ঢাকা শুক্রবার, ১৭ জুলাই ২০২৬

চট্টগ্রামে করোনায় গতিহীন সব প্রকল্প

চট্টগ্রামে করোনায় গতিহীন সব প্রকল্প
×

সারোয়ার সুমন, চট্টগ্রাম

প্রকাশ: ১৭ জুলাই ২০২০ | ১২:০০

করোনায় গতি হারিয়েছে স্বপ্নের সব প্রকল্প। চট্টগ্রামের জলাবদ্ধতা নিরসনে ৯ হাজার ২৩৬ কোটি টাকার তিনটি প্রকল্পের একটিও তাই শেষ হচ্ছে না নির্ধারিত সময়ে। ৯ হাজার ৮৮০ কোটি টাকার টানেল নির্মাণ প্রকল্প কাজ চলতি বছরের জুনে শেষ হওয়ার কথা থাকলেও কাজ হয়েছে মাত্র অর্ধেক। সাড়ে ১৬ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণের কাজও থমকে আছে। এতে ব্যয় করা হচ্ছে তিন হাজার ২৫০ কোটি টাকা। অগ্রগতি নেই তিন হাজার ৮০৮ কোটি টাকা ব্যয় ধরে গৃহীত পয়ঃনিস্কাশনের গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পেও।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন ঠিক সময়ে উপকরণ না পাওয়া, প্রকল্প সংশ্নিষ্ট বিদেশিদের স্বদেশে ফিরে যাওয়া ও করোনাকালে প্রশাসনের নানা রকম বিধিনিষেধের কারণে এমন পরিণতির শিকার গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পগুলো। করোনা পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে জনগুরুত্বপূর্ণ এ প্রকল্পগুলো যাতে দ্রুত শেষ করা যায়, সে জন্য এখনই বিশেষ পরিকল্পনা নিতে বলছেন তারা। সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের গবেষণা পরিচালক ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, 'করোনার কারণে এলোমেলো হয়ে গেছে বিভিন্ন পরিকল্পনা। গতি হারিয়েছে গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পগুলো। করোনা খুব দ্রুত বিদায় নেবে এমন মনে হয় না। তবে জনগুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পগুলোর গতি কীভাবে বাড়ানো যায়, তা নিয়ে পরিকল্পনা করতে হবে এখনই। বিশেষ পদক্ষেপ নেওয়া গেলে সৃষ্ট ক্ষতি কিছুটা কাটিয়ে ওঠা যাবে।'
বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতি চট্টগ্রাম চ্যাপ্টারের সাবেক সভাপতি ও ইস্ট ডেল্টা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক সিকান্দার খান বলেন, 'করোনার পরে অনেক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হবে। গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পগুলোর বরাদ্দ পেতেও তৈরি হতে পারে টানাপোড়েন। এ জন্য এখনই অগ্রাধিকার তালিকা তৈরি করতে পারে সরকার। জলাবদ্ধতা নিরসনের মতো জনসম্পৃক্ত প্রকল্পগুলোকে রাখতে পারে এই অগ্রাধিকার তালিকায়।'
চট্টগ্রামে সিডিএ, ওয়াসা, রেলওয়ে, গণপূর্ত, পানি উন্নয়ন বোর্ডসহ সেবাধর্মী বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানকে দিয়ে বাস্তবায়ন করা হচ্ছে গুরুত্বপূর্ণ অনেক প্রকল্প। ৯ হাজার ২৩৬ কোটি টাকায় জলাবদ্ধতা নিরসনের তিনটি প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ ও পানি উন্নয়ন বোর্ড। এর মধ্যে সিডিএ বাস্তবায়ন করছে সাত হাজার ৬১৬ কোটি টাকার দুটি প্রকল্প। আর পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) এক হাজার ৬২০ কোটি টাকার একটি প্রকল্প বাস্তবায়নের দায়িত্ব পেয়েছে। এসব প্রকল্পে নালা-নর্দমা ও খালের পুনর্খনন, বাঁধ নির্মাণ, জোয়ার প্রতিরোধক ফটক, খালের দু'পাশে প্রতিরোধ দেয়াল, সেতু ও কালভার্ট নির্মাণ এবং বালুর বাঁধ নির্মাণের কথা রয়েছে। কিন্তু করোনাকালে কাজ বন্ধ থাকায় চলতি বছরে তেমন কোনো অগ্রগতি নেই তিনটি প্রকল্পের একটিতেও। জলাবদ্ধতা নিরসনে সিডিএর প্রকল্পটি ২০২১ সালে শেষ হওয়ার কথা থাকলেও সেটি এখন আর সম্ভব নয়।
