নিত্যপণ্যের মূল্য চড়া, সংসার চালাতে হিমশিম নিম্নবিত্তের
ছবি: সংগৃহীত
ঈশ্বরগঞ্জ (ময়মনসিংহ) সংবাদদাতা
প্রকাশ: ২০ অক্টোবর ২০২৫ | ১১:৪০ | আপডেট: ২০ অক্টোবর ২০২৫ | ১১:৪৮
অটোরিকশাটি কেনার সময় বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা আশা থেকে ৪০ হাজার টাকা ঋণ নেন জোলহাশ মিয়া। কিস্তিও ঠিকমতো দিচ্ছিলেন। তবে নিত্যপণ্যের দাম অস্বাভাবিক থাকায় সংসার খরচ চালাতে হিমশিম অবস্থায় পড়েন। আশার ঋণ পরিশোধ হতে আরও পাঁচ মাস বাকি। এর মধ্যেই সম্প্রতি গ্রামীণ ব্যাংক থেকে আরও ৪০ হাজার টাকা ঋণ নিতে বাধ্য হন তিনি।
জোলহাশ মিয়ার বাড়ি ঈশ্বরগঞ্জ উপজেলার জাটিয়া ইউনিয়নের বিজয়পুর গ্রামে। তিনি জানান, ছয় সদস্যের পরিবারে একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি তিনি। দিনভর অটোরিকশা চালিয়ে যা আয় হয়, তা দিয়ে সংসার চালানোই এখন কষ্টকর। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে দুটি এনজিওর কিস্তির চাপ। সব মিলিয়ে বেকায়দায় পড়েছেন তিনি।
শুধু জোলহাশ নন, ওষুধসহ নিত্যপণ্যের দাম বেড়ে যাওয়ায় বিপাকে পড়েছেন নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারগুলো। সংসারের ব্যয় মেটাতে কেউ নিচ্ছেন এনজিও থেকে ঋণ, কেউ পড়ছেন সুদের কারবারিদের ফাঁদে। এভাবে সর্বস্বান্ত হচ্ছেন নিম্ন ও মধ্যম আয়ের মানুষ।
ঈশ্বরগঞ্জ উপজেলার শতাধিক পেশাজীবীর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এক সময় যে পরিবারগুলো মাসের আয়ে কোনোমতে সংসার চালাতেন, সেই আয়ে এখন আর সংসার চলছে না। অনেক পরিবারে ওষুধের পেছনে প্রতি মাসে গুনতে হচ্ছে মোটা অঙ্কের টাকা। এর সঙ্গে সন্তানদের পড়াশোনা, বাসাভাড়া ও নিত্যপণ্যের খরচ তো আছেই।
পৌর এলাকার রিকশাচালক নূরুল ইসলাম জানান, আগে শুধু বিশেষ প্রয়োজনে ঋণ নিতেন। এখন মাসের খরচ মেটাতেই নিতে হচ্ছে ঋণ। কিস্তি পরিশোধে হিমশিম খেয়ে অনেকে আবার পড়ছেন সুদের কারবারিদের ফাঁদে। ফলে এক ঋণ শোধ করতে গিয়ে বাড়ছে আরেক ঋণের বোঝা। একই ধরনের কথা বলেছেন মুদি দোকানি হাদিছ মিয়া ও কৃষক আব্দুছ ছোবাহানও।
