উর্বর মাটি ইটভাটায়, চাষাবাদ বন্ধ
ফুলবাড়িয়া উপজেলার পুঠিজানা ইউনিয়নের বৈলাজান এলাকায় কৃষি জমির মাটি কেটে নেওয়া হচ্ছে ইটভাটায় সমকাল
ফুলবাড়িয়া (ময়মনসিংহ) প্রতিনিধি
প্রকাশ: ২১ জানুয়ারি ২০২৬ | ০৮:৩৪
| প্রিন্ট সংস্করণ
ফুলবাড়িয়া উপজেলায় ফসলি জমির মাটি ভেকু দিয়ে কেটে নিয়ে বিক্রি করা হচ্ছে। এতে বিপাকে পড়েছেন আশপাশের জমির মালিকরা। বেপরোয়া মাটি ব্যবসায়ী সিন্ডিকেট ফুলবাড়িয়া উপজেলার ইটভাটাগুলোর চাহিদা মিটিয়ে টাঙ্গাইলের মধুপুর ও ঘাটাইলে সরবরাহ করছে।
ফুলবাড়িয়ার রাঙ্গামাটিয়া ইউনিয়নের বাবুগঞ্জ বাজারে যাওয়ার রাস্তার পাশ দিয়ে উর্বর মাটি কেটে নিয়ে যাওয়ার সময় গত ১৮ জানুয়ারি একটি ট্রাক আটক করেন এলাকাবাসী। সে সময় এক ব্যক্তি দাবি করেন ইউএনওর অনুমতি আছে। তিনি অনুমতিপত্র দেখাতে পারেননি।
বাবুগঞ্জের বাসিন্দা হাসমত আলী বলেন, স্থানীয়রা ট্রাক বোঝাই মাটি আটক করলে ট্রাকে বসে থাকা এক ব্যক্তি বলেন ইউএনওর অনুমতি আছে। এ সময় অনুমতি দেখতে চাইলে দেখাতে পারেননি।
একই রকম চিত্র দেওখোলা, আন্ধারিয়াপাড়া এলাকার।
গভীর রাত থেকে ভোর পর্যন্ত রাস্তা দখল করে ডাম্প ট্রাকে মাটি পরিবহন করা হচ্ছে।
রাঙ্গামাটিয়া ইউনিয়নের আনিস মিয়া অভিযোগ করেন, মাটিখেকোরা স্থানীয় কৃষক আইয়ুব মিয়ার তিন থেকে চার কাঠা জমির মাটি জোর করে কেটে নিয়ে গেছে। এ ছাড়া কুশমাইল ইউনিয়নে, পুটিজানা ইউনিয়নের বৈলাজান, পাটুলী, পানের কন্ট্রোল এলাকায় রাত ২টা থেকে ভোর পর্যন্ত চলে ফসলি জমির মাটি কাটার উৎসব।
শিবগঞ্জ-পাটুলী সড়কের পাশ দিয়ে দিনরাত চলছে কৃষিজমির মাটি কাটার কাজ। শিবগঞ্জ-কেশরগঞ্জ সড়কের পলাশবাড়ি গ্রামের সামনে কাছিম বিলের উর্বর মাটি কেটে নিয়ে ইটভাটায় বিক্রি করা হচ্ছে।
বৈলাজান গ্রামের গোলাম মোস্তফা জানান, রাত ২টার পর ইউনুছ মেম্বারের ভাইদের ফসলি জমির মাটি কেটে শিবগঞ্জ-কেশরগঞ্জ সড়ক দিয়ে ১০ চাকার ২৫ থেকে ৩০টি ট্রাক মাটি ভরাট করে নিয়ে গেছে ঘাটাইলে। ১০ চাকার ট্রাক বোঝাই করে মাটি নেওয়ার সময় এলাকাবাসী এক ট্রাক মাটি আটক করে। সে সময় মাটিখেকো সিন্ডিকেটের এক সদস্য মোবাইল ফোনে কল দিয়ে তাঁকে হুমকি দিয়েছেন। এসব ১০ চাকার ট্রাক ৩০ থেকে ৪০ টন মাটি বোঝাই করে চলাচলে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে গ্রামীণ সড়ক।
বেপরোয়া মাটিখেকো সিন্ডিকেট দমাতে পারছে না স্থানীয় প্রশাসনও। অভিযান চালিয়ে ডাম্প ট্রাকের ব্যাটারি জব্দ, জরিমানা করলেও থামছে না ফসলি জমির মাটি লুট।
সরেজমিন বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, মাটিখেকোদের কবলে পড়ে দুই ফসলি উর্বর জমিগুলো গর্ত ডোবা-নালায় পরিণত হচ্ছে। একটি চক্র জমির মালিকদের প্রলোভন দেখিয়ে টপ সয়েল বা ওপরের অংশ কেটে নিয়ে যাচ্ছে। ফলে চাষাবাদের অনুপযোগী হয়ে পড়ছে এসব জমি।
পরিচয় গোপন রাখার শর্তে বৈলাজান গ্রামের এক কৃষক বলেন, মাটি কাটার শুরুতেই বাধা দেন তারা। কিন্তু বাধা মানেনি। দলবল নিয়ে রাতের আঁধারে ভেকু দিয়ে মাটি কেটে নিচ্ছে। ফসলি জমির সুরক্ষার জন্য জাতীয় জরুরি সেবার ৯৯৯ নম্বরে ফোন দিয়ে প্রশাসনকে বিষয়টি জানালেও কোনো কাজ হয়নি। ফলে মাটি ব্যবসায়ী চক্র ভয়ভীতি দেখাচ্ছে।
পুটিজানা ইউনিয়নের পাটুলী ব্লকের উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা আব্দুল্লাহ আল মামুন জানান, তাঁর ব্লকের একটি বিলে ব্যাপক সরিষা চাষ হতো। মাটিখেকোরা বিলের মাটি কেটে নেওয়া শুরু করায় ভয়ে আর সরিষা চাষ করেননি অনেক কৃষক। চলতি বছর তাঁর ব্লকে সরিষার চাষ গত বছরের চেয়ে অনেক কমে গেছে।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা নূর মোহাম্মদ বলেন, ফসলি জমির মাটি কেটে বিক্রি করায় জমির টপ সয়েল চলে যাচ্ছে। জমিতে চাষাবাদ ছাড়া টপ সয়েল তৈরি হতে অন্তত ১৫ থেকে ২০ বছর সময় লেগে যাবে। এ বিষয়ে সচেতনতা বাড়ানো প্রয়োজন। মাটিখেকোদের দমন না করলে ভবিষ্যতে কৃষিজমি হুমকিতে পড়বে।
ফুলবাড়িয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ আরিফুল ইসলামের ভাষ্য, রাতে অবৈধভাবে মাটি কেটে নেওয়ার সময় অভিযান চালিয়ে মাটি ভর্তি ট্রাক আটক করে বেশ কিছু ব্যাটারি জব্ধ করা হয়েছে। এ ছাড়া পাঁচজনের নামে অভিযোগ করাসহ জরিমানা করা হয়েছে। এখন অনেকটা নিয়ন্ত্রণে এসেছে।
- বিষয় :
- মাটি
