রাত হলে জেগে ওঠে অবৈধ বালু-মাটি ব্যবসায়ী চক্র
দেওয়ানগঞ্জ উপজেলার পাথরেরচর পূর্বপাড়া গ্রামে লকাইঝর্ণা থেকে রাতে তুলে রাখা বালুর স্তূপ সমকাল
রাজ্জাক মিকা, দেওয়ানগঞ্জ (জামালপুর)
প্রকাশ: ২৬ ডিসেম্বর ২০২৫ | ০৯:০৬ | আপডেট: ২৬ ডিসেম্বর ২০২৫ | ১৫:০৯
| প্রিন্ট সংস্করণ
দেদার চলছে নদীর বালু উত্তোলন। কেটে নেওয়া হচ্ছে ফসলি জমির উর্বর মাটি। প্রশাসনের চোখ ফাঁকি দিতে রাতকে বেছে নিয়েছেন মাটি ব্যবসায়ীরা। সন্ধ্যা থেকে রাতভর চলছে বালু উত্তোলন ও ফসলি জমির মাটি কাটা। বালু উত্তোলনের কারণে হুমকির মুখে পড়ছে নদীপারের বসতি। ফসলি মাঠের মাটি কাটায় উর্বরাশক্তি হারাচ্ছে জমি। বালু উত্তোলন ও ফসলি জমির মাটি কাটা বন্ধের দাবি জানিয়েছেন এলাকাবাসী।
দেওয়ানগঞ্জ উপজেলার ওপর দিয়ে বয়ে গেছে যমুনা, ব্রহ্মপুত্র, জিঞ্জিরাম, মহারাণীসহ কয়েকটি নদী। প্রতিবছর বন্যায় নদীগুলোর দুই তীরে পলিমাটি জমে। ফসল চাষের জন্য পলিমাটি খুবই উপযোগী। কিন্তু এসব উর্বর মাটি ভেকু দিয়ে দেদার কেটে নিয়ে ইটভাটায় বিক্রি করছে মাটি ব্যবসায়ী চক্র। কিছু মাটি যাচ্ছে বসতবাড়ি উঁচুকরণ কাজে। এসব মাটি ব্যবসায়ী এলাকায় অনেক প্রভাবশালী। প্রতিবাদ করার সাহস করেন না এলাকাবাসী। আগে দিনের বেলা বালু উত্তোলন ও মাটি কাটার কাজ চলত। তাতে পড়ত প্রশাসনের নজর। ঝামেলা পোহাতে হতো বালু ও মাটি ব্যবসায়ীদের। এ
কারণে প্রশাসনের চোখ ফাঁকি দিতে সময়সূচি পাল্টেছে অভিযুক্তরা।
সরেজমিন ডাংধরা ইউনিয়নের গোয়ালকান্দা গ্রামে ফসলি জমির মাটি কাটার ভেকু দেখা যায়। ভেকুটি দীর্ঘদিন ধরে চলছে বলে জানান স্থানীয়রা। মূল সড়ক থেকে অনেকটা কাঁচা রাস্তা পার হয়ে ভেতরের দিকে গোয়ালকান্দা গ্রাম। কুমারেরচর বাজার থেকে দক্ষিণ-পশ্চিম দিকে গ্রামটি। গ্রামবাসী জানান, জমির মালিকরা একটি চক্রের প্রলোভনে পড়ে টাকার আশায় তাদের ক্ষেতের মাটি বিক্রি করছেন। উর্বর মাটি কিনে নিয়ে যাচ্ছেন ইটভাটার মালিকরা। কিছু মাটি কিনছেন বসতবাড়ি উঁচুকরণের কাজে।
গোয়ালকান্দা গ্রামের পাশ দিয়ে বয়ে গেছে জিঞ্জিরাম নদী। নিচু এলাকা গোয়ালকান্দা। প্রতিবছর বন্যার পানি ওঠে গ্রামে। জমিগুলোতে জমে পলিমাটি। এই সুযোগ কাজে লাগিয়েছেন ইটভাটা ও ভেকু মালিকরা। তারা জমির মালিকদের প্রলোভন দেখিয়ে নামমাত্র টাকা দিয়ে উর্বর মাটি কেটে নিয়ে যাচ্ছেন।
স্থানীয়রা জানান, পলি জামায় উপরিভাগের মাটি চাষাবাদের জন্য খুব উপযোগী। জমিগুলোতে ধান, পাটসহ অন্য ফসল ভালো ফলে। উপরিভাগের মাটি তোলায় জমি উর্বরাশক্তি হারাচ্ছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন গ্রামবাসী জানান, ফসলি জমি থেকে কয়েক মাস ধরে মাটি তুলছে ভেকুটি। ভেকুর মালিক প্রভাবশালী। সে কারণে কেউ প্রতিবাদ করছেন না। প্রশাসন বিষয়টি জানে কিনা, সে কথা জানে না কেউ। আগে মাটি কাটা হতো দিনের বেলায়। এখন সময়সূচি পাল্টেছে মাটিখেকো চক্রটি। এখন মাটি তুলছে রাতে। বেশির ভাগ সময় সারারাত চলে ভেকুটি।
