রাজবাড়ী বাস টার্মিনালের ১৬ বছর ব্যবহার নেই
রাজবাড়ীর শ্রীপুর এলাকায় ১৯৯৪ সালে দুই কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মাণ করা হয় জেলা বাস টার্মিনাল। দু’দফায় অল্প কিছুদিন এটি চালু ছিল। এরপর দীর্ঘ ১৬ বছর ধরে বাস মালিকদের অনাগ্রহের কারণে সেটি অব্যবহৃত পড়ে আছে। সম্প্রতি তোলা -সমকাল
রাজবাড়ী প্রতিনিধি
প্রকাশ: ১৪ ডিসেম্বর ২০২৫ | ০৭:১২
| প্রিন্ট সংস্করণ
প্রায় দুই কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত রাজবাড়ীর কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনালটি ১৬ বছর ধরে অব্যবহৃত পড়ে আছে। ১৯৯৪ সালে নির্মাণের পর গত ৩১ বছরে এটি দু’দফায় কিছুদিনের জন্য চালু ছিল। এরপর ২০০৯ সাল থেকে টার্মিনালটি বন্ধ আছে। এখন সেটি অচল গাড়ি রাখার জায়গা হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।
বছরের পর বছর অব্যবহৃত পড়ে থেকে টার্মিনালের অবকাঠামো নষ্ট হচ্ছে। পরিবহন শ্রমিকরা বলছেন, জেলা শহরে একটি বাস টার্মিনাল থাকা খুবই জরুরি। বাস মালিকরা আন্তরিক হলেই সেটি চালু করা সম্ভব। অন্যদিকে বাস মালিকরা অজুহাত দিচ্ছেন, শহরে স্টপেজ না দিলে যাত্রীদের হাতে শ্রমিকদের লাঞ্ছিত হতে হয়। বর্তমানে রাজবাড়ীর বাসগুলো থামছে শহরের মুরগির ফার্ম ও বড়পুল মোড়ে রাস্তার ওপর; যেখানে কোনো যাত্রী ছাউনি নেই।
রাজবাড়ী জেলা পরিষদ কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, জেলা পরিষদের অর্থায়নে ১৯৯৪ সালে রাজবাড়ী শহর থেকে তিন কিলোমিটার দূরে শ্রীপুর এলাকায় চার একর জায়গাজুড়ে এক কোটি ৭৪ লাখ টাকা ব্যয়ে জেলা বাস টার্মিনালটি নির্মাণ করা হয়। ১৯৯৪ সালের ১৯ এপ্রিল তৎকালীন সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী
জাহানারা বেগম টার্মিনালটি
উদ্বোধন করেন। উদ্বোধনের কিছুদিন চালু থাকার পর এটি বন্ধ হয়ে যায়। ২০০০ সালে টার্মিনালটি জেলা পরিষদ থেকে রাজবাড়ী পৌরসভায় হস্তান্তর করা হয়।
২০০৭ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় টার্মিনালটি আবার চালু করা হয়। ওই সময় যাত্রীদের সুবিধার জন্য শহরের মুরগির ফার্ম এলাকায় একটি বাস স্টপেজ গড়ে ওঠে। ২০০৯ সালে টার্মিনালটি বন্ধ হয়ে গেলে মুরগির ফার্মটিই বাসস্ট্যান্ড হয়ে যায়। একই সঙ্গে শহরের বড়পুল মোড়ে আরেকটি বাস স্টপেজ দেওয়া হয়। এ দুটি স্থানে রাস্তার ওপরেই থামে বাস।
সম্প্রতি শ্রীপুরে বাস টার্মিনালে গিয়ে দেখা যায়, টার্মিনালটির তিন পাশে দোকানপাট; যার অর্ধেকের বেশি বন্ধ। যেসব দোকান খোলা আছে তারা অনেকটাই অলস সময় কাটাচ্ছেন। ব্যবসায়ীদের তথ্যমতে, টার্মিনালে একশর মতো দোকান আছে। এর মধ্যে অর্ধেকের বেশি বন্ধ। খোলা দোকানগুলোর বেশির ভাগই মটর পার্টসের অথবা ওয়ার্কশপের। রয়েছে কিছু চায়ের দোকান। টার্মিনালের মাঝখানে কিছু বাস আছে। যেগুলো মেরামত করা হচ্ছে। টার্মিনালের যে স্থাপনা আছে তার বারান্দায় ভাঙা চেয়ার টেবিল রাখা। কক্ষগুলো বন্ধ। অবকাঠামোগুলো ধীরে ধীরে নষ্ট হচ্ছে। টার্মিনাল উদ্বোধনের নামফলক এখনও রয়ে গেছে।
