ঘোড়ার মেলায় পঙ্খিরাজ ও বাহাদুরের দাপট
জয়পুরহাটের আক্কেলপুরে গোপীনাথপুরের দোলযাত্রার ঘোড়ার মেলা সমকাল
আক্কেলপুর (জয়পুরহাট) সংবাদদাতা
প্রকাশ: ০৫ মার্চ ২০২৬ | ০৮:১০
| প্রিন্ট সংস্করণ
মাঠজুড়ে টগবগিয়ে ছুটছে ঘোড়া। ধুলো উড়িয়ে সওয়ারিরা দেখাচ্ছেন ক্ষিপ্রগতি আর বুদ্ধিমত্তার কেরামতি। চারদিকে হাজারো মানুষের ভিড় আর মাঝেমধ্যেই শোনা যাচ্ছে ঘোড়ার ডাক। জয়পুরহাটের আক্কেলপুর উপজেলার গোপীনাথপুরে দোলপূর্ণিমা উপলক্ষে এভাবেই জমে উঠেছে শতাব্দীপ্রাচীন ঐতিহ্যবাহী ঘোড়ার মেলা। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা বাহারি নামের ও জাতের ঘোড়াই এখন এই মেলার প্রধান আকর্ষণ।
গোপীনাথপুরের এই মেলা শুধু একটি হাট নয়, বরং এটি উত্তরাঞ্চলের গ্রামীণ অর্থনীতি ও সংস্কৃতির এক অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
মেলা প্রাঙ্গণে পা রাখলেই কানে আসবে পঙ্খিরাজ, বাহাদুর, বিজলি, কিরণমালা, বাংলার রানী কিংবা ভারতীয় তাজী–এমন সব গালভরা নাম। ক্রেতাদের নজর কাড়তে ঘোড়াগুলোকে সাজানো হয়েছে বাহারি সাজে। দুলকী চাল আর বুদ্ধিমত্তায় যারা সেরা, তাদের ঘিরেই চলছে মূল দরদাম। এবারের মেলায় সবচেয়ে বেশি কৌতূহল দেখা গেছে ভারতীয় ‘তাজী’ জাতের ঘোড়া নিয়ে। পছন্দ হলে ঘোড়াটি দৌড়ে পরখ করে নেওয়া হচ্ছে পাশের খোলা মাঠে। ঘোড়াগুলোর দাম মানভেদে ৮০ হাজার থেকে ৩ লাখ টাকা পর্যন্ত হাঁকা হচ্ছে।
কথিত আছে, প্রায় ৫১৯ বছর আগে নবাব আলাউদ্দিন হোসেন শাহ এই এলাকায় ভ্রমণকালে এক সাধকের আতিথিয়েতায় মুগ্ধ হয়ে গোপীনাথপুর ও গোপালপুর মৌজার সম্পত্তি দেবোত্তর হিসেবে দান করেছিলেন। সেই থেকে দোলযাত্রা উপলক্ষে শুরু হওয়া এই মেলা আজও টিকে আছে স্বমহিমায়। স্বাধীনতার আগে এই মেলায় নেপাল, ভুটান ও মধ্যপ্রাচ্য থেকেও উন্নত জাতের ঘোড়া আসত। বর্তমানে এটি দেশের অন্যতম বৃহৎ ঘোড়া কেনাবেচার হাট।
মাসব্যাপী মেলায় প্রথম ১০ দিন চলে পশুর হাট। শুধু ঘোড়া নয়, গরু, মহিষ ও ভেড়াও বিক্রি হচ্ছে। কেনাকাটার পাশাপাশি বিনোদনের জন্য রয়েছে কাঠের ও প্লাস্টিকের আসবাব, ঘর সাজানোর সামগ্রী এবং মিষ্টান্নর দোকান। ২ থেকে ৪ কেজি ওজনের মাছ আকৃতির মিষ্টি এই মেলার পুরোনো ঐতিহ্য। তবে রমজান মাস চলায় এবার সার্কাস বা যাত্রাপালার অনুমতি দেওয়া হয়নি।
ময়মনসিংহ, জামালপুর, টাঙ্গাইল, রাজশাহী, দিনাজপুরসহ দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে ব্যবসায়ীরা এসেছেন তাদের ঘোড়া নিয়ে। চাঁপাইনবাবগঞ্জ থেকে আসা বিক্রেতা খাইরুল ইসলাম জানান, তিনি ১৮টি ঘোড়া নিয়ে এসেছেন এবং লাভও ভালো হচ্ছে। টাঙ্গাইলের আরিফুল ইসলাম ১৩টি ঘোড়া নিয়ে এসেছেন, মেলায় খরিদ্দার বেশি হওয়ায় তিনি বেশ খুশি। পাবনার রিপন হোসেন ৩০ বছর ধরে এই মেলায় আসেন; এবারও তার তিনটি ঘোড়া ভালো দামে বিক্রি হয়েছে।
মেলা কমিটির সভাপতি ও ইউপি চেয়ারম্যান হাবিবুর রহমান জানান, উত্তরবঙ্গের মধ্যে এটিই সবচেয়ে বড় গ্রামীণ মেলা। আক্কেলপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শাহীন রেজা জানান, নিরাপত্তার জন্য মেলায় সাদা পোশাকে এবং পোশাকধারী বিপুল সংখ্যক পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ফারজানা জান্নাত বলেন, ‘গোপীনাথপুরের মেলা একটি প্রাচীন ঐতিহ্য। রমজানের পবিত্রতা রক্ষা ও আইনশৃঙ্খলার বিষয়ে কঠোর নজরদারি রাখা হচ্ছে।’
- বিষয় :
- ঘোড়া
