তিন দশক ধরে অবহেলিত তিন শুল্ক স্টেশন, হয়নি উন্নয়ন
সীমান্তের ওপারের জিরো পয়েন্ট থেকে এভাবেই মেঠোপথে নামছে ১২ থেকে ১৫ টন কয়লা বোঝাই ট্রাক। ডিপো পর্যন্ত আসার সড়কের বেহাল দশা।
সুনামগঞ্জ প্রতিনিধি
প্রকাশ: ২১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ | ০৮:৪২ | আপডেট: ২১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ | ১৩:৫৩
| প্রিন্ট সংস্করণ
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর পুনরায় চালু হয়েছে দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের বৃহৎ শুল্কবন্দর হিসেবে পরিচিত সুনামগঞ্জের তাহিরপুর উপজেলার বড়ছড়া, চারাগাঁও ও বাগলী এলাকায় অবস্থিত স্টেশন তিনটি। নির্বাচন উপলক্ষে টানা তিন দিন কার্যক্রম বন্ধ থাকার পর বর্তমানে প্রতিদিনই এসব শুল্কবন্দর দিয়ে ভারত থেকে আমদানীকৃত কয়লা ও চুনাপাথর প্রবেশ করছে বাংলাদেশে। তবে সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে যে গতি এবং প্রযুক্তির বলে কাজ চলার কথা, তা হচ্ছে না।
জানা গেছে, দীর্ঘদিনের অবকাঠামোগত সংকট ও বেহাল সড়কব্যবস্থার কারণে বন্দরগুলোর সর্বোচ্চ সুবিধাপ্রাপ্তি নিশ্চিত হচ্ছে না। এ নিয়ে ক্ষোভ ও উদ্বেগ জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ী ও শ্রমিকরা। তারা এ ব্যাপারে নতুন সরকারের কাছে দ্রুত কার্যকর উদ্যোগ নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।
১৯৯৩ সালে বিএনপি সরকারের আমলেই তাহিরপুর সীমান্তবর্তী বড়ছড়া, চারাগাঁও ও বাগলী শুল্ক স্টেশনের কার্যক্রম শুরু হয়। এরপর থেকে এলসি’র মাধ্যমে ভারত থেকে কয়লা ও চুনাপাথর আমদানি হয়ে আসছে এসব স্টেশন দিয়ে। এই তিনটি শুল্ক স্টেশন দিয়ে প্রতিবছর প্রায় ২০০ কোটি টাকা রাজস্ব আদায় হয়, যা জাতীয় অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে।
তবে এই ধারাবাহিকতা বিভিন্ন প্রতিবন্ধকতায় ব্যাহত হয়েছে। ২০১৪ সালে ভারতের মেঘালয়ে পরিবেশগত ক্ষতির অভিযোগে দায়ের হওয়া একটি মামলার পরিপ্রেক্ষিতে কয়লা রপ্তানির ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি হয়। এ কারণে কয়েক মাস আমদানি কার্যক্রম বন্ধ থাকে। পরে নিষেধাজ্ঞা শিথিল হলেও আমদানি আগের মতো নিয়মিত হয়নি। এছাড়া ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের পর দেশের সামগ্রিক পরিস্থিতির প্রভাব পড়ে সীমান্ত বাণিজ্যেও। কয়েক মাস আমদানি বন্ধ থাকায় শ্রমিক, পরিবহন ও সংশ্লিষ্ট পর্যায়ের কর্মী এবং ব্যবসায়ীরা মহাসংকটে পড়েন। স্থানীয় অর্থনীতি স্থবির হয়ে পড়ে এবং অনেক শ্রমিক জীবিকার সন্ধানে অন্যত্র চলে যেতে বাধ্য হন।