টার্মিনালের প্রীতি অটো পার্টসের মালিক বিষ্ণু দত্ত জানান, ২০ বছর আগে অনেক আশা করে দোকান নিয়েছিলেন, টার্মিনালে পার্টসের ভালো ব্যবসা হবে। আশায় আশায় ২০ বছর চলে গেল। টার্মিনাল আর চালু হলো না। ব্যবসার অবস্থা শোচনীয়। সারাদিন কাস্টমারের জন্য দোকানে বসে থাকেন। কোনো দিন দুই হাজার, কোনোদিন তিন হাজার টাকা বিক্রি হয়। যা লাভ হয় তা দিয়ে সংসার চলে না। সংসার চালাতে গিয়ে তিনি অনেক ঋণী হয়ে গেছেন। খুবই খারাপ অবস্থায় আছেন টার্মিনালের ব্যবসায়ীরা।
মাহবুব হোসেন জানান, তিনি মোটর মেকানিকের কাজ করেন। ২০ বছর আগে এক লাখ ১০ হাজার টাকা জামানত দিয়ে টার্মিনালে দোকান নিয়েছিলেন। মাসে এক হাজার টাকা ভাড়া দিতে হয়। প্রতিদিন আসেন। কাজ পেলে করেন। না হলে অটোরিকশা নিয়ে বেরিয়ে পড়েন। এভাবেই চলছে তাঁর জীবন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন ব্যবসায়ী জানান, টার্মিনাল উদ্বোধনের পরপরই তিনি দোকান নিয়েছিলেন। যখন চালু ছিল ভালো বেচাকেনা হতো। কিছুদিন টার্মিনাল চালু থেকে বন্ধ হয়ে গেল। তাদের ভাগ্যে অন্ধকার নেমে এলো। দোকানে বেচাকেনা নেই। কিছু করার নেই। দুপুর ১২টার দিকে দোকানে আসেন। বসে থাকেন, আবার সন্ধ্যার দিকে চলে যান। এখানে ব্যবসা না হওয়ায় অনেক ব্যবসায়ী অন্যত্র চলে গেছেন। যারা যেতে পারছেন না তারা এখনও পড়ে আছেন।
ওয়ার্কশপের মালিক আরশাদ খান আক্ষেপ করে বলেন, স্টেডিয়াম এলাকার দোকান ছেড়ে এখানে এসেছিলেন। তাঁর পাঁচজন কর্মচারী ছিল। ভালো ব্যবসা হতো। টার্মিনাল চালু না হওয়ায় ব্যবসা বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছে। এখন তিনি আর একজন সহকারী মিলে দোকান চালান।
টার্মিনাল চালু হোক, চান শ্রমিকরা
পরিবহন শ্রমিকরা চাইছেন টার্মিনালটি চালু হোক। সপ্তবর্ণা পরিবহনের চালক শাকিল বিশ্বাস বলেন, দেশের প্রায় সব জেলাতেই বাস টার্মিনাল আছে। আমাদের রাজবাড়ীতে থেকেও নেই। বাস টার্মিনাল থাকলে পরিবহন শ্রমিকদের যেমন সুবিধা আছে, যাত্রীদেরও আছে। রাজবাড়ী শহরের যে দুই জায়গায় বাস থামে, সেখানে কোনো যাত্রী ছাউনি নেই। এতে রোদ, ঝড়, বৃষ্টিতে যাত্রীদের সমস্যা হয়। শ্রমিকদেরও বসার কোনো জায়গা নেই। টার্মিনাল চালু থাকলে এ সমস্যা হতো না। তিনি টার্মিনালটি চালুর দাবি জানান।
রাজবাড়ী পরিবহন শ্রমিক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক আব্দুর রশীদ জানান, মালিক সমিতি চাইলেই টার্মিনালটি চালু হতে পারে। এখানে তাদের কোনো ব্যাপার নেই। টার্মিনাল চালু হোক এটা তারা চান।
যাত্রী না পাওয়ার অজুহাত মালিকদের
রাজবাড়ী পরিবহন মালিক গ্রুপের সাধারণ সম্পাদক সুকুমার সরকার জানান, টার্মিনাল চালু করতে হলে রাজবাড়ীর দুটি স্টপেজ বন্ধ করতে হবে। বাস্তবতা হলো ওই দুটি স্টপেজে যাত্রী নামানো না হলে শ্রমিকদের লাঞ্ছিত হতে হয়। তাদের ওপর যাত্রীরা চড়াও হয়। এ কারণেই চালু করা যাচ্ছে না। এ বছর তারা ২৯ লাখ টাকায় ইজারা নিয়েছেন টার্মিনালটি। তাদের সেই টাকা ওঠে না। পরিবহন শ্রমিক-মালিকদের স্বার্থে তারা ইজারা নেন। যেসব গাড়ি রাস্তায় চলে না সেগুলো টার্মিনালে রাখা হয় বলে জানান তিনি।
রাজবাড়ী পৌরসভার প্রশাসক ও স্থানীয় সরকার উপপরিচালক মো. মাহমুদুল হক বলেন, টার্মিনালটি বাস মালিক গ্রুপকে ইজারা দেওয়া হয়েছে। বাস মালিক সমিতি চাইলে টার্মিনালটি চালু হতে পারে। তবে, বাস মালিকদের অজুহাত ওখানে টার্মিনাল চালু হলে তারা যাত্রী পাবেন না।
- বিষয় :
- বাস টার্মিনাল
