‘সশস্ত্র প্রতিরোধ’ ভাস্কর্য সংস্কারে উদ্যোগ নেই
মুক্তিযুদ্ধে গাজীপুর শহরে সশস্ত্র প্রতিরোধ যেখান থেকে শুরু হয়েছিল, ঠিক সেই জায়গাতেই নির্মাণ করা হয় ‘সশস্ত্র প্রতিরোধ’ ভাস্কর্য ফাইল ফটো
ইজাজ আহ্মেদ মিলন, গাজীপুর
প্রকাশ: ১০ ডিসেম্বর ২০২৫ | ০৮:০১ | আপডেট: ১০ ডিসেম্বর ২০২৫ | ০৮:৪৪
| প্রিন্ট সংস্করণ
কারও হাতে একনলা বন্দুক; কেউ বন থেকে নিয়ে এসেছেন গজারি কাঠের লাঠি; ফসলের মাঠ থেকে ছুটে আসা কৃষকের হাতে কাস্তে– এ সবকিছুর সমন্বয়েই গাজীপুর শহরের মুক্তমঞ্চে তৈরি করা হয় ‘সশস্ত্র প্রতিরোধ’ ভাস্কর্য। মুক্তিযুদ্ধের সময় প্রথম সশস্ত্র প্রতিরোধ যেখান থেকে শুরু হয়েছিল ঠিক সেই জায়গাতেই নির্মাণ করা হয় সশস্ত্র প্রতিরোধে অংশ নেওয়া বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার ৯ জনকে নিয়ে ভাস্কর্য। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট বিকেলে ছাত্র-জনতার আন্দোলনের সময় সেই ভাস্কর্য ভেঙে গুঁড়িয়ে দেয় কিছু লোক। ভাস্কর্যের সামনের দিকে আগুন ধরিয়ে উল্লাস চলে ঘণ্টার পর ঘণ্টা। ১৩ ফুট উচ্চতার প্রতিটা ভাস্কর্য ওপর থেকে শুরু করে হাঁটু পর্যন্ত ভেঙে ফেলা হয়েছে। সামনের দিক থেকে এখন আর ভাস্কর্যের কিছুই দেখা যায় না। ব্যানার-ফেস্টুনে ঢেকে আছে পুরো বেদি। সেখানে বসানো হয়েছে ফল আর সবজির দোকান।
মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর ১ কোটি ৭৭ লাখ টাকা ব্যয়ে গাজীপুর শহরের রেললাইনের পশ্চিম পাশে ‘সশস্ত্র প্রতিরোধ’ নির্মাণ করে। গ্লাস ফাইবারে করা ভাস্কর্যটির উদ্বোধন করা হয়নি তখনও। জেলা প্রশাসকের তত্ত্বাবধানে ভাস্কর কুয়াশা বিন্দুর নির্মাণ করা ভাস্কর্যটি উদ্বোধনের আগেই ভেঙে ফেলা হয়। সেদিন ভাস্কর্যের ওপরে উঠে কয়েকজন উল্লাস করে।
‘সশস্ত্র প্রতিরোধ’ নির্মাণের পটভূমি
১৯৭১ সালের ১৯ মার্চ। ‘জয়দেবপুরের পথ ধরো/ বাংলাদেশ স্বাধীন করো’, ‘বীর বাঙালি অস্ত্র ধরো/ বাংলাদেশ স্বাধীন করো’ স্লোগানে মুখরিত হয়ে ওঠে পুরো শহর। বাঁশ-কাঠের লাঠি, একনলা বন্দুক আর কাস্তে হাতে নিয়ে জনতা জড়ো হন জয়দেবপুরে। সকলের উদ্দেশ্য একটাই– যেভাবেই হোক পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলা। মুক্তিযুদ্ধের প্রথম অগ্নিস্ফুলিঙ্গের জন্ম হয় গাজীপুরে সশস্ত্র প্রতিরোধ সংগ্রামের উত্তাপ থেকে। এদিন গাজীপুরেই প্রথম প্রতিরোধ আন্দোল গড়ে তুলেছিল বীর বাঙালি। গর্জে উঠেছিল মুক্তিকামী জনতা।
গাজীপুর জেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ড কাউন্সিলের আহ্বায়ক অ্যাডভোকেট রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘২৬ মার্চ স্বাধীনতা লাভের নেপথ্যে গাজীপুরবাসীর রক্তঝরা প্রতিবাদ। এ থেকেই বাঙালি যুদ্ধ করার প্রবল শক্তি পেয়েছিল। ভাওয়াল রাজবাড়িতে তৎকালীন সেনানিবাসে দ্বিতীয় বেঙ্গল রেজিমেন্টকে নিরস্ত্র করার জন্য ব্রিগেডিয়ার জাহানজেব আবরারের নেতৃত্বে এক দল সৈন্য জয়দেবপুর সেনানিবাসে আসে। সে খবর মুহূর্তেই ছড়িয়ে পড়ে।