সম্প্রতি এই বন্দর পথে আমদানি কার্যক্রম স্বাভাবিক হতে শুরু করলেও অবকাঠামোগত সমস্যাগুলো রয়ে গেছে আগের মতোই। সরেজমিন গিয়ে দেখা যায়, শুল্ক স্টেশন এলাকায় এখনও পাকা সড়ক নির্মাণ হয়নি; যা পণ্য পরিবহনে সবচেয়ে জরুরি। সীমান্ত থেকে স্টেশন পর্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সড়কগুলো কাঁচা ও ঝুঁকিপূর্ণ। বর্ষা মৌসুমে এসব সড়কে কাদা জমে পণ্য পরিবহন ব্যাহত হয়।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, তিন দশক ধরে বিপুল রাজস্ব আদায় হলেও শুল্ক স্টেশনগুলোর উন্নয়নে উল্লেখযোগ্য কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। অবহেলার মুখে সেগুলো পুরাতনে ভরা। তারা অবকাঠামো উন্নয়ন, সড়ক সংস্কার, আধুনিক ওজন মাপার যন্ত্র স্থাপন এবং শ্রমিকদের প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন।
বন্দর এলাকার শ্রমিক মো. দেলোয়ার হোসেন বলেন, একটি গাড়ির মাল খালাস করলে ৩০০ টাকা দেওয়া হয়। এতে সময় লাগে এক থেকে দেড় ঘণ্টা। মজুরি বাড়ানো প্রয়োজন। সমিতির দায়িত্বে নতুন ব্যবসায়ীরা আসছেন। তারা এই বিষয়টি বিবেচনায় নেবেন বলে আশা করেন তিনি।
কয়লা-চুনাপাথর আনলোড শ্রমিক সরদার মো. গোলাম মোস্তফা বলেন, নতুন সরকারের কাছে আমাদের চাওয়া, সবসময় যেন এই ব্যবসা চালু থাকে। হাজারো শ্রমিক এই শুল্ক স্টেশনের ওপর নির্ভরশীল। কয়লা আমদানিকারক জলিল এন্টারপ্রাইজের প্রোপ্রাইটর মো. রহমত উল্লাহ বলেন, বিগত সময়ে প্রায়ই আমদানি বন্ধ ছিল। এতে লোকসান হয়েছে। হাজার হাজার শ্রমিক বেকার হয়ে গেছেন। এটি বন্ধ থাকলে পুরো এলাকা অচল হয়ে পড়ে। এই সরকারের কাছে প্রত্যাশা আর যেন আমদানি বন্ধ না থাকে।
মেসার্স হিমেল ট্রেডার্সের প্রোপ্রাইটর মো. আব্দুর রকিব বলেন, বড়ছড়া শুল্ক স্টেশন থেকে আমাদের কয়লা ডিপো পর্যন্ত সড়কের অবস্থা খুব খারাপ। কোটি টাকা রাজস্ব দিলেও এই সড়কের উন্নয়ন হয়নি। এতে ধীরগতিতে কয়লা পরিবহন করতে হয়।
বাগলী শুল্ক স্টেশনের কাস্টম সুপার আনোয়ার পারভেজ বলেন, আধুনিক ওজন মাপার যন্ত্র স্থাপনের জন্য ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষে জানানো হয়েছে।
তাহিরপুর কয়লা আমদানিকারক সমিতির সভাপতি খসরুল আলম বললেন, ১৯৯৩ সালে চালু হওয়া তাহিরপুর সীমান্তের শুল্ক স্টেশনগুলোতে অবকাঠামোগত কোনো উন্নয়ন হয়নি। সীমান্তের ওপার থেকে জিরো পয়েন্ট হয়ে কয়লা ডিপোতে ১২ টনের ট্রাক আসে। এক একটি শুল্কস্টেশনে তিন-চার ডিপো আছে। তাতে ট্রাক পৌঁছানোর কোনো পাকা সড়ক নেই। এছাড়া পাটলাই নদীর নাব্য ফিরিয়ে না আনলে ওই বন্দরগুলোতে অচলাবস্থা তৈরি হবে।
- বিষয় :
- স্টেশন
- শুল্ক
- আমদানি-রপ্তানি বন্ধ