চউকের প্রকৌশলী ও প্রকল্প পরিচালক আহমেদ মাঈনুদ্দীন বলেন, 'চট্টগ্রাম শহরের জলাবদ্ধতা নিরসনে গৃহীত মেগা প্রকল্প বাস্তবায়নে সেনাবাহিনীর সঙ্গে সিডিএর সমঝোতা চুক্তি স্বাক্ষর হয় ২০১৮ সালের ৯ এপ্রিল। এরপর সেনাবাহিনীর ইঞ্জিনিয়ারিং কোর খালের উভয় পাশে রিটেইনিং ওয়াল ও রাস্তা নির্মাণ এবং নিচু ব্রিজগুলো ভেঙে উঁচু করার কাজ শুরু করে। স্লুইচ গেট নির্মাণ করার কাজ শুরু করলেও করোনার কারণে তাতে বাধা পড়েছে। অতিরিক্ত বৃষ্টি ও জোয়ারের পানিও প্রতিবন্ধকতা তৈরি করেছে কাজে। খালের পাড়ে থাকা অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদেও বেগ পেতে হচ্ছে। তাই ২০২১ সালে এটি শেষ হওয়ার কথা থাকলেও তা এখন আর সম্ভব নয়।'
কার্যকর স্যুয়ারেজ ব্যবস্থা না থাকায় চট্টগ্রাম নগরে প্রতিদিন প্রায় ২৯ কোটি লিটার পয়ঃবর্জ্য বিভিন্ন খাল ও নালা হয়ে গিয়ে পড়ে কর্ণফুলীতে। সেখান থেকে এসব পয়ঃবর্জ্য যায় সাগরে। ফলে নগরীর পরিবেশ দূষণের পাশাপাশি মারাত্মকভাবে দূষিত হচ্ছে নদী ও সাগর। এই দূষণ রোধে নতুন প্রকল্প গ্রহণের দায়িত্ব দেওয়া হয় চট্টগ্রাম ওয়াসাকে। তারা তিন হাজার ৮০৮ কোটি টাকা ব্যয় ধরে একটি প্রকল্প নিলেও করোনার কারণে গতি হারিয়েছে সেটিও।
ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌশলী এ কে এম ফজলুল্লাহ বলেন, '৬০ লাখ বাসিন্দার আবাস এই বন্দর নগরীর পয়ঃবর্জ্য পরিশোধনের জন্য প্রথমবারের মতো ৩৮০৮ কোটি টাকার একটি প্রকল্প নিয়েছে ওয়াসা। ২০২৩ সালে এই প্রকল্প কাজ শেষ হওয়ার কথা থাকলেও এখন সেটি কঠিন মনে হচ্ছে।'
গতি নেই সিডিএর গৃহীত এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে প্রকল্পেরও। তিন হাজার ২৫০ কোটি ৮৩ লাখ টাকা বরাদ্দ রেখে ২০১৭ সালের ১১ জুলাই জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় এই প্রকল্পের অনুমোদন দেওয়া হয়।
এ প্রসঙ্গে প্রকল্প পরিচালক ও সিডিএর নির্বাহী প্রকৌশলী মাহফুজুর রহমান বলেন, 'করোনার আগে এই প্রকল্পের সিমেন্ট ক্রসিং থেকে কাঠগড় পর্যন্ত ৬০টি পিলারের পাইলিংয়ের কাজ শেষ হয়েছে। কলামও হয়ে গেছে। বাকি ছিল গার্ডারের কাজ। পাশাপাশি সমুদ্রসৈকত এলাকায়ও পাইলিং শুরু হয়েছিল। কিন্তু করোনার কারণে সব ওলটপালট হয়ে গেছে এখন।' নির্ধারিত সময়ে এই প্রকল্পের কাজ শেষ হওয়ার সম্ভাবনা কম বলে মন্তব্য করেন তিনি।
কর্ণফুলী নদীতে টানেল নির্মাণের কাজও শেষ হচ্ছে না নির্ধারিত সময়ে। ২০১৬ সালের ডিসেম্বরে শুরু হয়ে এ প্রকল্প শেষ হওয়ার কথা ছিল ২০২০ সালের জুনে। কিন্তু এটি শুরুই হয়েছে গত বছরের ফেব্রুয়ারিতে। মাত্র আট মাস কাজ করে প্রায় অর্ধেক কাজ এগিয়ে নিয়েছিলেন সংশ্নিষ্টরা। কিন্তু এর মধ্যে করোনা আঘাত হানায় এলোমেলা হয়ে গেছে সব। প্রকল্প সংশ্নিষ্ট বিদেশির অনেকে দেশে ফিরে গেছেন। সংকট তৈরি হয়েছে উপকরণেরও। তাই ২০২২ সালের আগে টানেলের সুফল পাওয়া যাবে না বলে ধারণা প্রকল্প সংশ্নিষ্টদের। প্রসঙ্গত, কর্ণফুলী নদীর এ টানেল নদীর দুই পাড়ে থাকা দুটি শহরকে এক সুতায় বাঁধার কথা। যথাসময়ে শেষ হলে দেশের অর্থনীতিতেও এই টানেল ইতিবাচক ব্যাপক প্রভাব ফেলত। দক্ষিণ চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারের সঙ্গে চট্টগ্রাম শহরের সংযোগ স্থাপন করত এই টানেল।


আরও পড়ুন

×