বঞ্চনার গ্রাম চর রামমোহন
‘চরবাসী জীবন কাটাই ব্রহ্মপুত্রের স্রোতের মতো ভেসে ভেসে’
গ্রামের নাম চর রামমোহন। ছবি: সমকাল
ঈশ্বরগঞ্জ (ময়মনসিংহ) সংবাদদাতা
প্রকাশ: ২৪ জুলাই ২০২৫ | ০৫:৩১ | আপডেট: ২৪ জুলাই ২০২৫ | ১০:৪৭
অবহেলা আর বঞ্চনার একটি গ্রাম চর রামমোহন। গ্রামটির উত্তর ও পূর্বপাশ দিয়ে বয়ে গেছে ব্রহ্মপুত্র নদ। নদের পার ঘেঁষে অন্তত দেড় শতাধিক বছর আগে গড়ে ওঠে এই গ্রাম। এটি কাগজে-কলমে ঈশ্বরগঞ্জ উপজেলার রাজিবপুর ইউনিয়নের অন্তর্ভুক্ত হলেও বাস্তবে যেন একটি ‘ছিটমহল’। এই গ্রামে নেই চলাচলের রাস্তাঘাট, স্কুল, নেই কোনো চিকিৎসাকেন্দ্র। স্বাধীনতার এত বছর পরও এখানে পৌঁছেনি সরকারি কোনো মৌলিক সেবা।
গ্রামের প্রবীণ বাসিন্দারা জানান, বর্তমানে অন্তত ৫০০ মানুষ বসবাস করেন এখানে। কিন্তু যুগের পর যুগ ধরে তারা শিক্ষা, চিকিৎসা ও যোগাযোগসহ সব ধরনের নাগরিক সুবিধা থেকে বঞ্চিত।
৮০ বছর বয়সী আব্দুর রহমান বলেন, ‘জন্মের পর থেকেই দেখছি, এই চরে স্কুল নাই, ডাক্তার নাই, রাস্তা নাই। সরকার কই? কেউ খবর নেয় না। ভোট চাইতে এলেই শুধু খোঁজ পড়ে। আমরা চরবাসী জীবন কাটাই ব্রহ্মপুত্রের স্রোতের মতো ভেসে ভেসে।’
চর রামমোহনে নেই কোনো উপস্বাস্থ্য কেন্দ্র। ফলে চিকিৎসাসেবা একপ্রকার দুঃস্বপ্ন। রাতবিরাতে কেউ অসুস্থ হলে নদীপথ অথবা কাঁচা রাস্তায় হেঁটে ১৫ থেকে ১৬ কিলোমিটার দূরের ঈশ্বরগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে যেতে হয়। আর ১২ কিলোমিটার দূরের ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে যেতে পারি দিতে হয় কর্দমাক্ত পথ। অনেক সময় হাসপাতালে পৌঁছার আগেই রোগীর অবস্থার অবনতি ঘটে।
চরের বাসিন্দা রোকসানা বেগম জানান, চিকিৎসার ব্যবস্থা নেই। কেউ অসুস্থ হলে যেতে হয় নদী পার হয়ে বা কর্দমাক্ত পথে ঘণ্টার পর ঘণ্টা হেঁটে। রাত হলে বিপদ আরও বাড়ে। সরকারি ত্রাণ-সহায়তাও তাদের ভাগে খুব কমই আসে।
গ্রামে নেই কোনো সরকারি বিদ্যালয়। প্রাথমিক শিক্ষার্থীদের প্রতিদিন কর্দমাক্ত দুর্গম পথ পেরিয়ে তিন কিলোমিটার দূরে ত্রিশালের ফাতেমা জালাল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে যেতে হয়। উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজ অন্তত ছয় কিলোমিটার দূরে। চরের নারী রহিমা বেগম বলেন, ‘বর্ষাকালে রাস্তাঘাটে কাদা-পানিতে বাচ্চারা পড়ে যায়, বই-খাতা ভিজে যায়। এতে ওদের স্কুলে যেতে আর মন চায় না। আমার ছেলেটা চতুর্থ শ্রেণির পর আর যায় না। গ্রামে যদি একটা স্কুল থাকত, হয়তো সে ঝরে পড়ত না।’
চর রামমোহনে নেই কোনো পাকা সড়ক। শুকনা মৌসুমে ধুলা, বর্ষায় কাদা ও জলাবদ্ধতা। কেউ অসুস্থ হলে ভ্যান বা অটোরিকশা পাওয়া যায় না। রোগীকে কাঁধে তুলে দুই-তিন কিলোমিটার হেঁটে ত্রিশালের পাকা সড়ক বা ব্রহ্মপুত্র নদের ঘাটে পৌঁছাতে হয়। অনেক সময় নৌকাও থাকে না।
স্থানীয় বাসিন্দা শাহীন মিয়া জানান, গ্রামে অ্যাম্বুলেন্স দূরের কথা, সিএনজিচালিত অটোরিকশাও ঢোকে না। রোগী নেওয়া যায় না সময়মতো। আবার চরের শাক-সবজি বাজারে নিতে কষ্ট হয়, ভাড়াও লাগে দ্বিগুণ। রাস্তাঘাট ভালো হলে এসব দুর্ভোগ অনেকটাই কমে যেত।
শাহীন আরও বলেন, এই গ্রামে নেই কোনো বাজার বা ওষুধের দোকান। নিত্যপণ্য বা ওষুধ কিনতে তিন কিলোমিটার পেরিয়ে যেতে হয় ত্রিশালের সেনবাড়ি বাজার বা নতুন বাজারে।
উপজেলা নির্বাচন কর্মকর্তার তথ্য অনুযায়ী, চর রামমোহন গ্রামে বর্তমানে ভোটার ১৬৭ জন। স্থানীয়দের ভাষ্য, আগে এই সংখ্যা অনেক বেশি ছিল। সরকারি সুযোগ-সুবিধা না থাকায় গত কয়েক বছরে কয়েকশ বাসিন্দা ঠিকানা পরিবর্তন করে ত্রিশাল উপজেলায় ভোটার হয়েছেন। এদিকে পরিসংখ্যান অফিস জানিয়েছে, জনসংখ্যা হালনাগাদের কাজ এখনো চলমান থাকায় গ্রামটির সঠিক জনসংখ্যা নির্ধারণ করা যায়নি।
রাজিবপুর ইউনিয়নের বাসিন্দা জাকির মোল্লা বলেন, ‘চর রামমোহনের মতো এত অবহেলিত গ্রাম দেশে আর দুটো খুঁজে পাওয়া যাবে না। চরবাসীর জীবন-মান উন্নয়নে সরকারের কার্যকর পদক্ষেপ দরকার।’
রাজিবপুর ইউপি চেয়ারম্যান আব্দুল আলী ফকিরের ভাষ্য, চর রামমোহন গ্রামটি একেবারেই দুর্গম। ইউনিয়ন পরিষদ থেকে সাধ্যমতো সহায়তা করার চেষ্টা করা হয়। তবে দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়নের জন্য উপজেলা ও জেলা প্রশাসনের পরিকল্পিত উদ্যোগ দরকার।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সানজিদা রহমান বলেন, চর রামমোহনের পরিস্থিতি সম্পর্কে বিস্তারিত খোঁজ নিয়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
