক বাধাও। অসুস্থতা, দুর্যোগ ও বার্ধক্যজনিত কারণেও মারা পড়ছে বাঘ। গেল চার বছরে সুন্দরবন থেকে মিলেছে বাঘের সাতটি মৃতদেহ আর তিনটি চামড়া। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে জোয়ারের সময় বনভূমি ডুবে যাওয়ার পরিমাণ বেড়ে যাওয়ায় কমেছে বাঘের বিচরণক্ষেত্র। আবার লবণাক্ততা বেড়ে যাওয়ায় প্রয়োজনীয় মিষ্টিপানি পাচ্ছে না বাঘ। ২০১৩ সালের শুমারি অনুযায়ী সুন্দরবনে বাঘের সংখ্যা ১০৬। ২০১৮ সালে ক্যামেরা ট্র্যাপিং পদ্ধতিতে করা শুমারি অনুযায়ী সুন্দরবনে বাঘের সংখ্যা ছিল ১১৪টি। এ পটভূমিতে আজ নানা আয়োজনে পালিত হচ্ছে বিশ্ব বাঘ দিবস।
এসব হতাশাজনক খবরের মধ্যেও আছে কিছুটা আশার আলো। আগস্টে শুরু হচ্ছে বাঘ সংরক্ষণ প্রকল্পের কাজ। এ ছাড়া সুন্দরবনের দুটি রেঞ্জে বাঘশুমারির কাজ শেষ হয়েছে সম্প্রতি। নভেম্বরে শুরু হবে বাকি দুটি রেঞ্জের শুমারির কাজ। বাঘের শিকার প্রাণী হরিণ-শূকরও শুমারিতে অন্তর্ভুক্ত থাকবে।
বাঘ গবেষক ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ড. এম এ আজিজ সমকালকে বলেন, সুন্দরবনের বাঘের প্রধান খাদ্য হরিণ ও শূকর। হরিণ শিকার এখনও বন্ধ হয়নি। এটি বাঘের জন্য পরোক্ষ হুমকি।
খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশবিজ্ঞান ডিসিপ্লিনের প্রধান অধ্যাপক ড. আবদুল্লাহ হারুন চৌধুরী বলেন, বনের আশপাশের এলাকায় গ্যাস, জ্বালানি তেল, সিমেন্ট ফ্যাক্টরিসহ অসংখ্য শিল্পকারখানা গড়ে উঠেছে। এসব কারখানার তরল বর্জ্য পশুর নদে ফেলা হচ্ছে। জোয়ার-ভাটায় এ বর্জ্য বনের মাটিতে ছড়িয়ে পড়ছে। এতে বাঘের ক্ষতি হচ্ছে। এ ছাড়া জাহাজের আলো ও শব্দ বাঘের স্বাভাবিক জীবনযাপনে ছন্দপতন ঘটাচ্ছে। এ ছাড়া কিছুসংখ্যক জেলে বিষ দিয়ে মাছ ধরছে। এই পানি পান করলে বাঘের ক্ষতির শঙ্কা রয়েছে।
সুন্দরবন একাডেমির নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপক আনোয়ারুল কাদির বলেন, বাঘের হুমকিগুলো কমেনি; বরং দিন দিন আরও বাড়ছে। সাম্প্রতিক সময়ে বাঘ হত্যা কিছুটা কমলেও একেবারেই বন্ধ হয়নি। তিনি বলেন, বনের গাছপালা কেটে বাঘের বসতি হুমকির মুখে ফেলছে কিছু মানুষ। পর্যটকরা অবাধে বাঘের অভয়ারণ্য এলাকায় ঢুকে পড়ছে। পর্যটক বহনকারী জলযানে অনেক সময় উচ্চ শব্দে গান বাজানো হচ্ছে। এসব বাঘের ওপর বিরূপ প্রভাব পড়ছে।
সুন্দরবন একাডেমির উপদেষ্টা রফিকুল ইসলাম খোকন বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে জোয়ারের সময় নদীর পানির উচ্চতা বাড়ছে। বনভূমিতে লবণাক্ততা বেড়ে যাওয়ায় সে পানি পান করে বাঘ অসুস্থ হয়ে পড়ছে।
এদিকে ঘূর্ণিঝড়ের প্রভাবে জলোচ্ছ্বাস ও অস্বাভাবিক জোয়ার মোকাবিলার কোনো প্রস্তুতি বা ব্যবস্থা নেই সুন্দরবনে। প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময় নিরাপদ আশ্রয়স্থল না থাকায় বিপাকে পড়ে বাঘসহ অন্য বন্যপ্রাণী।
