ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল

দরপত্রের শর্ত তৈরি হয়নি আগেই মূল্যায়ন কমিটি

১৫ বছরের জন্য দেওয়া হচ্ছে আমিরাতের ডিপি ওয়ার্ল্ডকে

দরপত্রের শর্ত তৈরি হয়নি আগেই মূল্যায়ন কমিটি
×

অস্বাভাবিক দ্রুততায় বিদেশি কোম্পানির সঙ্গে চট্টগ্রাম বন্দরের টার্মিনাল পরিচালনা চুক্তির প্রতিবাদে গতকাল বৃহস্পতিবার রাজধানীর পল্টন এলাকায় বিক্ষোভ মিছিল করে বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টি সমকাল

সারোয়ার সুমন, চট্টগ্রাম

প্রকাশ: ২১ নভেম্বর ২০২৫ | ০৮:১৪

| প্রিন্ট সংস্করণ

লালদিয়া  ও পানগাঁও টার্মিনালের মতো চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনালও (এনসিটি) বিদেশি কোম্পানির হাতে ছেড়ে দিতে তাড়াহুড়া চলছে। ডিসেম্বরের মধ্যে চুক্তি সম্পন্ন করে সংযুক্ত আরব আমিরাতের কোম্পানি ডিপি ওয়ার্ল্ডকে ১৫ বছরের জন‍্য এনসিটি পরিচালনার দায়িত্ব দিতে যাচ্ছে মন্ত্রণালয়। শর্তসাপেক্ষে এই মেয়াদ আরও বাড়ানোর সুযোগ রেখে তৈরি করা হচ্ছে দরপত্র। এই প্রক্রিয়া দ্রুত সম্পন্ন করতে সংশ্লিষ্টদের নির্দেশও দিয়েছে নৌ মন্ত্রণালয়। নির্দেশনা পেয়ে আগামী সপ্তাহেই দরপত্রের কাগজপত্র জমা দেওয়ার কথা  পরামর্শক প্রতিষ্ঠানের। 

এদিকে দরপত্রের শর্তাবলি চূড়ান্ত না হলেও দরপত্র মূল্যায়নের জন্য গঠন করা হয়েছে সাত সদস্যের কমিটি। সেই কমিটি অনুমোদনের প্রস্তাবও পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে মন্ত্রণালয়ে। এনসিটি নিয়ে আইনি প্রক্রিয়া শুরু হওয়ায় সব কাজ দ্রুত শেষ করতে চাচ্ছে মন্ত্রণালয়।

এদিকে এনসিটি বিদেশিদের হাতে দেওয়ার প্রক্রিয়া চ‍্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টে মামলা চলছে। এর মধ‍্যেই চুক্তির প্রক্রিয়া বিদ‍্যুৎ গতিতে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে মন্ত্রণালয়। বিষয়টি বিচারকের নজরে আনলে মামলা নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত সব কার্যক্রম বন্ধ রাখতে মন্ত্রণালয়কে গতকাল বৃহস্পতিবার নির্দেশ দিয়েছেন হাইকোর্ট। তবে বন্দর কর্তৃপক্ষ বলছে, আদালতের এমন কোনো নির্দেশনা তারা হাতে পাননি। এখন মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা অনুযায়ী কাজ এগিয়ে নিচ্ছেন তারা। এনসিটি পরিচালনার জন‍্য আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বানের দাবি থাকলেও সে পথে হাঁটছে না মন্ত্রণালয়। পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপের আওতায় এনে এবারের চুক্তি করতে যাচ্ছে তারা সংযুক্ত আরব আমিরাতের কোম্পানি ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে। বন্দর পরিদর্শনে এসে নৌ উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) সাখাওয়াত হোসেন বলেছেন, ডিপি ওয়ার্ল্ড বিশ্বমানের প্রতিষ্ঠান। তারা এনসিটির দায়িত্ব পেলে চট্টগ্রাম বন্দরও হবে বিশ্বমানের।

