যোগাযোগ বিড়ম্বনায় দুই উপজেলার সাড়ে তিন লাখ মানুষ
একসময়ের জমজমাট ঘাটে এখন শুধু শূন্যতা। যাত্রী ও লঞ্চের সংখ্যা কমে গেছে। বৃহস্পতিবার সুনামগঞ্জ ঘাটের চিত্র সমকাল
পঙ্কজ দে (সুনামগঞ্জ)
প্রকাশ: ০৭ ডিসেম্বর ২০২৫ | ০৭:১৬
| প্রিন্ট সংস্করণ
বর্ষায় নৌযান ছাড়া ভিন্ন পথ নেই সদরে যাতায়াতের। হেমন্তে আধা পানি-মাটিতে যান বদলে চলতে হয়। গ্রীষ্মের খরায় দুই ও তিন চাকার যান চলে চড়া ভাড়ায়। বছরজুড়ে এমন বিড়ম্বনা সহ্য করেই সুনামগঞ্জ জেলা সদরে যাওয়া-আসা করেন ধর্মপাশা ও মধ্যনগর উপজেলার প্রায় সাড়ে তিন লাখ মানুষ। গেল কয়েক বছর ধরেই এমন অবস্থায় ধর্মপাশা ও মধ্যনগর উপজেলার বাসিন্দাদের। জেলা সদর থেকে ধর্মপাশার সড়ক যোগাযোগ প্রতিষ্ঠা হয়নি এখনও। জেলা সদর থেকে হেমন্তে নানা যন্ত্রণা সয়ে মোটরসাইকেল, না হয় অটোরিকশা, স্পিডবোট বা লঞ্চে চার থেকে ১০ ঘণ্টায় পৌঁছাতে হয় ধর্মপাশায়। এই বিড়ম্বনার সর্বশেষ ঘটনা গেল বুধবারের।
সুনামগঞ্জ থেকে ধর্মপাশায় লঞ্চে যাওয়ার জন্য রাত সাড়ে ১০টা থেকেই লঞ্চঘাটে ছিলেন ২৫ জন যাত্রী। রাত ১১টায় লঞ্চ ছাড়ার কয়েক মিনিট আগে এসে কর্তৃপক্ষ জানায়, এত কম যাত্রী নিয়ে লঞ্চ ছাড়বে না। যাত্রীদের অনুরোধ সত্ত্বেও মোটা লোকসানের কারণে কর্তৃপক্ষ লঞ্চ ছাড়তে আপত্তি জানান। তারা বলেন, লোকসান দিতে দিতে তারা কাবু। এভাবে চলতে পারে না। যাত্রীদের জন্য খারাপ লাগলেও তারা অপারগ।
এক পর্যায়ে যাত্রীরা নিরুপায় হয়ে জেলা প্রশাসকের বাংলোয় গিয়ে হাজির হন। পরে জেলা প্রশাসক ও অতিরিক্ত জেলা প্রশাসকের সঙ্গে আলোচনা করে এমভি মাহফুজ নামের লঞ্চটি যাত্রীদের নিয়ে গন্তব্যে পৌঁছে দেয়।
সুনামগঞ্জ থেকে ধর্মপাশা-মধ্যনগরের লঞ্চে এক সময় শত শত যাত্রীর ভিড় থাকত দিন-রাত। আসা-যাওয়ায় ৮ থেকে ১০টি লঞ্চ ছিল। এখন আগের সেই ব্যবস্থা নেই। দীর্ঘ সময় নিয়ে এই যাতায়াতে তাদের লোকসান সব দিক থেকে।
লঞ্চে যেতে আপারে (ওপরে) ৩৭০ এবং নিচে ২৫০ টাকা হলেও ৭০০ থেকে ৮০০ টাকা খরচ করে সরাসরি কেউ কেউ মোটরসাইকেলে আবার কেউ যাচ্ছেন সিএনজি-স্পিডবোটে। তাতে সময় কম লাগছে। নিম্নআয়ের মানুষদের এখনও লঞ্চই ভরসা।
