ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

দারিদ্র্যের চাপে দুই সন্তান বিক্রি

দারিদ্র্যের চাপে দুই সন্তান বিক্রি
×

ভাঙা ঘরের দুয়ারে লালন-মারুফা দম্পতির সন্তানদের কয়েকজন- সমকাল

মুরাদ মৃধা, নাসিরনগর (ব্রাহ্মণবাড়িয়া)

প্রকাশ: ০৭ অক্টোবর ২০২৫ | ০৬:৪২

| প্রিন্ট সংস্করণ

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগরে দরিদ্র এক দম্পতির দুই সন্তান বিক্রির অভিযোগ উঠেছে। ওই দম্পতির ভাষ্য, লালনপালনে অক্ষম হওয়ায় তাদের এক সন্তানকে ২০২৪ সালে, অপর সন্তানকে চলতি বছরের সেপ্টেম্বরে স্থানীয় দাই (ধাত্রী) আনছনা বেগমের হাতে তুলে দেন। ওই দাই সন্তানদের বিক্রি করে দেন। তিনি দত্তক দেওয়ার নামে সাদা স্ট্যাম্পে সই নিয়েছিলেন। কিন্তু যে টাকা তাদের দেওয়ার কথা, তার মধ্যে সামান্যই পেয়েছেন। 

শিশু দুটির বাবা মোহাম্মদ আলী লালন বুড়িশ্বর ইউনিয়নের শ্রীঘর গ্রামের আয়ুব আলীর ছেলে। নিজেদের জমি না থাকায় চাচাতো ভাই সোলেমানের পরিত্যক্ত ঘরে স্ত্রী মারুফা বেগম ও পাঁচ সন্তান নিয়ে থাকেন। সম্প্রতি ওই বাড়ির ভাঙা দরজা খুলে ভেতরে ঢুকতেই দেখা যায়, মাটিতে বসে ভাত খাচ্ছে রুগ্‌ণ কয়েকটি শিশু। পাশে এক থালা সিদ্ধ লাউ। ঘরের কোণে হেলান দিয়ে বসে আছেন অসুস্থ মারুফা। তাঁর চোখেমুখে সদ্য সন্তান জন্ম নেওয়ার ক্লান্তি। শরীরজুড়ে অপুষ্টির ছাপ। 

লালন পেশায় দিনমজুর। তবে অসুস্থতার কারণে নিয়মিত কাজে যেতে পারেন না। তাঁর বাবা চিকিৎসার খরচের জন্য জমিজমা বিক্রি করেন। সেই থেকে লালন অন্যের বাড়িতে আশ্রিত। আট বছর আগে নাসিরনগর ইউনিয়নের টেকানগরের কলমধর মিয়ার মেয়ে মারুফা বেগমকে বিয়ে করেন লালন। একে একে তাদের ঘরে আসে সাত সন্তান। অভাবের চাপে ২০২৪ সালে ৫০ হাজার টাকায় বিক্রি করেন নবজাতক ‘জীবন’কে। সর্বশেষ সন্তান ‘রিপন’কে গত সেপ্টেম্বরে এক লাখ টাকায় আনছনার মাধ্যমে অন্যের হাতে তুলে দেন। দুটি সন্তানকেই জন্মের পর সোলেমান-মারুফাকে দেখতে দেওয়া হয়নি। 

অচেনা হাতে সন্তান
লালন-মারুফা দম্পতির অভিযোগ, আনছনা বেগম কার কাছে সন্তানকে দিয়েছেন, সে বিষয়ে কিছুই বলেননি। যারা সন্তান নিয়েছেন, তাদেরও চেনেন না। যে এক লাখ টাকা দেওয়ার কথা ছিল, আনছনা এর মধ্যে ২০ হাজার টাকা, এক বস্তা চাল ও ৪০টি গোবরের জ্বালানি দিয়েছেন।

আনছনা বেগমের ভাষ্য, মারুফা ও নবজাতক খুবই অসুস্থ হয়ে পড়লে লালন সন্তান বিক্রির জন্য কান্নাকাটি করেন। তাঁর মেয়ের স্বামীর পরিচিত একজন যোগাযোগ করলে ৩০০ টাকার সাদা ননজুডিশিয়াল স্ট্যাম্পে সই করে সন্তান দিয়ে দেন লালন। যারা সন্তান নিয়েছেন, তারা ৪০ হাজার টাকা দিয়েছিলেন। তিনি ৩০ হাজার টাকা লালনকে দেন। এক লাখ টাকা দেওয়ার বিষয়টি সত্য নয়।
প্রতিবেশী নূরুন্নাহার বেগম প্রসবের সময় মারুফার চিৎকার শুনে ছুটে গিয়েছিলেন। তখন নবজাতক ও মারুফাকে গুরুতর অসুস্থ অবস্থায় পান। নূরুন্নাহার বলেন, ওদের পাঁচটা বাচ্চা আগে থেকেই আছে, এগুলোকেই ঠিকমতো খাওয়াতে পারে না। অভাবের কারণেই টাকার বিনিময়ে দুই সন্তানকে তুলে দিয়েছেন।