সুন্দরবনের করমজল বন্যপ্রাণী প্রজনন কেন্দ্রের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা হাওলাদার আজাদ কবীর জানান, নিম্নচাপ ও অমাবস্যা-পূর্ণিমার প্রভাবে মাঝেমধ্যে অস্বাভাবিক জোয়ারে সুন্দরবনের বনভূমি প্লাবিত হয়। প্রতিবার প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময় আশ্রয়স্থল না থাকায় হুমকির মুখে পড়ে বাঘসহ বন্যপ্রাণী।
নভেম্বরে দুটি রেঞ্জে বাঘশুমারি
বন বিভাগ জানায়, গত জানুয়ারি থেকে এপ্রিল পর্যন্ত ক্যামেরা ট্র্যাপিং পদ্ধতিতে সুন্দরবনের সাতক্ষীরা ও খুলনা রেঞ্জে বাঘশুমারি করা হয়। আগামী নভেম্বর থেকে বনের চাঁদপাই ও শরণখোলা রেঞ্জে একই পদ্ধতিতে বাঘশুমারি হবে। প্রতিটি রেঞ্জের ১৪৫টি পয়েন্টে দুটি করে ক্যামেরা স্থাপন করা হবে, যা থাকবে ৪০ দিন।
এরই মধ্যে গোটা সুন্দরবনে খাল সার্ভের মাধ্যমে বাঘের পায়ের ছাপ সংগ্রহ করা হয়েছে। ক্যামেরা ট্র্যাপিং পদ্ধতিতে পাওয়া ছবি এবং বাঘের পায়ের ছাপ ঢাকায় ল্যাবে পর্যালোচনা করা হবে। এর পর ২০২৪ সালের ২৯ জুলাই বাঘ দিবসে শুমারির ফল প্রকাশের পরিকল্পনা রয়েছে।
এদিকে, ২০২২ সালের ২৩ মার্চ প্রায় ৩৬ কোটি টাকা ব্যয়ে সুন্দরবন বাঘ সংরক্ষণ প্রকল্পের অনুমোদন দেয় মন্ত্রণালয়। গত অর্থবছরে প্রকল্পটির আওতায় বরাদ্দ মেলে ২ কোটি ১৯ লাখ টাকা, যা দিয়ে বাঘশুমারি শুরু করা হয়। বাঘশুমারির জন্য ব্যয় হবে মোট ৩ কোটি ২৬ লাখ ৯৬ হাজার টাকা। এই অর্থবছরে প্রকল্পটির আওতায় বরাদ্দ পাওয়া গেছে ৫ কোটি টাকা। পর্যায়ক্রমে বাকি টাকা পাওয়া যাবে বলে জানিয়েছে বন বিভাগ।
প্রকল্প পরিচালক ও সুন্দরবন পশ্চিম বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা ড. আবু নাসের মো. মহসিন হোসেন জানান, প্রকল্পের আওতায় বাঘ সংরক্ষণে আগস্ট থেকে বিভিন্ন কাজ করা হবে। লোকালয়ে বাঘ আসা ঠেকাতে বনের ১৫ কিলোমিটার অংশে নাইলনের ফেন্সিং দেওয়া হবে। ঘূর্ণিঝড়ের সময় বাঘ ও অন্য প্রাণীর আশ্রয়ের জন্য বনে ১২টি মাটির কিল্লা স্থাপন করা হবে। বাঘের আবাসস্থল সুন্দরবনে প্রায় প্রতিবছর আগুন লেগে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। শুষ্ক মৌসুমে সুন্দরবনের যে অংশে আগুন লাগার প্রবণতা বেশি, সে জায়গায় দুটি পর্যবেক্ষণ টাওয়ার নির্মাণ ও সুন্দরবনে আগুন লাগলে যাতে তাৎক্ষণিক নেভানো যায় সে জন্য যন্ত্র, পাইপ ও ড্রোন কেনা হবে।
তিনি আরও জানান, প্রকল্পের মেয়াদ ২০২৫ সালের মার্চ পর্যন্ত। অর্থ বরাদ্দ পাওয়ার পর প্রকল্পের আওতায় বনের যে এলাকায় বাঘ বেশি রয়েছে, সেখান থেকে কয়েকটি বাঘ অন্য যে এলাকায় কম রয়েছে সেখানে স্থানান্তর করার কথা। দুটি বাঘে স্যাটেলাইট কলার স্থাপনের মাধ্যমে তদারকি করা, বাঘের পরজীবীর সংক্রমণ ও অন্য রোগব্যাধি এবং মাত্রা নির্ণয় করার কথা রয়েছে।
- বিষয় :
- খুলনা
- বিশ্ব বাঘ দিবস
