খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়
শিক্ষার্থী নির্যাতনে জড়িত শিক্ষক কর্মচারীদের বিচার হয়নি
মিথ্যা মামলার শিকার অনেক শিক্ষার্থী
খুলনা ব্যুরো
প্রকাশ: ১৯ ডিসেম্বর ২০২৫ | ০৮:২২
| প্রিন্ট সংস্করণ
খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (কুয়েট) ড. এমএ রশিদ হলের শিক্ষার্থী ছিলেন জাহিদুর রহমান। সামাজিক মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের একটি গ্রুপে আদান-প্রদান করা বার্তাকে সরকারবিরোধী উল্লেখ করে তাঁকে তুলে নিয়ে যান ছাত্রলীগের নেতাকর্মী। এর পর হলের অতিথি কক্ষে নিয়ে রাতভর পিটিয়ে সকালে তাঁকে পুলিশের হাতে তুলে দেওয়া হয়। এ ঘটনা ২০২২ সালের ১১ সেপ্টেম্বর রাতের। জাহিদুর তখন ইলেক্ট্রনিক্স অ্যান্ড কমিউনিকেশন ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র।
এ ঘটনায় বিশ্ববিদ্যালয়ের নিরাপত্তা কর্মকর্তা সাদেক হোসেন প্রামাণিক বাদী হয়ে জাহিদুর রহমানের বিরুদ্ধে মামলা করেন। ৫২ দিন কারাভোগের পর ২০২২ সালের ২ নভেম্বর জাহিদুর জামিনে মুক্তি পান। তারপরও তিনি ক্লাসে ফিরতে পারেননি। পরের দুই বছর পালিয়ে, বাড়ি থেকে লেখাপড়ার চেষ্টা করেছেন; কিন্তু পারেননি। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পর জাহিদুর ক্যাম্পাসে ফেরেন। লেখাপড়াও শুরু করেন। ততদিন তাঁর জীবন থেকে দুটি বছর হারিয়ে গেছে।
শুধু জাহিদুর রহমান নন; ভিন্নমত প্রকাশ, সামাজিক মাধ্যম ফেসবুকে লেখালেখির কারণে কুয়েটে অনেক শিক্ষার্থী ছাত্রলীগের নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। নির্যাতনের পর কুয়েটের শিক্ষক-কর্মকর্তা-কর্মচারীরাই ছাত্রলীগের পক্ষ নিয়ে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে মামলা করেন। তাদের শিক্ষা কার্যক্রম থেকে বিরত রাখেন। এসব ঘটনায় গণঅভ্যুত্থানের পর ছাত্রলীগের ১৩ জনের শাস্তি হলেও বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং শিক্ষক কারোরই বিচার হয়নি।
ভুক্তভোগী জাহিদুর রহমান বলেন, গণঅভ্যুত্থানের পর গত বছরের ১৫ আগস্ট আমি বিচার চেয়ে কুয়েট প্রশাসনের কাছে অভিযোগ দিই। ২০২৪ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর তদন্ত কমিটি প্রতিবেদন দেয়। এর প্রেক্ষিতে ছাত্রলীগের ১৩ জনকে শাস্তি দেওয়া হয়। কিন্তু যিনি আমার বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা করেন সেই কর্মকর্তা এবং যারা আমাকে ক্লাসে যেতে বাধা দিয়েছেন, তাদের কোনো বিচার হয়নি।
ভুক্তভোগীরা জানান, ২০১৭ সালের ১ মে রাতে বঙ্গবন্ধু হলের অতিথি কক্ষে নির্মমভাবে পেটানো হয় ১৪ জন শিক্ষার্থীকে। নির্যাতনে আরবান অ্যান্ড রিজিওনাল প্লানিং বিভাগের শিক্ষার্থী লুৎফর রহমানের দুটি কিডনি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ইন্ডাস্ট্রিয়াল ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট বিভাগের শিক্ষার্থী মাহাদী হাসান, ইলেক্ট্রিক্যাল অ্যান্ড ইলেক্ট্রনিক ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের আসাদুজ্জামান রিয়ানের পায়ের নখ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। এর পর নির্যাতিত শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধেই মামলা করে কুয়েট প্রশাসন। সেই মামলা এখনও চলছে।
গণঅভ্যুত্থানের পর ভুক্তভোগী লুৎফর রহমান বাদী হয়ে কুয়েটের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক মো. আলমগীর হোসেনসহ ১৫ জনের বিরুদ্ধে আদালতে মামলা করেন। আদালত মামলাটি তদন্তের জন্য খানজাহান আলী থানাকে নির্দেশ দেন। সে তদন্ত এখনও শেষ হয়নি।
খানজাহান আলী থানার নতুন ওসি সানোয়ার হোসাইন মাসুম মামলার অগ্রগতি বিষয়ে কিছু জানাতে পারেননি।
ভুক্তভোগী মাহাদী হাসান বলেন, ‘ছাত্রলীগের কমিটি গঠন বা বড় কোনো উপলক্ষ সামনে ওরা আলোচনায় আসার জন্য নিরীহদের ধরে ধরে পেটাত। একটি ঘটনায়ও কুয়েটের তৎকালীন উপাচার্য, ছাত্রবিষয়ক পরিচালক, রেজিস্ট্রার ছাত্রদের পাশে দাঁড়াননি। এ জন্য ছাত্রলীগের পাশাপাশি শিক্ষক-কর্মকর্তাদের বিচারের জন্য আমি পৃথক দুটি আবেদন করি। একটিরও সুরাহা হয়নি।’
এ বিষয়ে কুয়েটের বর্তমান উপাচার্য অধ্যাপক ড. মাকসুদ হেলালী বলেন, ‘বেশির ভাগ ঘটনা ও মামলা আমি যোগ দেওয়ার আগে হয়েছে। কিছু বিষয় রয়েছে মামলা ও তদন্তের পর্যায়ের। তদন্ত ও আদালতের কাজ শেষ না হলে এসব বিষয়ে আমার কিছু করার নেই।’
- বিষয় :
- কুয়েট