লালনের দাবি, সন্তান বিক্রি বা দত্তকের ইচ্ছা তাঁর ছিল না। কিন্তু দাই আনছনা তাঁর দারিদ্র্যের সুযোগ নিয়ে সন্তানকে মানুষের কাছে দিতে লোভ দেখান। আনছনা তাঁকে বলেছিলেন, যারা সন্তান নেবে তারা এক লাখ টাকা দেবেন, থাকার জায়গা দেবেন। 

বুড়িশ্বর ইউপির ৪ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য মো. গোলাপ মিয়া বলেন, শিশুদের বাবার কাছ থেকে এ বিষয়ে অভিযোগ পেয়েছেন। তাঁকে (লালন) এক লাখ টাকার মধ্যে ২০ হাজার টাকা, এক বস্তা চাল আর কিছু রান্নার জ্বালানি দেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন। বাকি টাকা আদায়ের চেষ্টা চলছে।
সমাজসেবা কর্মকর্তা রাখেশ পাল বলেন, লালন-মারুফা দম্পতি ভিক্ষাবৃত্তি করেন। অভাবের কারণে টাকার বিনিময়ে সন্তান দুটি দিয়েছেন বলে শুনেছেন। লালনের আর্থিক অবস্থা ফেরাতে একটি রিকশা দেওয়ার ব্যবস্থা করবেন। বিষয়টি জানার পর ওই পরিবারের কাছে গিয়েছিলেন ইউএনও শাহীনা নাসরিন। তিনি বলেন, পরিবারটির জন্য এক মাসের খাবার ও সরকারি আশ্রয়ণে একটি ঘর দেওয়ার ব্যবস্থা করছেন। শিশু সন্তানদের বিদ্যালয়ে পাঠানোর চেষ্টা চলছে। 

দুর্বল সামাজিক নিরাপত্তা দায়ী
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ড. হাফিজ উদ্দীন ভূঁইয়া মনে করেন, দুর্বল সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা ও রাষ্ট্রীয় সহায়তার অভাবই এ ধরনের ঘটনা বাড়িয়ে তুলছে। তিনি বলেন, যখন মানুষের মৌলিক চাহিদা– খাদ্য, আশ্রয় ও চিকিৎসা পূরণ হয় না, তখন অনেক অভিভাবকের কাছে সন্তানকেও বোঝা বলে মনে হয়। আগে এমন ঘটনা ছিল বিরল; কিন্তু এখন নিয়মিতই খবর পাওয়া যাচ্ছে।

উন্নয়ন গবেষক ও অধিকারকর্মী অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ জহিরুল হক বলেন, ‘অভাব ও ঋণের চাপে সন্তান বিক্রি বা দত্তকের ঘটনা প্রায়ই সংবাদমাধ্যমে উঠে আসে। গত মাসেই কুমিল্লার শ্রীমন্তপুরে এক মা ঋণ পরিশোধের জন্য সন্তান বিক্রি করেছেন; কুড়িগ্রামে প্রতিবন্ধী দম্পতি ২৩ হাজার টাকায় দুই সন্তান বিক্রি করেন। এ সপ্তাহে ঝিনাইদহে ৬৫ হাজার টাকায় নবজাতক বিক্রির খবরও পাওয়া গেছে। তবে অধিকাংশ ঘটনাই আড়ালে থেকে যায়।’
ড. মোহাম্মদ জহিরুল হক আরও বলেন, মাথাপিছু আয় বৃদ্ধি, অবকাঠামো উন্নয়ন বা বড় প্রকল্পের দিকে মনোযোগ থাকলেও প্রকৃত মানব উন্নয়ন ও মানব নিরাপত্তা নিশ্চিত হয়নি। যদি দেশের সামাজিক নিরাপত্তা কার্যকর হতো, তবে কেউ সন্তান বিক্রির পথে যেতেন না।

আরও পড়ুন

×