ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

রংপুর

‘মহাজনের ঘরোত যেই দাম কয়, লস হইলেও বেচা নাগে’

রংপুরে ধান বিক্রির জায়গা নেই

‘মহাজনের ঘরোত যেই দাম কয়, লস হইলেও বেচা নাগে’
×

সড়কে অস্থায়ী আড়ত বসিয়ে ধান কেনেন মহাজন। তারাগঞ্জের শ্যামগঞ্জ সমকাল

 স্বপন চৌধুরী, রংপুর

প্রকাশ: ০৫ মার্চ ২০২৬ | ০৮:১৭

| প্রিন্ট সংস্করণ

সংসারের খরচ মেটাতে ঘরে রাখা ধান বিক্রি করা দরকার রংপুরের তারাগঞ্জ উপজেলার আলমপুর গ্রামের বাদশা মিয়ার। তাই হাটের দিন গত মঙ্গলবার দুপুরে ভ্যানে ১০ মণ ধান তুলে বাড়ি থেকে বের হন। হাটে পৌঁছানোর দুই কিলোমিটার আগে মহাজনের অস্থায়ী আড়তে বিক্রি করতে বাধ্য হন তিনি।

এক হাজার টাকা মণ দরে স্বর্ণা জাতের ধান বিক্রি করে বাদশা বলেন, ‘হামার একটেও ভালো নাই বাহে। হাজারো কষ্টে ধারদেনা করি ধান আবাদ করি। কিন্তুক হাটোত এ্যালা সেই ধান বেচপার (বিক্রি করার) জাগা নাই। মহাজনের ঘরোত আনলে যেই দাম কয়, লস হইলেও তাতে বেচা নাগে।’

রংপুরের হাটগুলোতে আগের মতো ধান বিক্রির জায়গা নেই। এ কারণে দাম যাচাই করা সম্ভব হচ্ছে না। এর ফলে প্রতিনিয়ত বাধ্য হয়ে মহাজনের কাছে ধান বিক্রি করে ঠকছেন বাদশার মতো কৃষকরা। তারা মহাজন সিন্ডিকেটের কাছে জিম্মি হয়ে পড়েছেন।
ধান-চাল উৎপাদনে অন্যতম উদ্বৃত্ত এলাকা রংপুর। এই অঞ্চলে উৎপাদিত খাদ্যশস্য অন্য অঞ্চলেও সরবরাহ করা হয়। অথচ রংপুরের হাটবাজারগুলোতে সব ধরনের পণ্য কেনাবেচা হলেও ধান বেচার জায়গা নেই। সিন্ডিকেটের মাধ্যমে হাটে ধান কেনাবেচা বন্ধ করে মহাজনরা হাটকেন্দ্রিক নিজস্ব আড়ত গড়ে তুলেছেন।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, সিটি করপোরেশন এলাকায় ২৩টিসহ রংপুর জেলায় হাট রয়েছে মোট ২১৫টি। এসব হাটে সপ্তাহে দুই দিন পণ্য বেচাকেনা হয়। হাটগুলোতে অন্যান্য পণ্যের পাশাপাশি ধান কেনাবেচার জন্য নির্ধারিত জায়গা ছিল, যার নাম ‘ধানহাটি’। কৃষকরা এখানে ধান নিয়ে আসতেন। বিভিন্ন এলাকা থেকে ক্রেতারাও ধান কিনতে ভিড় করতেন। ধানের গুণগত মান দেখে ক্রেতারা একেকজন একেক রকম দাম করতেন। স্থানীয় কৃষকরা বাজার যাচাই করে ভালো দামে তাদের ধান বিক্রি করতে পারতেন। বর্তমানে হাটবাজারগুলোতে ধান কেনাবেচার জায়গা চিরচেনা ‘ধানহাটি’ আর নেই। ফলে সিন্ডিকেটের থাবায় প্রতি মৌসুমে লোকসান গুনছেন কৃষক।

স্থানীয়রা জানান, রংপুর নগরীর বৃহৎ হাট বুড়িরহাটে ধান কেনাবেচার নির্ধারিত স্থান ছিল। পাঁচ বছর আগে যা বিলুপ্ত হয়েছে। প্রথমে ক্রেতা সংকট দেখা দেয়। পরে কৃষকরাও হাটে ধান আনার আগ্রহ হারিয়ে ফেলেন। বর্তমানে মহাজনরা দাম ঠিক করে কৃষকের বাড়ি থেকে ধান কেনেন। আবার কখনও কৃষকরা মহাজনের গুদামে ধান দিয়ে টাকা নিয়ে যান। 
গত মঙ্গলবার তারাগঞ্জের শ্যামগঞ্জ এলাকায় সড়কের ধারে ধান কিনছিলেন নূর আমিন। তিনি জানান, কৃষকদের এখন আর হাটে যেতে হয় না। ন্যায্য দাম দিয়েই তাদের কাছ থেকে ধান কেনা হয়। 
শনিবার ও বুধবার বসে গঙ্গাচড়া হাট। বুধবার হাটে গিয়ে ধানহাটির কোনো অস্তিত্ব মেলেনি। হাট ইজারাদার মোতাহার হোসেন লেবু জানান, হাটে এখন আর ধান ওঠে না। হাটের চারদিকে গড়ে ওঠা মহাজনের গুদাম থেকে ধান কেনাবেচা হয়। 

মহাজন মতিয়ার রহমান বলেন, কৃষকরা এখন হাটে আর ধান নিয়ে আসেন না। সে কারণে গুদামে বসেই ধান কেনা হয়। তবে বাজার হিসেবে কৃষকদের ধানের দাম দেওয়া হচ্ছে দাবি করে তিনি জানান, বর্তমানে প্রতি মণ ধান এক হাজার ৫০ থেকে এক হাজার ১০০ টাকায় কেনা হচ্ছে।
মহাজনের গুদামে ধান বিক্রি করতে আসা গঙ্গাচড়ার নবনী দাস গ্রামের আলী হোসেন ও ভূটকা গ্রামের জয়নাল আবেদীন বলেন, আমন মৌসুমের শুরুতে মহাজনরা প্রতি মণ ধানের দাম দিয়েছেন ৮০০ থেকে ৯০০ টাকা। বর্তমানে তাদের আড়তে কৃষকদের সেই ধানের দাম দেওয়া হচ্ছে এক হাজার থেকে এক হাজার ৫০ টাকা। অথচ সরকারিভাবে এবার ৩৪ টাকা কেজি দরে প্রতি মণ ধানের দাম ধরা হয়েছে এক হাজার ৩৬০ টাকা। 

কৃষি বিভাগ সূত্র জানায়, রংপুর কৃষি অঞ্চলের পাঁচ জেলা রংপুর, কুড়িগ্রাম, লালমনিরহাট, নিলফামারী ও গাইবান্ধায় গত বছর ছয় লাখ ২১ হাজার ৫০৫ হেক্টর জমিতে আমন ধানের চাষ হয়েছে। উৎপাদন হয়েছে ২০ লাখের বেশি টন চাল। 
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর রংপুরের উপপরিচালক সিরাজুল ইসলাম জানান, ধান কাটার পরই ঋণ পরিশোধ করার জন্য কম দামে বিক্রি করতে বাধ্য হন প্রান্তিক ও ক্ষুদ্র কৃষকরা। এ সুযোগটা নেন ব্যবসায়ীরা। ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা না গেলে ধান চাষে আগ্রহ হারিয়ে ফেলবেন কৃষক।

আরও পড়ুন

×