ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

সালথা

অসচ্ছল কৃষকের প্রণোদনা পেলেন সরকারি চাকরিজীবী ও ব্যবসায়ীরা

অসচ্ছল কৃষকের প্রণোদনা পেলেন সরকারি চাকরিজীবী ও ব্যবসায়ীরা
×

প্রণোদনার চেক নিচ্ছেন সালথা উপজেলা পরিষদের অফিস সহায়ক শাহাদত হোসেন। ছবি: সমকাল

সাইফুল ইসলাম, সালথা (ফরিদপুর) প্রতিনিধি

প্রকাশ: ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৩ | ১৪:৩১ | আপডেট: ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৩ | ১৪:৪২

ফরিদপুরের সালথায় পানির অভাবে পাট জাগ দেওয়া নিয়ে বিপাকে পড়া অসচ্ছল কৃষকদের জন্য বরাদ্দকৃত প্রণোদনার টাকার চেক সরকারি চাকরিজীবী, ব্যবসায়ী ও সচ্ছল ব্যক্তিদের মাঝে বিতরণ করা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এতে ক্ষোভে ফুঁসে উঠেছেন অসচ্ছল প্রান্তিক কৃষকরা। তাদের দাবি, পাট অধিদপ্তরের কৃষি প্রণোদনার খবর তারা জানেনই না। তাদের অভিযোগ পাট অফিসের কর্মকর্তার যোগসাজশে প্রণোদনার এই টাকা ভাগাভাগি করে নিয়েছেন চাকরিজীবী ও ব্যবসায়ীরা।  

জানা যায়, পাট উৎপাদনে দেশসেরা সালথায় এবার ভরা মৌসুমে নদ-নদী ও খাল-বিলে পর্যাপ্ত পানি না হওয়ায় পাট পচাতে বাড়তি খরচ বিবেচনায় পাট অধিদপ্তর পাইলট প্রকল্পের মাধ্যমে অসচ্ছল কৃষকদের প্রণোদনা দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। এরই ধারাবাহিকতায় সালথায় ৮ জন অসচ্ছল কৃষককে ১১ হাজার ৮০০ টাকা করে একেকটি চেক বরাদ্দ দেওয়া হয়। কিন্তু বেশিরভাগ কৃষকই জানেন না এই প্রণোদনার কথা।

চেক বিতরণের তালিকায় দেখা যায়, সালথার ৮ জন অসচ্ছল কৃষকের স্থলে চেক গ্রহণ করেছেন সালথা উপজেলা পরিষদের অফিস সহায়ক শাহাদত হোসেন, রামকান্তপুর গ্রামের গরুর খামার ব্যবসায়ী হাফিজুর রহমান, একই গ্রামের ধনাঢ্য ব্যবসায়ী ও উপজেলা ক্রীড়া সংস্থার সাধারণ সম্পাদক জাহিদ হাসান এমেলি, ফুকরা বাজারের ব্যবসায়ী আবুল হোসেন, রামকান্তপুর ইউনিয়নের ব্যবসায়ী মোক্তার মোল্যা, ইব্রাহিম হোসেন ও যদুনন্দী ইউনিয়নের মো. আবুল হাসান।

সালথার উপজেলার আটঘর ইউনিয়নের বিভাগদী গ্রামের কৃষক মজিবর সরদার বলেন, ‘পানির অভাবে পাট জাগ দিতে পারিনি। নোংরা পানিতে পাট জাগ দেওয়ায় পাটের কালার নষ্ট হয়ে গেছে। আবার অনেকের পাট ক্ষেতেই শুকিয়ে মরে গেছে। এবার এক বিঘা জমিতে সর্বোচ্চ ১০ থেকে ১২ মণ পাট হয়েছে। প্রতি বিঘায় খরচ হয়েছে ১৭ থেকে ১৮ হাজার টাকা করে। এমন অবস্থায় পাটের যে দাম পাচ্ছি তাতে আমাদের খরচই উঠছে না।’ 

এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘পাট অধিদপ্তর থেকে আমাদের মতো ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকরা কোনো ধরনের প্রণোদনা পায়নি। এমনকি এই বিষয় আমরা কিছু জানিও না।’

সালথা উপজেলা পরিষদের অফিস সহায়ক সোনাপুর ইউনিয়নের বড় বাংরাইল গ্রামের বাসিন্দা শাহাদাত হোসেন বলেন, ‘আমি সরকারি চাকরির পাশাপাশি বাড়িতে কৃষি কাজ করি। আমার বাবার কৃষি জমি আছে। আমি এক বিঘার একটু বেশি ৫০ শতাংশ জমিতে পাট বুনেছি। আমার বাড়ির সামনে গর্ত করে মেশিন দিয়ে পানি দিয়ে পাট পচাইছি। আমি পাট অফিসের কর্মকর্তাকে বলেছিলাম এবার পাটের খরচ অনেক বেশি, পাটের দামে তো খরচ ওঠে না। তখন কর্মকর্তা বলেছিলেন, আমরা পাটের প্রণোদনা দেব, দেখি তখন আপনাকে দেওয়া যায় কিনা।’ 

সালথা উপজেলা উপ-সহকারী পাট উন্নয়ন কর্মকর্তা আব্দুল বারী বলেন, ‘এবার যাদের পাটের প্রণোদনা দিয়েছি তারা সবাই ক্ষতিগ্রস্ত। এরা সবাই ওই সময় গর্ত খুড়ে মেশিন দিয়ে পানি ভরে পাট জাগ দিয়েছিল। আমি নিজে বাছাই-বাছাই করে প্রণোদনার তালিকা করেছি। এখানে কোনো ধরনের অনিয়ম হয়নি।’

গরিব কৃষককে না দিয়ে ধনী কৃষককে কেন দেওয়া হলো জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এমন কোনো নিয়ম এখানে বলা হয়নি। বলা হয়েছে কৃষক হতে হবে।’

সালথা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. আনিছুর রহমান বালী বলেন, ‘আমি এখানে যোগদানের পূর্বেই তালিকা তৈরি করা হয়েছে। তারপরেও আমি চাষিদের মাঝে প্রণোদনার টাকার চেক দেওয়ার সময়, তারা পাট চাষি কিনা এটা নিশ্চিত হয়ে প্রণোদনার টাকার চেক দিয়েছি। তারপরও যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে, আমরা তাদের ব্যাপারে তদন্ত করব। তারা কৃষক না হলে, এই ঘটনায় সঙ্গে যারা জড়িত তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করব।’

ফরিদপুর জেলা পাট অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক জাহিদুর ইসলাম বলেন, ‘কৃষক নির্বাচনে কোনো অনিয়ম হয়েছে কিনা তা আমার জানা নেই। আমি এই প্রকল্পের সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের খোঁজ নিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে বলব।’

কৃষি বিভাগের তথ্যমতে সালথা উপজেলায় ৩২ হাজার ৮০০ টি কৃষক পরিবার পাট চাষের সঙ্গে সরাসরি জড়িত। যাদের অধিকাংশই অসচ্ছল ও প্রান্তিক কৃষক।

আরও পড়ুন

×