এনসিটি টার্মিনাল বিদেশিদের হাতে দেওয়ার প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত থাকা চট্টগ্রাম বন্দরের এক পরিচালক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘ডিসেম্বরের মধ্যে এনসিটি হস্তান্তরের চুক্তি করতে চায় সরকার। সেভাবে প্রস্তুতি সম্পন্ন করতে তাগাদা দিচ্ছে মন্ত্রণালয়। দরপত্রের শর্তাবলি চূড়ান্ত করা ও চুক্তির খসড়া তৈরির কাজ করছে বিদেশি পরামর্শক প্রতিষ্ঠান ইন্টারন্যাশনাল ফিন্যান্স করপোরেশন (আইএফসি)। লালদিয়া ৩৩ বছর ও পানগাঁও ২২ বছরের জন্য দেওয়া হলেও ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে  প্রাথমিক চুক্তি হবে ১৫ বছরের। শর্তসাপেক্ষে এটি আরও বাড়তে পারে। 

এদিকে লাভজনক এনসিটি বিদেশিদের হাতে না দিতে আন্দোলনে আছে এক ডজনেরও বেশি সংগঠন। চট্টগ্রাম শ্রমিক-কর্মচারী ঐক্য পরিষদ (স্কপ) শ্রমিক কনভেনশন থেকে হরতাল বা অবরোধের মতো কর্মসূচি ঘোষণারও হুমকি দিয়েছে। আবার চট্টগ্রাম বন্দরের স্থাপনা বিদেশি কোম্পানির কাছে না দেওয়ার দাবিতে মশাল মিছিল করেছে বন্দর রক্ষা পরিষদ। গত বুধবার সন্ধ্যায় নগরের বড়পোল এলাকার পোর্ট কানেকটিং সড়কে প্রতিবাদী মশাল মিছিল করে তারা। এসব আন্দোলনে একাত্মতা জানিয়েছে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের শ্রমিক সংগঠন।

এনসিটি হচ্ছে চট্টগ্রাম বন্দরের সবচেয়ে বড় টার্মিনাল। ২০০৭ সালে নির্মিত এই টার্মিনালে বছরে প্রায় ১৩ লাখ কনটেইনার ওঠানামা করছে, যা মোট কনটেইনারের ৪৪ শতাংশ। বন্দরের সবচেয়ে বেশি আয়ও হয় এই টার্মিনাল থেকে। দুই হাজার ৭১২ কোটি টাকা বিনিয়োগ করে এই টার্মিনালটি কাজের উপযোগী করা হয়। এটিই বন্দরের একমাত্র টার্মিনাল; যেখানে অত্যাধুনিক গ্যান্ট্রি ক্রেনই আছে ১৪টি। এ জন্য টার্মিনালে প্রতি ঘণ্টায় সবচেয়ে বেশি কনটেইনার ওঠানামা করতে পারে।

২০০৭ সাল থেকে ২০২৫ সালের জুন পর্যন্ত এই টার্মিনালটি পরিচালনা করেছে সাইফ পাওয়ার টেক। বর্তমানে এনসিটি টার্মিনাল পরিচালনা করছে নৌবাহিনীর প্রতিষ্ঠান চিটাগং ড্রাইডক লিমিটেড। 

লালদিয়ার চরে টার্মিনাল নির্মাণ ও পরিচালনার জন্য ঢাকার একটি হোটেলে গত সোমবার ডেনমাকের্র মায়ের্সক গ্রুপের এপিএম টার্মিনালসের সঙ্গে চুক্তি করে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ। একই দিন বিকেলে বুড়িগঙ্গার তীরে পানগাঁও নৌ টার্মিনাল ২২ বছর পরিচালনার জন্য সুইজারল্যান্ডের মেডলগ এসএ কোম্পানির সঙ্গে চুক্তি হয়। এই দুটি চুক্তির প্রক্রিয়া ১৩ দিনে সম্পন্ন করে সরকার। এ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন বন্দর ব্যবহারকারীরা। ট্যারিফ, টার্মিনেশন ও পরিবেশ-সংক্রান্ত শর্তগুলো দেশের স্বার্থ রক্ষা করে হয়েছে কিনা তা নিয়ে সন্দেহ পোষণ করছেন বিশিষ্টজনও। 

