করোনাকাল
শেষ যাত্রার স্বজন তারা
চট্টগ্রামের স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন এসআইপিএফের সদস্যরা সমকাল
আহমেদ কুতুব, চট্টগ্রাম
প্রকাশ: ২৮ জুন ২০২০ | ১২:০০
করোনায় আক্রান্ত হয়ে সম্প্রতি চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে মৃত্যুবরণ করেন হাটহাজারীর রোজিয়া বেগম। করোনার ভয়ে তার কাছে যাচ্ছিলেন না কোনো স্বজন। তার বড় ছেলে অদূরে দাঁড়িয়ে শুধু একবার দেখছিলেন মায়ের মৃতদেহ। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ রোজিয়ার (৬৫) মৃত্যু সনদ বুঝিয়ে দেওয়ার পরপরই উধাও হয়ে যান রোজিয়ার ছেলে ও স্বজনরা।
এ অবস্থায় প্রশাসনের ডাক পায় চট্টগ্রামের মুর্দাসেবা প্রদানকারী স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন এসআইপিএফ। এই টিমের সদস্যরা নিজস্ব খরচেই মরদেহের গোসল-কাফন শেষে নগরীর আরেফিন নগর সিটি করপোরেশন মুক্তিযোদ্ধা কবরস্থানে রাতের আঁধারে রোজিয়াকে দাফন করেন। শেষ বিদায়ে রোজিয়ার কোনো স্বজনই পাশে ছিলেন না।
এসআইপিএফ বলছে, আক্রান্ত হয়ে কিংবা উপসর্গ নিয়ে মৃত পুরুষের লাশ সহজেই গোসল করানো সম্ভব হলেও নারীদের ক্ষেত্রে বিষয়টি স্পর্শকাতর। বিশেষভাবে প্রশিক্ষিত না হলে ধর্মীয় রীতি মেনে এ ধরনের নারীদের মৃতদেহের গোসল ও কাফনের আয়োজন করা কঠিন। আর এই কঠিন কাজটিই সুচারুরূপে করছেন তারা।
করোনায় মৃত নারীদের লাশের কাছে কেউ না গেলেও হাসপাতালে কিংবা বাসায় ছুটে যান তারা। স্বেচ্ছাশ্রমে পরম মমতায় মৃত নারীদের গোসল করিয়ে শেষ যাত্রার জন্য প্রস্তুত করেন। এ দলে রয়েছেন ১৫ নারী। গত তিন মাসে চট্টগ্রাম মহানগরে করোনায় আক্রান্ত ও উপসর্গ নিয়ে মৃত ১০৯ নারীকে গোসল করিয়ে শেষ বিদায় জানিয়েছে এ মানবিক দলটি। এর নেপথ্যে থেকে নেতৃত্ব দিচ্ছেন মোহাম্মদ শাহজাহান ও সেলিনা কানিজ নামের দুই ভাই-বোন।
স্বেচ্ছাসেবী নারীরা হলেন- রাহেলা বেগম, হালিমা বেগম, জুলেখা বেগম, শিরিন বেগম, খুশি বেগম, মমতাজ বেগম, জাহানারা বেগম, আছমা আক্তার, নুরুন নাহার, কহিনুর আক্তার, মনোয়ারা বেগম, মরিয়ম বেগম ও আসমা আক্তার। তাদের বেশিরভাগের বয়স ৪০ থেকে ৫০ বছর। কারও বয়স একটু বেশি।
তবে হাসপাতালে গিয়ে এই মানবিক কাজটি করতে গিয়েও তারা প্রতিনিয়ত নানা অনাকাঙ্ক্ষিত ও হৃদয়বিদারক ঘটনার মুখোমুখি হচ্ছেন। মুর্দাসেবীদের প্রধান রাহেলা বেগম বলেন, 'আমাদের হেল্পলাইনে কল পেলে ২০ মিনিটের মধ্যেই চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে হাজির হই আমরা।'
তিনি জানান, রোজিয়ার বড় ছেলের ফোন নম্বরে অনেকবার কল দেওয়ার পর ফোন ধরে তিনি বলেন, 'আপনারা সেরে ফেলেন!' এরপর তার ফোন বন্ধ। এ এক অন্যরকম দৃশ্য। প্রতিনিয়ত এ রকম বহু বেদনাদায়ক ঘটনার সাক্ষী হচ্ছেন এ মুর্দাসেবিকারা।
সামাজিক দায়বদ্ধতা থেকেই খুবই ক্ষুদ্র পরিসরে ২০১৫ সাল থেকে দুই ভাই-বোন 'এসআইপিএফ মুর্দাসেবা প্রকল্প' গঠন করে এ মানবিক কাজটি শুরু করেন। সংগঠনের প্রধান আলোকচিত্রী মোহাম্মদ শাহজাহান সমকালকে বলেন, 'শহরে আমাদের চারপাশে পুরুষ মারা গেলে সহজেই মসজিদের মুয়াজ্জিনরা লাশের গোসল করিয়ে ফেলেন। কিন্তু নারীরা মারা গেলে পড়তে হয় সংকটে। ধর্মীয় রীতি মেনে নারীদের গোসল করানোটা কঠিন কাজ। এই চিন্তা থেকেই ১৫ জনের একটি মুর্দাসেবিকা টিম গঠন করি আমরা দুই ভাই-বোন।'
তিনি বলেন, 'করোনা আক্রান্ত হয়ে ও উপসর্গ নিয়ে মৃত নারীদের ইসলামিক ফাউন্ডেশনের গাইডলাইন অনুযায়ী গোসল করিয়ে শেষ বিদায় জানাচ্ছেন আমাদের স্বেচ্ছাসেবক দল। তবে একটি অ্যাম্বুলেন্স উপহার পেলে আমাদের এ মানবিক কাজটি চালিয়ে যাওয়া অনেকটা সহজ হয়ে যাবে।'
সেলিনা কানিজ বলেন, করোনা হানা দেওয়ার শুরুতেই চট্টগ্রাম সিভিল সার্জন কার্যালয় থেকে করোনা এ রোগে মৃতদের গোসল ও কাফনে তাদের ১৫ মুর্দাসেবীকে বিশেষ প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। এখন তাদের হেল্প লাইন-০১৮৯২৭৮৫০৫৫ নম্বরে ফোন করলেই সেখানে গিয়ে তারা সেবা দিচ্ছেন।
জানা গেছে, বর্তমানে নগরের চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতাল, মা ও শিশু হাসপাতালসহ বিভিন্ন হাসপাতালে গিয়ে মুর্দাসেবীরা মৃতদেহের গোসল ও কাফনের কাজটি করে যাচ্ছেন। পরিচিতজনদের নিয়ে নগরের ২৭টি ওয়ার্ডে নারীদের গোসল ও কাফন বিষয়ক স্বেচ্ছাসেবী দল গঠন করছেন তারা। এ জন্য ২০৩ নারীকে প্রশিক্ষণ দিচ্ছেন।
- বিষয় :
- করোনা