একই ইউনিয়নের পাথরেরচর বাজারের উত্তর পাশে ও পাথরেরচর পূর্বপাড়ায় লকাইঝর্ণার পাড়ে আরও দুটি ভেকু দেখা যায়। এখানকার চিত্রও ভিন্ন নয়। দিনের বেলা চলছে না ভেকুটি। রাতে কাটা হচ্ছে ফসলি জমির মাটি। এখানকার কাটা মাটিও যাচ্ছে ইটভাটাসহ বসতভিটা উঁচুকরণ কাজে। মাটি কাটার স্থান দুটিও মূল সড়ক থেকে ভেতরে। সচরাচর চোখে পড়ার মতো নয়। বাইরে থেকে কেউ বুঝবে না এখানে ভেকু দিয়ে মাটি কাটা হচ্ছে। এই সুযোগ কাজে লাগিয়েছেন মাটি ব্যবসায়ী চক্র।
মাঝেমধ্যে তোলা হচ্ছে বালু। নদীর কিনারেই উঁচু করে রাখা হয়েছে সেই বালু। ভারত থেকে ঝর্ণার স্রোতে বয়ে আসা হালকা হলুদ বর্ণের মোটা বালু। বিক্রি করছেন চড়া দরে।
পাথরেরচর গ্রামের বাসিন্দা আবু হানিফ বলেন, কিছুদিন থেকে রাতে চলছে ভেকুটি। লকাইঝর্ণার বালু তোলার ইতিহাস দীর্ঘদিনের। কোনো কিছুতেই থামছে না চক্রটি। বিষয়টি প্রশাসন জানে। কিন্তু প্রতিকার মিলছে না। ইদানীং সময় ও ধরন পাল্টেছে বালু উত্তোলনের। আগে ভেকু ছিল না। ভিন্ন উপায়ে তোলা হতো লকাইঝর্ণার বালু। এই বালু ঘিরে একটি সিন্ডিকেট তৈরি হয়েছে। তারা অনেক প্রভাবশালী। সে কারণে গ্রামবাসী প্রতিবাদ করতে পারছেন না। বালু উত্তোলন বন্ধে প্রশাসনের হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন তারা।
ডাংধরা ইউনিয়ন সহকারী ভূমি কর্মকর্তা ফজলুল করিম মামুন বলেন, কয়েক দফা ভেকুগুলো বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। এখন শুনছেন রাতে ভেকু দিয়ে মাটি তোলা হচ্ছে। শিগগিরই ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
সবুজপুরের চিত্র ভিন্ন। দেওয়ানগঞ্জ-ডাংধরা সড়ক। পাশেই জিঞ্জিরাম নদী। নদীটি সরু। এই নদীর কয়েকটি স্থানে ড্রেজার (খননযন্ত্র) বসিয়ে দেদার বালু তুলছে একটি মহল। সরেজমিন গিয়ে ড্রেজার বন্ধ পাওয়া গেছে। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, এশার নামাজের পর ড্রেজার চালু হয়। পাশেই ফসলি জমি। কূল ঘেঁষে বসানো হয়েছে ড্রেজার। বর্ষায় স্রোতের তোড়ে ভেঙে নেবে ফসলি জমি, এমন শঙ্কায় রয়েছেন এলাকাবাসী। তবুও থামাচ্ছে না বালু উত্তোলন।
ঝালরচর গ্রামের মইন উদ্দীন বলেন, ড্রেজারের মালিকরা প্রভাবশালী। সে কারণে কেউ প্রতিবাদ করার সাহস করেন না। বাধাও দিচ্ছেন না। আগে বালু তুলত দিনে, এখন তোলে রাতে।
প্রতিরাতে এশার নামাজের পর শুরু হয় বালু উত্তোলন। চলে রাতভর।
হাতিভাঙ্গা ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান আবুল কালাম আজাদের ভাষ্য, বিষয়টি জানেন না তিনি। খোঁজ নিয়ে দ্রুত ব্যবস্থা নেবেন।
অবাধে নদীর বালু উত্তোলন ও ফসলি জমির মাটি কাটা বন্ধে কী পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে তা জানতে যোগযাযোগ করা হয় দেওয়ানগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মুরাদ হোসেনের সঙ্গে। তাঁর ভাষ্য, তিনি দেওয়ানগঞ্জে সদ্য যোগদান করেছেন। বালু ও মাটি কাটার বিষয়ে জানা ছিল না তাঁর। খোঁজখবর নিয়ে শিগগিরই পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
- বিষয় :
- বালুদস্যু
