ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

জঙ্গল সলিমপুরে যৌথ বাহিনীর সাঁড়াশি অভিযান

জঙ্গল সলিমপুরে যৌথ বাহিনীর সাঁড়াশি অভিযান
×

সীতাকুণ্ড (চট্টগ্রাম) প্রতিনিধি

প্রকাশ: ০৯ মার্চ ২০২৬ | ১৪:৩৫ | আপডেট: ০৯ মার্চ ২০২৬ | ১৪:৫০

ইয়াছিন ও রোকন বাহিনীরসহ একাধিক বাহিনীর অন্ধকার জগত নামে পরিচিত চট্টগ্রামের জঙ্গলসলিমপুর পাহাড়ি এলাকা। আগের সরকারগুলোতে একাধিক বাহিনী থাকলেও আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর প্রায় তিন হাজারের অধিক পাহাড়ি বসতি এলাকা এই দুই বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে। এই দুই বাহিনীর বিরোধে একের পর এক পড়ছে লাশ।

জঙ্গল সলিমপুরে সন্ত্রাসী দমন ও অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারের লক্ষ্যে চট্টগ্রামে ভোর থেকে সাঁড়াশি অভিযান শুরু করেছে যৌথবাহিনী। সোমবার ভোর পাঁচটা থেকে জেলার বিভিন্ন এলাকায় ভাগ হয়ে অভিযান চালাচ্ছেন পুলিশ, র‌্যাব, সেনাবাহিনীসহ অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা।

আইনশৃংখলা বাহিনীর সদস্যরা জানান, সীতাকুণ্ড উপজেলার জঙ্গল সলিমপুর এলাকায় পুরো জেলা থেকে আসা প্রায় দুই হাজার আইনশৃঙ্খলা সদস্য রয়েছেন এই অভিযানে।

পাহাড়ি ও দুর্গম এই এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে সন্ত্রাসীদের অবস্থান, অস্ত্র মজুত ও অপরাধীদের আত্মগোপনের অভিযোগ রয়েছে। সাম্প্রতিক কয়েকটি ঘটনার পর গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে পরিকল্পিতভাবে এই অভিযান শুরু করা হয়।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সূত্রগুলো জানায়, অভিযান পরিচালনার জন্য সদস্যদের কয়েকটি দলে ভাগ করা হয়েছে। একটি দল পাহাড়ের নিচের বসতিগুলোতে তল্লাশি চালাচ্ছে, আরেকটি দল পাহাড়ি পথ ধরে উপরের দিকে অগ্রসর হয়েছে। অপরাধীদের সম্ভাব্য পালানোর পথগুলোতে আগেই চেকপোস্ট বসানো হয়েছে, যাতে কেউ অভিযান শুরুর খবর পেয়ে এলাকা ছাড়তে না পারে।

অভিযানে অংশ নেওয়া আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একটি সূত্র জানায়, জঙ্গল সলিমপুরের ভেতরে একাধিক পাহাড়ি ছড়া, ঝোপঝাড় ও পরিত্যক্ত ঘর রয়েছে। এসব স্থানকে অনেক সময় অপরাধীরা আত্মগোপনের জন্য ব্যবহার করে। তাই আইনশৃঙ্খলা সদস্যরা ছোট ছোট দলে ভাগ হয়ে পাহাড়ের বিভিন্ন অংশে তল্লাশি চালাচ্ছেন। কোথাও কোথাও পাহাড়ি পথ এতটাই সরু যে একসঙ্গে কয়েকজনের বেশি চলাচল করা সম্ভব হয় না। এ কারণে ধাপে ধাপে অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে।

এদিকে সোমবার ভোর হওয়ার আগেই সেহেরির পরে পাহাড়ের আশপাশে বিপুল সংখ্যক আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য অবস্থান নিতে দেখা যায়। জলিল সিডিএ রোডের বিপরীত দিক দিয়ে ৩ শতাধিক সদস্য অভিযানে যান। ধীরে ধীরে তারা পাহাড়ের ভেতরের দিকে অগ্রসর হন। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বিভিন্ন এলাকায় তল্লাশি আরও জোরদার করা হয়।

জেলা পুলিশের জনসংযোগ কর্মকর্তা (পিআরও) মো. রাসেল বলেন, ‘সন্ত্রাসী ও অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারে পুরো জেলায় যৌথবাহিনীর অভিযান চলছে। সীতাকুণ্ডের জঙ্গল সলিমপুরেও অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। পরিস্থিতি অনুযায়ী অভিযান অব্যাহত থাকবে।’

