চট্টগ্রামে বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে ১৫১ মামলা
পুলিশের প্রতিবেদনে সাত মামলায় ১০ আসামি নির্দোষ
প্রতীকী ছবি
আহমেদ কুতুব, চট্টগ্রাম
প্রকাশ: ১৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ | ১২:০৪ | আপডেট: ১৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ | ১২:০৫
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সময় শিক্ষার্থী কাউসার মাহমুদ খুনের মামলায় আসামি করা হয় চট্টগ্রামের চন্দনাইশ আসনের নবনির্বাচিত বিএনপির এমপি ব্যবসায়ী জসিম উদ্দিন আহমেদকে। নগরের চান্দগাঁও থানার খুনের মামলায় শেখ হাসিনা, হাছান মাহমুদসহ অন্যদের সঙ্গে আসামির তালিকায় ছিল জসিমের নামও। মামলা দায়েরের পর তদন্ত করে পুলিশ এ ঘটনায় তাঁর কোনো সম্পৃক্ততা পায়নি।
একই মামলার আরও দুই আসামি মাহবুবুল আলম ও সোহেল আক্তারের বিরুদ্ধে খুন সংঘটিত অপরাধে কোনো সম্পৃক্ততা মেলেনি। তাই পুলিশ তিন আসামিকে খুনের মামলার দায় থেকে অব্যাহতি দিতে অন্তর্বর্তী তদন্ত প্রতিবেদন আদালতে দাখিল করে। এ আবেদনটি আদালতে শুনানির জন্য অপেক্ষমাণ।
একইভাবে নগরের কোতোয়ালি থানার বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সময় হাসান ও সাইদুল খুনের মামলার আসামি থেকে সেলিম মিয়া, আহমদ মাহী ও মোহাম্মদ এমরানের কোনো সম্পৃক্ততা পায়নি পুলিশ। তাই তাদের মামলার দায় থেকে অব্যাহতি দিতে আদালতে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করেন তদন্ত কর্মকর্তা।
এভাবে বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে খুন, হত্যাচেষ্টা, মারামারি ঘটনায় দায়ের হওয়া সাতটি মামলা থেকে নির্দোষ ১৭ আসামিকে মুক্তি দিতে আদালতে অন্তর্বর্তী তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করে পুলিশ। মামলার এজাহারে তাদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের কোনো প্রমাণ না পাওয়ায় নিরপরাধ ব্যক্তিদের অব্যাহতি দিতে আবেদন করা হয়। শুনানি শেষে আদালত তিন মামলায় নিরপরাধ সাত আসামির অপরাধে সম্পৃক্ততা না পাওয়ায় অব্যাহতি দিয়েছেন। বাকি তিনটি মামলায় ১০ আসামির অব্যাহতি দেওয়ার আবেদনের ওপর শুনানি অপেক্ষমাণ।
নগরের কোতোয়ালি থানার একটি মামলার তদন্ত কর্মকর্তা মনিরুল করিম বলেন, তিন আসামির বিরুদ্ধে খুনে সম্পৃক্ত থাকার কোনো সাক্ষ্য-প্রমাণ পাইনি। উস্কানি ও অর্থের জোগানদাতা হিসেবেও কোনো দালিলিক কিংবা অদালিলিক প্রমাণও মিলেনি।
সদরঘাট থানার এসআই শাহাদাত হোসেন বলেন, তদন্ত করে এজাহারে আনা অপরাধের সঙ্গে কোনো সংযোগ না পাওয়ায় তিন আসামিকে অব্যাহতি দিতে আদালতে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করেছি। শুনানি শেষে আদালত তাদের বাদ দিয়েছেন। তিনজনের মধ্যে একজন জাফর, তিনি ঢাকার বাসিন্দা। তিনি বিগত কয়েক বছর চট্টগ্রামেও আসেননি।
চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশের উপকমিশনার হাসান ইকবাল চৌধুরী বলেন, থানা থেকে বেশ কয়েকটি অন্তর্বর্তী প্রতিবেদন আদালতে এসেছে। তা আইন অনুযায়ী আদালতে উপস্থাপন করা হচ্ছে।
মানবাধিকার আইনজীবী চৌধুরী আবদুল্লাহ বলেন, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের অনেক মামলায় প্রকৃত আসামিদের সঙ্গে নিরীহ অনেক মানুষকে আসামি করা হয়েছে। মামলা বাণিজ্যের অভিযোগও অসংখ্য। তাই নির্দোষ মানুষদের মামলা থেকে বাদ দিতে সুন্দর উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এমন ব্যক্তিদের আসামি করে হয়রানি করে তাদের মানবাধিকার লঙ্ঘন করা হয়েছে।
২০২৫ সালের ৯ সেপ্টেম্বর ফৌজদারি মামলায় অন্তর্বর্তী তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল-সংক্রান্ত পরিপত্র জারি করে সরকার। পরিপত্রে বলা হয়, ফৌজদারি বিচার ব্যবস্থাকে জনবান্ধব ও হয়রানিমুক্ত করার লক্ষ্যে সম্প্রতি ‘কোড অব ক্রিমিনাল প্রসিডিউর’ সংযোজন করা হয়েছে। এর মাধ্যমে হয়রানিমূলকভাবে কারও নাম কোনো মামলার প্রাথমিক তথ্য বিবরণীতে (এফআইআর) অন্তর্ভুক্ত করা হলে তদন্ত কর্মকর্তা অন্তর্বর্তী তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল এবং প্রতিবেদন বিবেচনায় নিয়ে আদালত অভিযুক্তকে অব্যাহতি প্রদানের বিধান করা হয়েছে।
২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানে হতাহতের ঘটনায় চট্টগ্রামে ১৫১টি মামলা দায়ের হয়েছে। দেড় বছরে আসামি গ্রেপ্তার হয়েছে মাত্র ২৫ শতাংশ। পুলিশ জানায়, বেশির ভাগ মামলায় ঢালাওভাবে আসামি করা হয়েছে। কিছু মামলায় এজাহার ত্রুটিপূর্ণ। আবার অনেক মামলায় কিছু আসামিকে বাদ দিতে হলফনামা দিয়েছেন মামলার বাদী। এর বাইরে কয়েকটি ঘটনায় ময়নাতদন্ত না হওয়া ও প্রতিবেদন দেরিতে আসার কারণে তদন্ত ধীরগতিতে এগোচ্ছে। তবে প্রকৃত অপরাধী যাতে পার না পায়, সেই লক্ষ্যে সাক্ষ্য-প্রমাণ সংগ্রহ করা হচ্ছে।
চট্টগ্রামের ১৫১টি মামলার মধ্যে ৬৯টি হয়েছে নগর ও জেলার ৯টি থানায়। বাকিগুলো আদালতে দায়ের হওয়া নালিশি মামলা (সিআর)। থানায় হওয়া ৬৯টি মামলার মধ্যে ১৫টিই হত্যা মামলা। এসব মামলায় নাম উল্লেখ থাকা আসামির সংখ্যা ১৩ হাজার ৪৫০ জন। অজ্ঞাতপরিচয় আসামির সংখ্যা অন্তত ৩০ হাজার। আসামিদের মধ্যে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীকে আসামি করার পাশাপাশি রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত নন এমন ব্যক্তি, ব্যবসায়ী, সাংবাদিক ও বিভিন্ন পেশার মানুষের নাম রয়েছে।
- বিষয় :
- বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন
