ঈশ্বরদী বাইপাস-আব্দুলপুর জংশন
ভাঙা স্লিপারে ঝুঁকিপূর্ণ রেলযাত্রা
লালপুর (নাটোর) প্রতিনিধি
প্রকাশ: ০৭ নভেম্বর ২০২৫ | ০৭:৪৫
| প্রিন্ট সংস্করণ
রেলপথের স্লিপার ক্ষয়ে ভেঙে গেছে। বিভিন্ন স্থানে পর্যাপ্ত বালু ও পাথর নেই। লাইনম্যান না থাকায় চুরি হয়ে গেছে ক্লিপ (লাইন ধরে রাখার হুক)। এতে অরক্ষিত হয়ে পড়ছে রেলপথ। বারবার বগি লাইনচ্যুত হয়ে ব্যাহত হচ্ছে ট্রেন চলাচল। এরপরও ঝুঁকি নিয়েই চলাচল করছেন যাত্রীরা।
এ চিত্র নাটোরের লালপুর উপজেলার ঈশ্বরদী বাইপাস থেকে আব্দুলপুর জংশন পর্যন্ত ১৮ কিলোমিটার রেললাইনের। উত্তরাঞ্চলের সঙ্গে দেশের দক্ষিণাঞ্চল ও রাজধানীর যোগাযোগের একমাত্র রুট এটি। এই রুটে প্রতিদিন মেইলট্রেন, আন্তঃনগর, মালগাড়িসহ ৬০টি ট্রেন চলাচল করে। জনগুরুত্বপূর্ণ এ রেলপথের স্লিপার ভাঙা ও ক্লিপ না থাকায় ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে রেলযাত্রা।
২০০০ সাল থেকে পশ্চিমাঞ্চল রেলওয়ের আওতায় ৩৪৫ কিলোমিটার রেলপথে কংক্রিটের স্লিপার বসানো শুরু হয়। মানসম্মত না হওয়ায় কয়েক বছর যেতে না যেতেই আমদানি করা এসব স্লিপার ক্ষয়ে গেছে। এর মধ্যে লালপুর থেকে আব্দুলপুর জংশন পর্যন্ত ১৮ কিলোমিটার পথের প্রায় ২ হাজার ৯০০ স্লিপার ভেঙে গেছে। চুরি হয়েছে ১৭ হাজার ক্লিপ। কয়েক দফা স্লিপার ও ক্লিপ পরিবর্তন করা হলেও কাজ হচ্ছে না। সবচেয়ে বেশি স্লিপার ও ক্লিপ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে আজিমনগর রেলওয়ে স্টেশন থেকে আঙ্গারীপাড়া পর্যন্ত। সরেজমিন এ দুটি স্টেশন ও বিষ্টপুর এলাকা ঘুরে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে এ তথ্য জানা গেছে।
স্থানীয়রা জানিয়েছেন, গত ১০ মাসে পাঁচবার এই রুটে লাইন ভাঙার ঘটনা ঘটেছে। রেললাইন সংস্কার ও তদারকির অভাবে একের পর এক এমন ঘটনা ঘটছে। কর্তৃপক্ষ সংস্কারের নামে দুয়েকটি ভাঙা স্লিপার পাল্টে দায় সেরেছে।
গত ২৫ আগস্ট রাত ৯টার দিকে আজিমনগর রেলস্টেশনের মহিষাখোলা রেলসেতুর কাছে ৮ ইঞ্চি রেললাইন ভাঙা দেখতে পান স্থানীয়রা। বিষয়টি স্টেশনমাস্টারকে জানালে ভাঙা অংশে পাটের বস্তা গুঁজে ট্রেন চলাচলের ব্যবস্থা করা হয়। পরে ভাঙা অংশ মেরামত করা হয়। একই কারণে গত ১১ এপ্রিল রাতে আব্দুলপুর রেলওয়ে স্টেশনের বাওড়া সেতু এলাকায় ঈশ্বরদী থেকে চাঁপাইনবাবগঞ্জগামী ফাইভ আপ ট্রেনের ইঞ্জিন লাইনচ্যুত হয়। পরদিন ১২ এপ্রিল ভোর ৬টার দিকে ঈশ্বরদী বাইপাস স্টেশনে পঞ্চগড়গামী পঞ্চগড় এক্সপ্রেস ট্রেনের ইঞ্জিনের ছয়টি চাকা ও প্রথম বগির দুইটি চাকা লাইনচ্যুত হয়।