জাহানজেব আবরার আগেই টের পেয়েছিলেন বাঙালি কর্মকর্তা ও সেনাসদস্যদের মনোভাব। পাকিস্তানি সেনাদের আগমনের খবরে আগে থেকেই রেজিমেন্টের সদস্যরা প্রস্তুত। এক পর্যায়ে জনতা ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের চান্দনা চৌরাস্তা থেকে জয়দেবপুর পর্যন্ত রাস্তায় নামেন ইট-পাথর, কাঠ হাতে নিয়ে। বড় বড় গাছ ফেলে যান চলাচল বন্ধ করে দেন।’ রফিকুল ইসলাম বলেন, সেদিন জয়দেবপুরে ছিল হাটের দিন। জয়দেবপুর রেলগেটে পণ্যবাহী গাড়ির বগি, অকেজো রেললাইন, স্লিপারসহ বড় বড় গাছের গুঁড়ি, কাঠ, বাঁশ, ইট দিয়ে বিশাল ব্যারিকেড দেওয়া হয়। জয়দেবপুর থেকে চৌরাস্তা পর্যন্ত আরও পাঁচটি স্থানে ব্যারিকেড দেওয়া হয়, যাতে পাকিস্তানি বাহিনী অস্ত্র নিয়ে ফিরে যেতে না পারে। মুক্তিকামী মানুষ যখন ব্যারিকেড দিচ্ছিলেন তখন টাঙ্গাইল থেকে রেশন নিয়ে একটি কনভয় জয়দেবপুরে আসছিল। সে সময় কনভয়ে থাকা পাঁচ সৈন্যের রাইফেল কেড়ে নেওয়া হয়। এদিকে রেলগেটের ব্যারিকেড সরানোর জন্য দ্বিতীয় ইস্টবেঙ্গল রেজিমেন্টকে ব্রিগেডিয়ার জাহানজেব আদেশ দেন। কৌশল হিসেবে বাঙালি সৈন্যদের সামনে দিয়ে পেছনে অবস্থান নেন পাঞ্জাবি সৈন্যরা।
মেজর কেএম সফিউল্লাহকে জনগণের ওপর গুলিবর্ষণের আদেশ দেওয়া হয়। বেঙ্গল রেজিমেন্টের সৈন্যরা জনতার ওপর গুলি না করে আকাশের দিকে গুলি ছুড়তে ছুড়তে সামনে আগাতে থাকলে বাঙালিরা বর্তমান গাজীপুর কেন্দ্রীয় জামে মসজিদের ওপর অবস্থান নিয়ে বন্দুক ও চায়নিজ রাইফেল দিয়ে সেনাবাহিনীর ওপর গুলিবর্ষণ শুরু করে। এ সময় হানাদার বাহিনীর গুলিতে জয়দেবপুরে শহীদ হন নেয়ামত ও মনু খলিফা। আহত হন ডা. ইউসুফসহ শত শত মানুষ। পাকিস্তানি বাহিনী কারফিউ জারি করে এলোপাতাড়ি গুলিবর্ষণ শুরু করলে বাঙালিদের প্রতিরোধ কিছুটা ভেঙে পড়ে। এক পর্যায়ে বীর জনতা পিছু হটলে দীর্ঘ সময় চেষ্টা করে ব্যারিকেড পরিষ্কার করে জাহানজেব চান্দনা চৌরাস্তায় এসে আবার প্রবল বাধার সম্মুখীন হন। তখন পেছন দিক থেকে এক পাঞ্জাবি সৈন্য হুরমতের মাথায় গুলি করলে তিনি সেখানেই শাহাদত বরণ করেন।
স্বাধীনতা যুদ্ধে গড়ে তোলা প্রথম সশস্ত্র প্রতিরোধ আন্দোলনকে স্মরণে রাখতে মুক্তমঞ্চে গড়ে তোলা হয় সশস্ত্র প্রতিরোধ ভাস্কর্য। উদ্বোধনের আগেই সেটি ভেঙে ফেলা প্রসঙ্গে বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতা হাসান উদ্দিন সরকার বলেন, কোনোভাবেই এটি ভাঙা উচিত হয়নি। এটি নতুন প্রজন্মকে ১৯ মার্চের কথা মনে করিয়ে দেবে যুগ যুগ ধরে। সেখানে আরও ভালো করে একটি ভাস্কর্য নির্মাণ করা যেতে পারে। জেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ড কাউন্সিলের আহ্বায়ক রফিকুল ইসলাম বলেন, ওখানে পুনরায় একটি ভাস্কর্য নির্মাণ করার জন্য জেলা প্রশাসকের কাছে আবেদন করব। ভাস্কর কুয়াশা বিন্দু বলেন, দীর্ঘ সময় পরিশ্রম ও সাধনা করে ভাস্কর্যটি তৈরি করেছিলাম। কিন্তু মুহূর্তের মধ্যে সেটি ভেঙে ফেলা হয়। এ দৃশ্য দেখার পর থেকে আমি স্বাভাবিক হতে পারিনি। গাজীপুরের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ আলম হোসেন বলেন, সুযোগ হলে আবার ভাস্কর্যটি নির্মাণ করা হবে।
- বিষয় :
- ভাস্কর্য
- মুক্তিযুদ্ধ
