ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

ধন নেই, বড় মন আছে রশিদ বাবুর্চির

ধন নেই, বড় মন আছে রশিদ বাবুর্চির
×

অসহায় লোকজনকে প্রতি শুক্রবার বিনামূল্যে খাওয়ান ঝালমুড়ি বিক্রেতা আব্দুর রশিদ সমকাল

শেরপুর প্রতিনিধি

প্রকাশ: ২৫ অক্টোবর ২০২৫ | ০৭:৪০

| প্রিন্ট সংস্করণ

আব্দুর রশিদ এলাকায় রশিদ বাবুর্চি নামেই পরিচিত। শেরপুরের ঝিনাইগাতী উপজেলার তিনআনী বাজারে ঝালমুড়ি, পেঁয়াজু, শিঙাড়া ও বিরিয়ানি বিক্রি করে চলে তাঁর সংসার। দিনে আয় গড়ে ৫০০-৬০০ টাকা। গরিব মানুষের কষ্ট দেখলে তাঁর মন কাঁদে। এজন্যই সপ্তাহে একদিন অনাহারী মানুষের মুখে বিনামূল্যে খাবার তুলে দিচ্ছেন তিনি।

আব্দুর রশিদসহ স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, জিনিসপত্রের দাম বেড়ে যাওয়া এবং আয়-রোজগার কমে যাওয়ায় এলাকায় গরিব মানুষের সংখ্যা বাড়ছে। তাঁর দোকানে প্রতিদিন বয়স্ক মানুষ বিশেষ করে ভিক্ষুকের উপস্থিতি বেড়েই চলেছে। তারা কেউ শিঙাড়া চান, কেউ পেঁয়াজু দাবি করেন। তিনি কখনও দেন, আবার কখনও দেন না। আজকাল দুই টাকা অনেকেই নিতে চান না। পাঁচ টাকা ভিক্ষা পেলে এখন মানুষ খুব একটা খুশি হন না। ১০ টাকা দিলে মুখে কিছুটা হাসি ফোটে।

গত কয়েক মাস এমন অবস্থা দেখে গরিব মানুষের জন্য মন কাঁদে রশিদের। সপ্তাহে অন্তত একদিন অসহায় মানুষের মুখে খাবার তুলে দেবেন। তিনি বলেন, ‘বুড়া মানুষ যহন কয় সারাদিন খাই নাই। তহন খুব কষ্ট লাগে। চিন্তা করলাম, ঠিক আছে দুই সপ্তাহ নিজে খাওয়াই। পরে যদি সবাই আগায়া আহে তাইলে গরিব মানুষগুলা খাবার পাবো। শুরু করলাম খাওয়ানো। ৬ সপ্তাহ চলছে। গরিবের জন্য অনেক মানুষ আগায়া আইছে। তারা চাল, ডিম, মাংস কিনে দেন। আমি কখনও তেল দেই। কখনও মসলাপাতি। রান্না ফ্রি। এখন প্রতি শুক্রবার শতাধিক অনাহারী আইসা খায়া যান। অনেকে আবার বাড়ির জন্য নিয়া যান।’ তাঁর ভাষ্য, গরিবের সংখ্যা বাড়ছে। জিনিসের দাম বাড়তি। কিনে খেতে পারেন না অনেক মানুষ। তাই গরিবের মুখে আহার তুলে দেওয়ার চেষ্টা করছেন। এতে যে কী শান্তি তা কাউকে বলে বোঝানো যাবে না।
গতকাল শুক্রবার বেলা ১১টার দিকে তিনআনী বাজারে গিয়ে দেখা যায়, শতাধিক ভিক্ষুক রশিদের দোকান ও আশপাশে অপেক্ষা করছেন। এদিন ডিম খিঁচুড়ির ব্যবস্থা করেন স্থানীয় আনু ও মিজান নামে দুই ব্যক্তি। রান্না শেষ হলে দোকানের কিছু দূরে নলকূপ থেকে রশিদ দুটি বালতিতে করে সুপেয় পানি নিয়ে আসেন। 