বারবার ট্রেনের ইঞ্জিনের লাইনচ্যুতি ও দুর্ঘটনায় ক্ষোভ প্রকাশ করে যাত্রীরা বলছেন, কর্তৃপক্ষ সংস্কারের নামে মাঝেমধ্যে দুয়েকটি ভাঙা স্লিপার পাল্টে দায় সারছে।
স্থানীয় বাসিন্দা রিমন আলী বলেন, রেললাইনগুলো পুরোনো। স্লিপার ভেঙে লাইন আটকানো হুকগুলোও খুলে যাচ্ছে। এ কারণে বগি লাইনচ্যুত হচ্ছে। কর্তৃপক্ষকে জানানোর পরও মেরামত করা হয়নি। যে কোনো সময় বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটতে পারে।
সাইদুর ইসলাম বলেন, আজিমনগর স্টেশনে কয়েকশ স্লিপার ভাঙা। কর্তৃপক্ষকে জানানোর পরও মেরামত করা হয়নি। দুর্ঘটনার পর তিনটি ভাঙা স্লিপার পেলে একটি পাল্টে দায় সারছে। এ কারণে বারবার বগি লাইনচ্যুতির ঘটনা ঘটেছে।
কথা হয় রেলওয়ে লাইন রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বে থাকা কি–ম্যান (ওয়েম্যান) হাবিব আলীর সঙ্গে। তিনি বলেন, প্রায় ২৫ বছরের পুরোনো লাইনে অর্ধশতাধিক ট্রেন চলাচল করে। ভারী বাহনের চাপ সইতে না পেরে পুরোনো কংক্রিটের স্লিপার ভেঙে যাচ্ছে। ইলাস্টিক রেল ক্লিপ (ইআরসি) গুলি খুলে পড়ছে। চুরিও হচ্ছে। আমরা নিয়মিত সংস্কারকাজ চালিয়ে যাচ্ছি।
ঈশ্বরদী রেলওয়ে ঊর্ধ্বতন উপসহকারী প্রকৌশলী উৎপল চন্দ্র মণ্ডল বলেন, রেলে জনবল সংকট প্রকট। আমাদের লোক সকাল ৭টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত থাকে। এ সময় চুরি হয় না। রাতে পাহারার ব্যবস্থা নেই। এ সময়টাতে চুরি হয়। ২৪ ঘণ্টার জন্য লাইনম্যান রাখতে পারলে এসব এড়ানো যেত। তবে সমস্যাগুলো দ্রুত সমাধানের চেষ্টা চলছে।
আজিমনগর রেলওয়ে স্টেশনের মাস্টার তাকদির হোসেন বলেন, রেলপথের স্লিপারগুলো পুরোনো হয়ে গেছে। কিছু স্লিপার নষ্ট হয়ে গেছে। বালু ও পাথর না থাকায় স্লিপার ফাঁকা হয়ে আছে। এ ছাড়াও রয়েছে যানবাহনের অতিরিক্ত চাপ। এই রুটে প্রতিদিন ৬০টি ট্রেন চলাচল করে। এ চাপ নিতে পারছে না পুরোনো স্লিপার। বিষয়টি রেলওয়ের ইঞ্জিনিয়ারিং শাখায় জানানো হয়েছে। আশা করছি, শিগগিরই একটা ব্যবস্থা হবে।
বাংলাদেশ রেলওয়ে পাকশী বিভাগীয় প্রকৌশলী-২ নাজিব কায়সার বলেন, স্লিপারগুলো কংক্রিটের। এই মুহূর্তে পরিবর্তন করা সম্ভব না। তবে মেরামতকাজ চলমান আছে। তিনি বলেন, রেলপথের সমস্যা সমাধানে ২২ কোটি টাকার প্রকল্প প্রস্তাব একনেকে পাঠানো হয়েছে। অনুমোদন হলেই কাজ শুরু হবে। ক্লিপ চুরির বিষয়ে তাঁর ভাষ্য, জনবল সংকটের কারণে রাতে নিরাপত্তা প্রহরী ব্যবস্থা করা সম্ভব হয়নি। এ কারণে ক্লিপ চুরি হচ্ছে।
- বিষয় :
- রেল
