ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

নরসিংদীতে ধর্ষণ-হত্যা

সালিশে এলাকা ছাড়ার রায় দেন বিএনপি নেতা

মূল অভিযুক্তসহ গ্রেপ্তার ৭

সালিশে এলাকা ছাড়ার রায় দেন বিএনপি নেতা
×

 নরসিংদী প্রতিনিধি

প্রকাশ: ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ | ০৮:৫৮ | আপডেট: ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ | ০৯:৪৮

| প্রিন্ট সংস্করণ

ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছিল ১০ ফেব্রুয়ারি রাতে। ২৪ ঘণ্টা পর ১১ ফেব্রুয়ারি রাতে মাধবদীর হোসেন বাজারে বসে সালিশ। সেখানে কিশোরীটির বিরুদ্ধে মিথ্যা অপবাদ দিয়ে তাকে এলাকা ছাড়ার আদেশ দেন মাতবর। এলাকা ছাড়ার সময় পথে বাবার কাছ থেকে মেয়েটিকে ছিনিয়ে নিয়ে পরে হত্যা করা হয়। 

সালিশ পরিচালনা করেছিলেন আহমদ আলী দেওয়ান। তিনি নরসিংদী সদর উপজেলার মহিষাশুড়া ইউনিয়ন বিএনপির সহসভাপতি এবং ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) সাবেক সদস্য। এ ঘটনায় পুলিশ তাঁকে গ্রেপ্তার করেছে। ভুক্তভোগীর পরিবার ও স্থানীয় কয়েকজনের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য পাওয়া গেছে।

ঘটনার পর আহমদ আলী দেওয়ানকে ইউনিয়ন বিএনপির সহসভাপতির পদ থেকে বহিষ্কার করেছে সদর উপজেলা বিএনপি। গতকাল রাত ১০টার দিকে সদর উপজেলা বিএনপির সভাপতি আবু সালেহ চৌধুরী ও সাধারণ সম্পাদক মো. ইকবাল হোসেনের সই করা দলীয় চিঠিতে এ তথ্য জানানো হয়।

গত বৃহস্পতিবার সকালে মাধবদী থানার কোতালিরচর দড়িকান্দির সরিষাক্ষেত থেকে গলায় ওড়না পেঁচানো অবস্থায় আমেনা আক্তারের (১৫) লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। সে বরিশালের মেহেন্দীগঞ্জ থানার লস্করপুর গ্রামের হাবিব মিয়ার মেয়ে। তার এক ভাই রয়েছে। হাবিব মিয়ার সঙ্গে তার মায়ের বনিবনা না হওয়ায় প্রায় ১০ বছর আগে বিচ্ছেদ হয়েছে। তখন থেকে মা ফাহিমা বেগম দুই সন্তান নিয়ে মাধবদীতে এসে টেক্সটাইল মিলে কাজ করেন। 

গতকাল রাতে অভিযান চালিয়ে মূল অভিযুক্ত নুর মোহাম্মদ নুরাকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। নরসিংদীর পুলিশ সুপার মো. আব্দুল্লাহ আল ফারুক বলেন, এ মামলার প্রধান আসামি নুর মোহাম্মদ নুরাকে গাজীপুরের মাওনা থেকে এবং আরেক আসামি হজরত আলীকে ময়মনসিংহের গৌরীপুর থেকে গতকাল রাত ৯টায় গ্রেপ্তার করা হয়েছে। 

এ নিয়ে ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনায় সাতজনকে গ্রেপ্তার করা হলো। অন্যরা হলেন– সাবেক ইউপি সদস্য আহমদ আলী দেওয়ান, তাঁর ছেলে মো. ইমরান দেওয়ান, নুরার চাচাতো ভাই মোহাম্মদ আইয়ুব, এবাদুল্লাহ ও হোসেন বাজার এলাকার গাফফার। তাদের মধ্যে এবাদুল্লাহ স্থানীয় জামায়াতের কর্মী বলে স্থানীয় বাসিন্দারা জানিয়েছেন।

নিহত আমেনার মা ফাহিমা বেগম অভিযোগ করেন, নুরা গত ১০ ফেব্রুয়ারি ফুসলিয়ে আমেনাকে চৈতী টেক্সটাইল মিলের পেছনে নিয়ে যায়। সেখানে আগে থেকে ওত পেতে থাকা একই এলাকার শাহাবুদ্দিনের ছেলে এবাদুল্লাহ, হান্নান মুন্সীর ছেলে হজরত আলী এবং তাদের বন্ধু গাফফার মেয়েকে ধর্ষণ করে। বিষয়টি কাউকে না জানানোর জন্য হুমকি দেয়। কিন্তু ঘটনা জানাজানি হয়। তখন ইউপি সদস্য আহমদ আলী দেওয়ান, তাঁর ছেলে মো. ইমরান দেওয়ান, স্থানীয় ইসহাক, আবু তাহের ও মো. আইয়ুব ঘটনাটি পুলিশকে না জানানোর জন্য বলেন। তারা বিচার করে দেবেন বলে আশ্বাস দেন।
ফাহিমা বেগম বলেন, ‘আহমদ আলী সালিশ বসিয়ে ধর্ষণের বিচার না করে মেয়ের নামে মিথ্যা অপবাদ দেন। পরিবারকে এলাকা ছেড়ে চলে যেতে নির্দেশ দেন। এ সময় তাদের কাছ থেকে ১০-১২ দিন সময় চেয়ে নিই। ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে এলাকা ছেড়ে চলে যাব বলে জানিয়ে দিই।’

