‘ব্যাঙের নিগা ঘাট বানাইছে ওই ঘাট মানুষের নিগা না’
ঘাটাইল উপজেলার দিগড় ইউনিয়নের চুংলিপাড়া গ্রামে ক্ষুদ্র ডোবায় সাত লাখ টাকার ঘাট সমকাল
ঘাটাইল (টাঙ্গাইল) প্রতিনিধি
প্রকাশ: ২০ জুলাই ২০২৫ | ০০:৫৯
ডোবায় শান বাঁধানো ঘাট। যা দেখে কেউ মুখ টিপে হাসেন, কেউ আবার ফেটে পড়েন অট্টহাসিতে। কারও কপালে চিন্তার ভাঁজ। সরকারের পুকুর ও খাল উন্নয়ন প্রকল্পের কাজ এটি। ঘাট নিয়ে গত শুক্রবার এলাকাবাসী হাসি ও চিন্তার কারণ প্রকাশ করেন সমকালের কাছে। ডোবায় ডুবানো হয়েছে সরকারি প্রায় সাত লাখ টাকা। ঘটনাটি ঘটেছে ঘাটাইল উপজেলার দিগড় ইউনিয়নের চুংলিপাড়া গ্রামে।
২০২৩-২৪ অর্থবছরে পুকুর ও খাল উন্নয়ন প্রকল্পে চুংলিপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় পুকুরে ঘাট নির্মাণে বরাদ্দ দেওয়া হয় ছয় লাখ ৮৭ হাজার টাকা। সম্প্রতি শেষ হয়েছে নির্মাণকাজ। কাজের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত স্থানীয়দের মনে ছিল কৌতূহল। ডোবায় শান বাঁধানো ঘাট! তাদের মনে প্রশ্ন ছিল, কে ব্যবহার করবে এই ঘাট? স্কুলের দক্ষিণ পাশে আজহার মিয়ার দোকান। সেখানে বসে শুক্রবার বিকেলে আড্ডা দিচ্ছিলেন যুবক ও মধ্যে বয়স্ক কয়েকজন ব্যক্তি। এই প্রতিবেদক ঘাট নির্মাণ বিষয়ে কথা তুলতেই আব্দুল করিম নামে একজন মুখ টিপে হাসলেন। অন্যরা চুপ। সংবাদকর্মী পরিচয় পাওয়ার পর করিম জবান খুললেন। তিনি বললেন, ‘ভাবছিলাম আন্নেরা সরকারি লোক। তাই কতা কবার চাই নাই। ব্যাঙের নিগা (জন্য) ঘাট বানাইছে, ওই ঘাট তো মানুষের নিগা না। সরকারের লোকজন মনে হয় পাগল অইছে। তা না আইলে.......(গালি) এনু এইডা করল ক্যা।’ করিমের কথা শেষ না হতেই অট্টহাসিতে ফেটে পড়লেন কয়েকজন যুবক। হাসাহাসির রোল পড়ে যায়।
ডোবার পাড়সংলগ্ন ঘর আনোয়ার হোসেনের। তাঁর ভাষ্য, এই জায়গায় ব্যাঙের চাষ করা গেলে ফলন ভালো পাওয়া যেত। অযথাই নষ্ট করা হয়েছে সরকারের লাখ লাখ টাকা। এর অর্ধেক টাকা দিয়ে ডোবাটা ভরাট করে দিলে বাচ্চারা খেলাধুলা করতে পারত। আশপাশে অনেক শিশু রয়েছে ঘাট থেকে পড়ে যে কোনো সময় ঘটতে পারে দুর্ঘটনা। তিনি আক্ষেপ করে বলেন, এসব দেখার কেউ নেই।
চুংলিপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক অনিমা রানী দাস বলেন, স্কুলের পাশে এটি পুকুর নয়, ডোবা। চারপাশের বাড়ির ময়লা পানির আশ্রয়স্থল এটি। জমির পরিমাণ তিন শতাংশ হবে। এখানে সরকারিভাবে ঘাট নির্মাণ করা হয়েছে। ২০২৪ সালের এপ্রিলে তিনি এই স্কুলে যোগদান করেছেন। এর আগেই ঘাটের বরাদ্দ পাওয়া যায়। বাচ্চাদের খেলার কোনো জায়গা নেই। ভরাট করা গেলে বরং ভালো হতো। এই ঘাট কোনো উপকারে আসছে না, আর আসবেও না। বরং হতে পারে স্কুলের বাচ্চাদের জন্য বিপদের কারণ। তাঁর ভাষ্য, ওই সময় এটার দায়িত্বে ছিলেন ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক ইয়াসার হোসেন সিদ্দিকী। তিনি জানান, তাঁর দায়িত্বের সময় একদিন খালিদ নামে এক উপসহকারী প্রকৌশলী এসে বললেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার একটি প্রকল্প আছে, আপনারা ইচ্ছা করলে গ্রহণ করতে পারেন। এ কথা শুনে ডোবার সীমানা প্রাচীর করে দেওয়ার কথা বলেন তিনি। পরে প্রকৌশলী একটি ফরম দেন। সেখানে সই করতে বললে তিনি প্রকৌশলীর কথামতো সই করে দেন। এরপর জানতে পারেন ঘাট নির্মাণের প্রকল্প দেওয়া হয়েছে।
এলজিইডি’র উপজেলা প্রকৌশলী ফজলুর রহমান বলেন, ‘আমি যোগদান করার আগেই ঘাটের ফাইনাল কাজ হয়ে গেছে। এ বিষয়ে উপসহকারী প্রকৌশলীদের সঙ্গে কথা বলে জানতে পেরেছি, স্কুল কর্তৃপক্ষের চাহিদা অনুয়ায়ী নাকি এই প্রকল্প দেওয়া হয়েছিল। তবে ওইখানে ঘাটটা করা ঠিক হয়নি।’
ইউএনও আবু সাঈদের ভাষ্য, বিষয়টি খোঁজ নিয়েছেন তিনি, ওইখানে ঘাট নির্মাণ না করে এই টাকা অন্য জায়গায় ব্যবহার করার সুযোগ ছিল।
- বিষয় :
- ঘাটাইল