খাবার পরিবেশন শুরু হলে দেখা গেল ভিন্ন আরেক চিত্র। বেশ কয়েকজন যুবক এসে শুরু করলেন পরিবেশন। তাদের কেউ অটোরিকশা চালক, কেউ দিনমজুর, আবার কেউবা চানাচুর বিক্রেতা। রশিদের পাশের ডেকোরেটর দোকানি রাশেদ মিয়া ও ভুলু মিয়াও খাবার পরিবেশনে অংশ নিচ্ছিলেন।

রাশেদ মিয়া বলেন, ‘অনেকের ধন আছে, মন নাই। রশিদ ভাইয়ের ধন নাই, কিন্তু মন অনেক বড়। তাই তারে সাহায্য করতাছি।’
ভুল মিয়া জানান, রশিদ বাবুর্চি শুরু করে দিলে এখন অনেকেই দিচ্ছেন। প্রতি শুক্রবার খাবার তুলে দিচ্ছেন তারা। আস্তে আস্তে ভিক্ষুক বাড়ছে।
খাবার খেতে আসা কয়েকজন নারীর সঙ্গে কথা বলে জানা গেল প্রান্তিক জনগোষ্ঠী বিশেষ করে  বয়স্ক নারীদের দুর্দশার চিত্র।

রাজনগর ইউনিয়নের দোহালিয়া গ্রামের মহিরন (৮০) বেওয়ার স্বামী প্রয়াত হয়েছেন। নেই জমিজমা। দুই মেয়ের বিয়ে হয়েছে। একমাত্র ছেলের সংসার হয়েছে। কিন্তু তিন সন্তান থাকতেও মায়ের ভাত জোটে না। কেউ মায়ের খোঁজ রাখেন না। ভিক্ষাবৃত্তি করে জীবনধারণ করছেন তিনি। সারাদিন যা হাতে আসে তাই দিয়ে রাতে কোনোরকমে একমুঠো ভাত পেটে তোলেন। ছেলে দেখেন না কেন? এর জবাবে বৃদ্ধা ছেলের সম্মান রেখে তিনি বললেন, ‘ওরই চলে না, আমারে কেমনে খাওয়াবো।’ 

খিঁচুড়ি খাচ্ছিলেন একই এলাকার আলিমুন (৮০)। দেখে মনে হয় খুব কষ্টে আছেন। তিনি জানান, তাঁর এক ছেলে ও এক মেয়ে মারা গেছেন। আছে এক মেয়ে। তাঁর সংসারে অভাব। খেতে দিতে পারেন না। তাই ভিক্ষাবৃত্তির পথ বেছে নিয়েছেন তিনি। হাজেরা বেগমের (৮৫) স্বামী নেই। দুই মেয়ে বিয়ে দিয়েছেন। ছেলের আলাদা সংসার। তাই মা পেটের জ্বালায় পথে নেমেছেন।
মনোয়ার হোসেন নামে স্থানীয় একজন বলেন, ‘রশিদ ভাই মানবিক মানুষ। অসচ্ছল হয়েও তিনি গরিবের পাশে দাঁড়িয়েছেন। জানি না কতদিন তিনি মানুষকে খাওয়াতে পারবেন। তবে এ উদ্যোগকে এগিয়ে নেওয়ার দায়িত্ব সমাজের বিত্তবান ব্যক্তিদের।’
ঝিনাইগাতী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আশরাফুল আলম রাসেলের ভাষ্য, দরিদ্র কিন্তু মানবিক এ মানুষটিকে ধন্যবাদ। অসচ্ছল হয়েও খুব ভালো উদ্যোগ নিয়েছেন। তাঁর পাশে থাকবেন তারা। উপজেলা প্রশাসনের কাছে তিনি যদি কোনো সহায়তা চান, তাঁকে অবশ্যই সহায়তা করা হবে।
 

আরও পড়ুন

×