মধ্যনগর বাজারের ব্যবসায়ী সুমিত চৌধুরী জানান, গেল দুই-তিন বছর ধরে মধ্যনগর সুনামগঞ্জ লঞ্চ চলাচল বন্ধ রয়েছে। বর্ষাকালে স্পিডবোট চলাচল করে। বর্তমানে পানি শুকিয়ে যাওয়ায় মোটরসাইকেলে যাতায়াত করতে হয়। সুনামগঞ্জ থেকে মধ্যনগর যেতে হলে শহরের আব্দুজ জহুর সেতু থেকে সিএনজি বা লেগুনা দিয়ে তাহিরপুর যেতে হয়। ভাড়া লাগে ১২০ টাকার মতো। এর পর তাহিরপুর থেকে মোটরসাইকেলে মধ্যনগর। তাহিরপুর-মধ্যনগর রাস্তার অবস্থা খুবই খারাপ, আসা-যাওয়ায় মানুষকে ব্যাপক ভোগান্তি পোহাতে হয়।
ধর্মপাশার বিএনপি নেতা জুলফিকার আলী ভুট্টো বলেন, সুনামগঞ্জ-ধর্মপাশায় নিয়মিত লঞ্চ চলাচল আছে, তবে পর্যাপ্ত যাত্রী না থাকায় মাঝেমধ্যে চলাচল বন্ধ থাকে। সুনামগঞ্জ থেকে লঞ্চ এখন সদর ইউনিয়নের মেওহারিপুর পর্যন্ত আসে, এর পর উপজেলা সদরে পৌঁছাতে হলে আরও ছয়-সাত কিলোমিটার সড়কপথ পাড়ি দিতে হয় যাত্রীদের। তিনি আরও বলেন, গত বর্ষায় সুনামগঞ্জ থেকে লঞ্চ ধর্মপাশা থানার সামনে পর্যন্ত গিয়েছিল। তিনি বলেন, লঞ্চ যাত্রায় দীর্ঘ সময় লাগে। রাত সাড়ে ১০টা বা ১১টায় লঞ্চ ছাড়লে সকালে ধর্মপাশা পৌঁছায়। আবার সকালে ১০টায় লঞ্চ ছাড়লে বিকেল সাড়ে ৪টা বা ৫টায় গিয়ে পৌঁছায়। সে জন্য অনেকেই লঞ্চের পরিবর্তে স্পিডবোট বা মোটরসাইকেলে চলাচল করেন।
সুনামগঞ্জ-ধর্মপাশা নৌরুটে লঞ্চ ব্যবসায়ী মাসুম আহমদ তালুকদার বলেন, এক সময় ২০০ থেকে ৩০০ যাত্রী নিয়ে লঞ্চ যাতায়াত করত। এখন ভরা বর্ষায় ৭০ থেকে ৮০ জন যাত্রী থাকে। অন্য সময় আরও কম। অন্য আরেকটি লঞ্চের মালিক জানান, সুনামগঞ্জ থেকে ধর্মপাশায় যেতে ২০০ লিটার ডিজেল এবং তিন লিটার মোবিল প্রয়োজন। অল্প যাত্রী নিয়ে পোষায় না। এই মৌসুমে লঞ্চ চলাচল বন্ধ রেখে ট্রলার দিয়ে নৌপথের যোগাযোগ সচল রাখার কথা ভাবছেন তারা।
সুনামগঞ্জ এলজিইডির নির্বাহী প্রকৌশলী বলেন, সুনামগঞ্জ-সাচনা-ধর্মপাশা সড়কের জন্য উড়াল সড়কসহ পাঁচটি প্রকল্পে কাজ করার সিদ্ধান্ত হয়েছে। এর মধ্যে দুটি প্রকল্পের দরপত্র গ্রহণ শেষে অনুমোদন হয়েছে। একটির পারচেজ কমিটিতে অনুমোদনের অপেক্ষায় আছে। অন্য দুটির পুনরায় দরপত্র আহ্বানের বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন। এই কাজ শেষ করতে কমপক্ষে পাঁচ বছর সময়ের প্রয়োজন।
- বিষয় :
- যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন
