মাটির লোভে ক্ষতবিক্ষত হালদা
রাত-দিন হালদাতীরের মাটি কেটে নিচ্ছে একটি চক্র। সম্প্রতি চট্টগ্রামের ফটিকছড়ি উপজেলার পাইন্দং ইউনিয়নের ফকিরাচান এলাকায় (ছবি-সমকাল)
ইকবাল হোসেন মনজু, ফটিকছড়ি (চট্টগ্রাম)
প্রকাশ: ২৯ ডিসেম্বর ২০২৫ | ১৩:৫৮
দেশের একমাত্র মৎস্য হেরিটেজ হালদা নদী মাটি লুটেরাদের লোভে ক্ষতবিক্ষত হয়ে পড়ছে। একটি চক্র প্রকাশ্যে হালদার বুক থেকে মাটি তুলে দেদার ইটভাটায় বিক্রি করছে। এতে মৎস্যসহ জীববৈচিত্র্য হুমকির পাশাপাশি বিপন্নের মুখে নদীর অস্তিত্ব।
খাগড়াছড়ির মানিকছড়ি উপজেলার হালদা ছড়া থেকে উৎপত্তি হয়ে ৯৮ কিলোমিটার দীর্ঘ এ নদী ফটিকছড়ি, রাউজান ও হাটহাজারী উপজেলার মধ্য দিয়ে কর্ণফুলী নদীতে গিয়ে পড়েছে। হালদা বিশ্বের একমাত্র জোয়ার-ভাটাযুক্ত নদী, যেখানে রুই, কাতলা, মৃগেল ও কালিবাউশ জাতীয় মাছ প্রাকৃতিকভাবে ডিম ছাড়ে। এ নদীর গুরুত্ব বিবেচনায় সরকার এটিকে প্রতিবেশ সংকটাপন্ন এলাকা হিসেবে ঘোষণা করেছে।
স্পর্শকাতরতা বিবেচনা করে হালদা নদী রক্ষায় সরকার বিভিন্ন সময় এ নদীতে মাছ শিকার, নদী থেকে বালু তোলা ও যান্ত্রিক নৌযান চলাচলের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। কিন্তু সরকারের ঘোষণাকে তোয়াক্কা না করে নদী থেকে বালু ও মাটি তোলা অব্যাহত রেখেছে স্থানীয় প্রভাবশালী মাটি লুটেরা চক্র। অপরিকল্পিতভাবে নদী খনন করে মাটি তোলায় নদীর মূল স্রোতধারা পরিবর্তনের ঝুঁকি রয়েছে। এতে মৎস্য প্রজননে বিঘ্ন ঘটার পাশাপাশি নদীর পার ভাঙনের শঙ্কা তৈরি হয়েছে।
বৃহস্পতিবার সরেজমিন উপজেলার পাইন্দং ইউনিয়নের ফকিরাচান ও মাদার্শা এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, শ্রমিক দিয়ে হালদা নদীর পার কেটে মাটি ডাম্প ট্রাক ও ট্রাক্টরে করে পাচার করা হচ্ছে। এ ছাড়া নদীর পার থেকে অবাধে তোলা হচ্ছে বালু। এতে নদীর বুকে বিভিন্ন স্থানে বড় বড় গর্ত তৈরি হয়েছে। নদীর পার এমনভাবে মাটি কেটে নেওয়া হয়েছে যে, বোঝার উপায় নেই যে, এটি হালদা নদী। গত কয়েক মাসে এভাবে মাটি কাটার ফলে হালদার পার পরিণত হয়েছে বিরান ভূমিতে। ঘটনাস্থলে থাকা শ্রমিক ও ট্রাক্টর চালকদের কাছে কারা মাটি কাটছে জানতে চাইলে কিছু না বলে দ্রুত সেখান থেকে পালিয়ে যায় তারা।
স্থানীয় আবুল কাশেম, রমজান আলী, আজিজুল হক অভিযোগ করে বলেন, নির্বিচারে হালদা নদীর পার কাটার ফলে নদীর অস্তিত্ব বিলীন হতে বসেছে। দিনের বেলায় শ্রমিক দিয়ে এবং রাতে ভেকু (এক্সক্যাভেটর) ব্যবহার করে নদীর জায়গা থেকে মাটি তোলা হচ্ছে। স্থানীয় ইটভাটাগুলোতে বালু মিশ্রিত এসব মাটির চাহিদা থাকায় তা চড়া দামে বিক্রি করছে স্থানীয় একটি প্রভাবশালী চক্র। গ্রামীণ সড়কে রাতদিন বালু এবং মাটির ট্রাক চলার কারণে রাস্তাঘাট নষ্ট হয়ে চলাচল অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। ধুলাবালিতে অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছে বাসিন্দাদের জীবন।
পাইন্দং ইউনিয়ন জামায়াতের সভাপতি এরশাদ উল্লাহ বলেন, পাইন্দংয়ে নির্বিচারে মাটি কাটা ও বালু তোলা হচ্ছে। প্রশাসন কোনো উদ্যোগ না নিলে রাজনৈতিক দলের তো কোনো ক্ষমতা নেই এসব বন্ধ করার। রাজনৈতিক দলের নাম ব্যবহার করে কেউ যদি এসব অবৈধ কাজ করে, তাহলে তাকে আইনের আওতায় আনতে প্রশাসনের কাছে দাবি জানান তিনি।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের বিভাগীয় প্রধান ও হালদা রিভার রিসার্চ ল্যাবরেটরির কো-অর্ডিনেটর অধ্যাপক ড. মনজুরুল কিবরিয়া বলেন, মৎস্য হেরিটেজ হালদা নদীর জীববৈচিত্র্য রক্ষায় স্থানীয় প্রশাসনকে পদক্ষেপ নিতে হবে। অন্যথায় সম্পদে সমৃদ্ধ হালদা হুমকির মুখে পড়বে। নদী থেকে অবৈধভাবে মাটি কাটা বন্ধে ব্যবস্থা নিতে জেলা সমন্বয় সভায় বিষয়টি তুলে ধরবেন তিনি।
ফটিকছড়ি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সাঈদ মোহাম্মদ ইব্রাহীম বলেন, কোনো অবস্থাতেই হালদার পার কাটা কিংবা এ নদী থেকে বালু উত্তোলন করা যাবে না। যারা এ কাজ করবে, তাদের বিরুদ্ধে নদী সংরক্ষণ আইনে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