বন্দর সচিব মো. ওমর ফারুক জানান, ১৬ নভেম্বর প্রকল্পের দরপত্র মূল্যায়নের কমিটি গঠন করা হয়। এর পরপরই কমিটি অনুমোদনের চিঠি পাঠানো হয়েছে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের সচিবের কাছে। আদালতের অবমাননা হবে এমন কিছু আমরা করিনি। হাইকোর্ট বৃহস্পতিবার যে নির্দেশনা দিয়েছে সেটির অফিসিয়াল কপি আমরা হাতে পাইনি। 

তবে দ্বিমত পোষণ করে রিট আবেদনকারীর আইনজীবী মো. আনোয়ার হোসেন বলেন, রিট শুনানির জন্য অপেক্ষমাণ থাকা অবস্থায় কার্যক্রম গ্রহণ করা আদালত অবমাননার শামিল। মূল‍্যায়ন কমিটি গঠন করে মন্ত্রণালয় ও বন্দর কর্তৃপক্ষ এর আগে সেটিই করেছে। বিষয়টি নজরে আনলে আদালত বিচার চলমান অবস্থায় বন্দর কর্তৃপক্ষকে নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনালের সব কার্যক্রম বন্ধ রাখতে বৃহস্পতিবার কঠোর নির্দেশ দিয়েছেন।

চট্টগ্রাম বন্দরের সাবেক বোর্ড মেম্বার জাফর আলম বলেন, লালদিয়া ও পানগাঁও টার্মিনাল বিদেশিদের হাতে দেওয়াকে আমি স্বাগত জানাই। কর্মদক্ষতা দিয়ে তারা এই দুটি টার্মিনাল বিশ্বমানের করবে বলে আমার বিশ্বাস। কিন্তু এনসিটি নিয়ে দ্বিতীয়বার ভাবা উচিত দায়িত্বশীলদের।
আন্দোলনকারী শ্রমিক নেতা মো. হুমায়ুন কবীর বলেন, আগের দুই চুক্তির মতো এনসিটি নিয়েও তড়িঘড়ি করা হচ্ছে। দরপত্র চূড়ান্ত না হতেই তারা গঠন করেছে মূল্যায়ন কমিটি। 

‘বিদেশিদের হাতে বন্দর, আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত’
জনগণের মতামত পাশ কাটিয়ে বন্দর ব্যবস্থাপনা বিদেশি কোম্পানিকে দেওয়ার সরকারি সিদ্ধান্তকে আত্মঘাতী মন্তব্য করে বিবৃতি দিয়েছেন চট্টগ্রামের ১০ বিশিষ্টজন। এনসিটি টার্মিনাল নিয়ে সরকারের বর্তমান অবস্থানের সমালোচনা করেন তারা। তারা বলেন, বন্দর পরিচালনার মতো রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ চুক্তি সম্পাদনের দায়িত্ব এই অন্তর্বর্ন্তী সরকারের নয়। তড়িঘড়ি করে বন্দর পরিচালনায় বিদেশি কোম্পানির সঙ্গে চুক্তি করা নিয়ে গভীর সন্দেহের সৃষ্টি হয়েছে। 

বিবৃতিতে তারা বলেন, লালদিয়ার প্রকল্পে বাংলাদেশের পক্ষে মধ্যস্থতাকারী বিশ্বব্যাংকের সহযোগী প্রতিষ্ঠান আইএফসি প্রতিবেদনে টার্মিনাল অপারেটরের প্রস্তাব জমা দেওয়ার পর চুক্তি পর্যন্ত কার্যক্রম শেষ করতে ৬২ দিন সময় ধরা হয়েছিল। তবে বন্দর কর্তৃপক্ষ অস্বাভাবিক দ্রুততায় মাত্র দুই সপ্তাহে এই কার্যক্রম শেষ করেছে। এতেও জনমনের সন্দেহ গভীর হয়েছে।

বিবৃতিদাতারা হলেন সাংবাদিক আবুল মোমেন, অর্থনীতিবিদ ড. মইনুল ইসলাম, কথাসাহিত্যিক ফেরদৌস আরা আলীম, নাট্যজন শিশির দত্ত, কথাসাহিত্যিক বিশ্বজিৎ চৌধুরী, কবি ওমর কায়সার, কামরুল হাসান বাদল, কমল সেনগুপ্ত, অলোক রায় ও প্রকৌশলী দেলোয়ার মজুমদার।

 

আরও পড়ুন

×