ভূপ্রকৃতি জটিল হওয়ায় এখানে অভিযান চালানো সব সময়ই চ্যালেঞ্জের বলে জানিয়েছেন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তারা। পাহাড়ের ভেতরে অসংখ্য সরু পথ, গহীন জঙ্গল সলিমপুরের ঝোপঝাড় ও ছড়িয়ে–ছিটিয়ে থাকা বসতি থাকায় অপরাধীরা সহজেই এক স্থান থেকে অন্য স্থানে সরে যেতে পারে। এ কারণে গোয়েন্দা তথ্য যাচাই করে পরিকল্পিতভাবে অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে।

২০ মাসে ৫ খুন, নজরদারি বাড়ে র‌্যাব কর্মকর্তা হত্যার পর

আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর গত ২০ মাসে এই অপরাধ জগত জঙ্গল সলিমপুরে ৬ জন খুন হয়েছেন। অধিপত্য বিস্তার, ব্যববসা বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণ ও পাহাড়ি খাস জায়গা দখল বেদখ নিয়ে ইয়াছিন ও রোকন বাহিনীর মধ্যে এই সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছিল। একাধিক হত্যা মামলায় আসামিও তারা।

গত ১৯ জানুয়ারি বিকেলে জঙ্গল সলিমপুরে অভিযান চালাতে গেলে র‌্যাব–৭–এর চার সদস্যকে বেধড়ক মারধর করা হয়। এ সময় র‌্যাবের উপসহকারী পরিচালক-ডিএডি (নায়েব সুবেদার) মোতালেব হোসেন ভূঁইয়াকে পিটিয়ে হত্যা করে ইয়াছিন বাহিনী। তবে ইয়াছিন বাহিনীর প্রধান ইয়াছিন ভিডিও বার্তায় সাংবাদিকদের জানান এই হত্যাকাণ্ড রোকন বাহিনী ঘটিয়েছে। এ ঘটনায় ইয়াছিন বাহিনীর প্রধান ইয়াছিনকে আসামি করে সীতাকুণ্ড থানায় মামলা দায়ের করে র‌্যাব। এ ঘটনায় ১৫ জনকে গ্রেপ্তারও করেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।

এই ঘটনার পর আইনশৃঙ্খলা বাহিনী জঙ্গল সলিমপুর এলাকাকে বিশেষ নজরদারিতে রাখে। তদন্ত–সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, ওই মামলার কয়েকজন আসামি পাহাড়ি এলাকায় আত্মগোপন করেছে—এমন তথ্য পাওয়ার পরই সেখানে নজরদারি বাড়ানো হয়।

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, ওই ঘটনার পর সন্ত্রাসী ও অস্ত্র উদ্ধারে একাধিক অভিযানের পরিকল্পনা করা হয়। এর অংশ হিসেবেই সোমবার ভোর থেকে এই সাঁড়াশি অভিযান শুরু হয়েছে।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একটি সূত্র জানায়, অভিযানের সময় পাহাড়ের বিভিন্ন অংশে সন্দেহভাজন কয়েকটি স্থানে তল্লাশি চালানো হচ্ছে। পাশাপাশি আশপাশের বসতিগুলোতেও যাচাই–বাছাই করা হচ্ছে। অভিযান শেষ হওয়ার পর এ বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য জানানো হবে বলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।

যে সকল হত্যাকাণ্ড গত ২০ মাসে

২০২৪ সালে ৪ আক্টোবর জঙ্গল সলিমপুর ও আলীনগর পাহাড়ি এলাকা দখল করতে গিয়ে সংঘর্ষে জড়ায় রোকন বাহিনী। এতে ব্যাপক গুলিবর্ষণ ও সংঘর্ষে রোকন বাহিনী মাঈন উদ্দিন ও ইয়াছিন বাহিনীর খলিলুর রহমান কানু খুন হন।

এছাড়া ছলিমপুর ইউনিয়ন শ্রমিকদলের সভাপতি মীর আরমানকে একই দলের লোকেরা ২০২৫ সালের ২ জানুয়ারি ঘর থেকে মুঠোফোনে ডেকে নিয়ে অস্ত্র ঠেকিয়ে জিম্মি করে ডান পায়ের রগ কাটার পর ছুরিকাঘাত ও কুপিয়ে হত্যা করে। এলাকায় অধিপত্য বিস্তার ও ব্যবসা নিয়ন্ত্রণে তিনি হত্যাকাণ্ডের শিকার বলে পরিবারের দাবি।

অপরদিকে ২০২৫ সালের ৯ ফেব্রুয়ারি সন্ধ্যায় মোহাম্মদ মাসুদ নামে বিএনপির নেতা খুন হন। জঙ্গল ছলিমপুর ৫ নম্বর ছিন্নমূল এলাকায় ইট, বালু, কংক্রিটের ব্যবসা করতেন তিনি।

আরও পড়ুন

×