বনের জমি দখলের নতুন কৌশল আনারস চাষ
ধলাপাড়া বিটের শালিয়াবহ শোকরকরা এলাকায় বনের জমিতে আনারস চাষ। ছবি: সমকাল
ঘাটাইল (টাঙ্গাইল) প্রতিনিধি
প্রকাশ: ২৪ নভেম্বর ২০২৫ | ১১:০০ | আপডেট: ২৪ নভেম্বর ২০২৫ | ১১:০৪
বনের জমিতে ঘরবাড়ি নির্মাণ করে দখলে রাখার পদ্ধতিটা বেশ পুরোনো। দিন বদলে যাচ্ছে। বনের জমি দখলের পদ্ধতিও পাল্টে গেছে। অল্পে তুষ্ট নন দখলদাররা। তাই বেশি জমি দখলের নতুন কৌশল এঁটেছেন তারা। সামাজিক বনায়নের জন্য প্রস্তুত করা প্লটে গাছের চারার পরিবর্তে এখন শোভা পাচ্ছে সারি সারি আনারসের চারা।
বন বিভাগের বিট কর্মকর্তা সমকালকে জানান, আনারসের চারা লাগানোর অনুমতি তিনিই দিয়েছেন। তবে রেঞ্জ কর্মকর্তা জানান, বনের জমিতে আনারস এবং কলার বাগান করা সম্পূর্ণ নিষেধ। এই চিত্র ঘাটাইল উপজেলা বন বিভাগের।
সম্প্রতি বন বিভাগের ধলাপাড়া বিট অফিসের আওতায় শালিয়াবহ শোকরকরা এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, বিশাল এক জায়গায় সারি সারি আনারসের চারা লাগানো হয়েছে। ওই জমির চারপাশেই সামাজিক বনায়নের আকাশমণি গাছের বাগান। কথা হয় স্থানীয় জমির উদ্দিন নামে এক ব্যক্তির সঙ্গে।
তিনি বলেন, চার মাস আগে নিলামের মাধ্যমে এই জমির গাছ বিক্রি করে বন বিভাগ। বিক্রির পরপরই গাছের মূল তুলে হালচাষ করে আনারসের চারা লাগিয়েছেন আবু সাঈদ নামে এক লোক। সরকারের কী নিয়ম জানেন না তারা।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, আনারসের চারা লাগানোর ওই জায়গায় সামাজিক বনায়নের তিনটি প্লট ছিল। প্লটগুলো বরাদ্দ পেয়েছিলেন স্থানীয় জাহাঙ্গীর আলম, আল মামুন এবং বাছিরন বেগম। আল মামুন থাকেন প্রবাসে। বাড়ি গিয়ে পাওয়া যায়নি জাহাঙ্গীর আলমকে। তবে বাছিরন বেগমের ছেলে নবাব আলী বলেন, শুধু এই প্লটগুলোই না, প্রায় ৬০-৬৫ টা প্লটের গাছ এ বছর কাটা হয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ৩০টি প্লটেই আনারসের চারা লাগানো হয়েছে।
অধিকাংশ প্লটেই নির্দিষ্ট মেয়াদ শেষে গাছ বিক্রির পর চলতি বছর আনারসের চাষ করা হয়েছে। কোনো প্লটে আনারসের চারা লাগিয়েছেন সামাজিক বনায়নের উপকারভোগীরা, আবার কোথাও বনের জমি ইজারা দিয়েছেন উপকারভোগীরা। সেই জমি ইজারা নিয়ে অনেকেই বাণিজ্যিকভাবে আনারস চাষ করেছেন। কিন্তু জমিতে এখনও সামাজিক বনায়নের গাছ রোপণ করা হয়নি।
ঘোড়ারটিকি গ্রামের শাহ্ আলম বলেন, প্রতিটি প্লট বার্ষিক ইজারা দেওয়া হয়েছে ১০ থেকে ১২ হাজার টাকায়। শালিয়াবহ বাজারে এ বিষয়ে কথা হলে অনেকেই নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, বিট কর্মকর্তা সরাসরি এ কাজের সঙ্গে জড়িত। লোকজনের কথার সত্যতা মেলে শালিয়াবহ ফরেস্ট ক্যাম্পের কাছে গিয়ে। ক্যাম্প ঘেঁষে সামাজিক বনায়নের প্লটে আনারসের চারা রোপণ করেছেন রফিকুল ইসলাম। তাঁর ভাষ্য, আনারসের বাগান করার বিষয়ে জানেন বিট কর্মকর্তা। তাঁর নির্দেশেই আনারসের বাগান করা হয়েছে।
লক্ষিন্দর গ্রামের মো. রিয়াজ বলেন, আনারসের চারা যখন বড় হয় এর বেশ কিছুদিন পর সামাজিক বনায়নের গাছের চারা লাগানো হয়। সেই গাছের চারা আর আলো-বাতাসে বেড়ে ওঠে না। কারণ হিসেবে তিনি উল্লেখ করেন, আনারসের আবাদ দীর্ঘমেয়াদি করতে কিছুদিন পরপর সামাজিক বনায়নের গাছের মাথা ভেঙে দেওয়া হবে। আর এতে অনেক গাছ মারা যায়। একটা সময় গাছ থাকে না বললেই চলে। এভাবেই একটা সময় জমিটা প্রতিষ্ঠা লাভ করে আনারসের বাগান হিসেবে। তিনি বলেন, বর্তমানে যেসব বন কর্মকর্তা আছেন, তারা একটা সময় বদলি হয়ে যাবেন।
নতুন যারা আসবেন তারা ভেবে নেবেন ওই জমিগুলো ব্যক্তিমালিকানাধীন। পাহাড়ি এলাকায় বনের যত জমি দখল হয়েছে, অনেকটা এই পদ্ধতিতেই হয়েছে বা হচ্ছে।
বন বিভাগের ধলাপাড়া বিট কর্মকর্তা মো. সফেরুজ্জামান বলেন, সামাজিক বনায়নের প্লটে আনারসের চাষ করা যায়। এটা তাদের চুক্তিনামায় আছে। আনারস আবাদ করার ফলে গাছের বৃদ্ধি ভালো হয় বলে জানান এই বিট কর্মকর্তা।
ঘাটাইল বন বিভাগের ধলাপাড়া রেঞ্জ কর্মকর্তা সাব্বির হোসাইন সমকালকে জানান, বাণিজ্যিক এবং ব্যক্তিগতভাবে বনের জমিতে আনারস এবং কলা চাষ সম্পূর্ণ বেআইনি। সামাজিক বনায়নের কোনো প্লটে যদি আনারসের চাষ হয়ে থাকে তবে বিনষ্ট করা হবে। আর এই কাজে যদি বনের কোনো কর্মকর্তা জড়িত থাকেন, তবে তদন্ত করে তাঁর বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