মুদি দোকানিদের তথ্যমতে, গত দুই মাসে প্রতিকেজি মসুর ডাল (ক্যাঙ্গারু) ১২৫ থেকে বেড়ে হয়েছে ১৫০ টাকা। বোতলজাত সয়াবিন তেলের লিটার ১৮৪ থেকে বেড়ে ১৯৫ টাকা, প্যাকেটজাত আটার কেজি ৫০ থেকে বেড়ে ৬০ টাকা হয়েছে। গত পাঁচ মাসে শিশুখাদ্য দুধের দামও বেড়েছে– এক কেজি গুঁড়ো দুধ ৭৯০ থেকে বেড়ে ৮৫০ টাকা, প্রতি প্যাকেট ল্যাকটোজেন ১০ টাকা বেড়ে ৩২০ টাকা হয়েছে। একই সময়ে সাবান, শ্যাম্পু ও টুথপেস্টের দাম বেড়েছে ৫ থেকে ১৫ টাকা। মাত্র ১৫ দিনে প্রতিকেজি চায়না রসুন ১৪০ থেকে বেড়ে ১৮০ টাকা হয়েছে, আদার দামও বেড়েছে অনুরূপ। পেঁয়াজের কেজি ৭০ থেকে বেড়ে ৭৫ টাকা হয়েছে। কয়েক মাস ধরে শাকসবজির বাজার অস্থিতিশীল– কেজিপ্রতি দাম ৬০ থেকে ৩০০ টাকার মধ্যে ওঠানামা করছে। চার-পাঁচদিন আগে পৌর বাজরে প্রতিকেজি শিম ৩০০ টাকা বিক্রি হয়েছে।
ওষুধ বিক্রেতাদের তথ্যমতে, ২০২৪ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে বিভিন্ন ওষুধের দাম বেড়েছে ১০-৪০০ টাকা পর্যন্ত। লরিক্স প্লাস লোশন ও ইলিমেট প্লাস ১১০ থেকে বেড়ে ২০০ টাকা, নাপা সিরাপ ২০ থেকে বেড়ে ৩৫ টাকা, উইন্ডেল প্লাস ও বুডিকর্ট ৫-১০ টাকা বেড়েছে। ডায়াবেটিসের ওষুধ কমেট ও কমপ্রিড বেড়েছে ১০ টাকা, হাজার টাকার বেশি দামের ইনসুলিনে ৩০০-৪০০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। এগুলো ছাড়াও মানুষের দৈনন্দিন জীবনে প্রয়োজন প্রকার ভেদে সব ধরনের ওষুধের দাম বেড়েছে। এদিকে চালের দাম স্থিতিশীল থাকলেও আকাশছোঁয়া মাছের দর। কয়েক মাসে পাঙাশ ছাড়া সব ধরনের মাছের দাম বেড়েছে কেজিপ্রতি ৫০ থেকে ১০০ টাকা। তবে মাস খানেকের ব্যবধানে ব্রয়লার মুরগির দাম কেজিপ্রতি ২০ টাকা কমে ১৫৫ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে।
সম্প্রতি পৌর এলাকার একটি ফার্মেসি থেকে ওষুধ কিনে অর্ধেক ফেরত দেন শফিকুল ইসলাম নামে এক পোশাককর্মী। তিনি জানান, অসুস্থ বাবার জন্য মাসে তিন-চার হাজার টাকার ওষুধ কিনতে হয়। কষ্টের সংসারে এখন তা সম্ভব নয়। শফিকুল বলেন, ‘ভাবছিলাম সরকার পরিবর্তন হলে জিনিসের দাম কমবে, কিন্তু উল্টো আরও বেড়েছে।’
পৌর বাজারের একাধিক ওষুধ বিক্রেতা জানান, এখন অনেকে পুরো কোর্স না কিনে অর্ধেক কিনছেন। পরে বাকিটা নেওয়ার কথা বলেন। এতে বোঝা যায়, সাধারণ মানুষের হাতে টাকার টান কতটা গভীর।
ইউএনও সানজিদা রহমান বলেন, প্রয়োজনের তাগিদে অনেকে এনজিও থেকে ঋণ নিচ্ছেন, পরে তা পরিশোধে হিমশিম খাচ্ছেন। তিনি পরামর্শ দেন, সহজ শর্তে সরকারি প্রতিষ্ঠানের ঋণ নিতে এবং নিয়মিত কিস্তি পরিশোধ করতে। বাজারদর নিয়ন্ত্রণে প্রশাসনের তদারকি অব্যাহত রয়েছে।
- বিষয় :
- ময়মনসিংহ
- নিত্যপণ্যের দাম
- ঈশ্বরগঞ্জ