ফাহিমা বেগম জানান, ২৫ ফেব্রুয়ারি রাত সাড়ে ৯টার দিকে মেয়েকে নিয়ে সৎবাবা তাদের পরিচিত ব্যক্তির বাড়িতে যাচ্ছিলেন। পথে মাধবদী থানার কড়ইতলার তিন রাস্তার মোড়ে পৌঁছলে নুরা ও তার চার সহযোগী পথরোধ করে মেয়েকে ছিনিয়ে নিয়ে যায়। পরে অনেক খোঁজাখুঁজি করে তাকে আর পাওয়া যায়নি। পরদিন সকালে মাধবদী থানার মহিষাশুড়া ইউনিয়নের দড়িকান্দিতে সরিষা ক্ষেতে  লাশ পড়ে থাকতে দেখে এলাকাবাসী। লাশের গলায় ওড়না পেঁচানো ছিল। ঠোঁট, মুখ রক্তাক্ত ছিল। শরীরের বিভিন্ন স্থানে জখমের চিহ্ন ছিল।

স্থানীয় সোহাগ টেক্সটাইলের মালিক নাসির উদ্দিন বলেন, ‘বিগত কয়েক বছর ধরে সাবেক ইউপি সদস্য আহমদ আলী বিচার-সালিশ করছেন।’
কিশোরীটি যে বাড়িতে ভাড়া থাকত, সেই বাড়িওয়ালা মতিউর রহমান গতকাল শুক্রবার সমকালকে বলেন, ‘চার মাস আগে মেয়েটির পরিবার আমার বাসা ভাড়া নেয়। মেয়েটিকে তুলে নিয়ে ধর্ষণের ঘটনা জানাজানি হওয়ার পর তাদের বাসা ছেড়ে দিতে বলি। তারা আমার কাছ থেকে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত সময় নেয়।’

গতকাল সকালে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব, নরসিংদী জেলা বিএনপির সভাপতি ও নরসিংদী-১ (সদর) আসনের সংসদ সদস্য খায়রুল কবীর খোকন। তিনি বলেন, ‘যে ঘটনা ঘটেছে, তা অত্যন্ত নিন্দনীয়। অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হওয়া উচিত, যাতে এ ধরনের ঘটনা সমাজে আর না ঘটে।’ তিনি আরও বলেন, ‘অভিযুক্তদের পক্ষে যেন কেউ সহানুভূতি না দেখায়।’

ডিআইজির ব্রিফিং
পুলিশের ঢাকা রেঞ্জের উপমহাপরিদর্শক (ডিআইজি) রেজাউল করিম মল্লিক গতকাল সকালে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন। পরে তিনি সাংবাদিকদের জানান, এ ঘটনায় ৯ জনের নাম উল্লেখ করে নিহতের মা ফাহিমা বেগম মাধবদী থানায় মামলা করেছেন। বিভিন্ন জায়গায় অভিযান চলছে। জড়িত একজনও ছাড় পাবে না।

নুরার পরিচয়
নরসিংদী সদর উপজেলার মাধবদী থানার কোতালিরচর মাদুরবাড়ির শাহজাহানের ছেলে নুর মোহাম্মদ নুরা (২৮)। পেশায় রিকশাচালক। এলাকায় বখাটে ও মাদকসেবী হিসেবে পরিচিত। এলাকায় ইয়াবা নুরা নামে সে পরিচিত। স্থানীয় বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে কর্মরত নারী শ্রমিকদের উত্ত্যক্ত করার অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। 

কোথায় দাফন তা অনিশ্চিত
নিহত কিশোরী আমেনার লাশের ময়নাতদন্ত নরসিংদী সদর হাসপাতাল মর্গে সম্পন্ন হয়েছে। নরসিংদী সদর হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তা (আরএমও) ডা. ফরিদা গুলশানারা কবির এর নেতৃত্ব দেন। চার সদস্যের মেডিকেল বোর্ডের অন্য সদস্যরা হলেন– গাইনি কনসালট্যান্ট ডা. মাহমুদা বেগম, ডেন্টিস্ট ডা. রোকেয়া বেগম ও চিকিৎসা কর্মকর্তা ডা. খাইরুল ইসলাম।
গতকাল বিকেলে নিহতের মা ফাহিমা বেগম বলেন, ‘আমরা থানায় আছি। কোথায় মেয়ের লাশ দাফন করব, তা এখনও নিশ্চিত করে বলতে পারছি না।’

বিভিন্ন স্থানে বিক্ষোভ
নরসিংদীতে ধর্ষণ ও হত্যার প্রতিবাদে বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ করেছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু)। গতকাল দুপুরে বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় জামে মসজিদ প্রাঙ্গণ থেকে মিছিলটি শুরু হয়ে ভিসি চত্বর ঘুরে রাজু ভাস্কর্যে গিয়ে শেষ হয়। 

রাজু ভাস্কর্যে সংক্ষিপ্ত সমাবেশে ডাকসুর ভিপি সাদিক কায়েম বলেন, নির্বাচিত সরকার শপথ নেওয়ার প্রায় দুই সপ্তাহ পেরিয়ে গেলেও নাগরিকদের জীবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারেনি।
এ ঘটনায় বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ করেছেন ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। গতকাল দুপুরে বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মসজিদের সামনে থেকে বিক্ষোভ মিছিল বের করা হয়। পরে প্রধান ফটকের সামনে সংক্ষিপ্ত সমাবেশ করেন তারা। শাখা ছাত্রশিবির, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন ও ইসলামী ছাত্র আন্দোলনের নেতাকর্মীসহ বিভিন্ন বিভাগের শিক্ষার্থীরা বিক্ষোভে অংশ নেন।

(প্রতিবেদনে তথ্য দিয়ে সহায়তা করেছেন বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিবেদক, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় ও কালীগঞ্জ প্রতিনিধি)

 

আরও পড়ুন

×