জামায়াতের ইফতার মঞ্চে ‘মাদক কারবারি’ যুবলীগ নেতা বাবু, সমালোচনা
ছবি: সমকাল
রাজশাহী ব্যুরো
প্রকাশ: ১০ মার্চ ২০২৬ | ২২:৩৩
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তালিকাভুক্ত মাদক কারবারি যুবলীগ নেতা সেতাফুর রহমান বাবুকে এবার দেখা গেল জামায়াতের ইফতার মঞ্চে। সাবেক ইউপি সদস্য বাবু হেরোইনসহ গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে গিয়ে বরখাস্ত হয়েছিলেন। গণঅভ্যুত্থানের পর তার নামে হত্যাসহ একাধিক মামলা হয়েছে। সোমবার হঠাৎ তাকে দেখা যায় বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর ইফতার মঞ্চে।
রাজশাহীর গোদাগাড়ী উপজেলার রেলগেট এলাকার বাসিন্দা সেতাফুর রহমান বাবু। গতকাল সোমবার মাটিকাটা আদর্শ কলেজ মাঠে ইফতার আয়োজন করে ইউনিয়ন জামায়াত। এতে প্রধান অতিথি ছিলেন জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় নায়েবে আমির ও রাজশাহী-১ (তানোর-গোদাগাড়ী) আসনের সংসদ সদস্য অধ্যাপক মুজিবুর রহমান। মঞ্চে তার পেছনের সারিতে বসেছিলেন মাদক কারবারি বাবু।
স্থনীয়রা জানান, বাবু শুরুতে পাওয়ার টিলারের শ্রমিক হিসেবে কাজ করতেন। ওই সময় হেরোইনের কারবার করে বিপুল অর্থবিত্তের মালিক হন। প্রচুর টাকা খরচ করে মাটিকাটা ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) ৮ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য নির্বাচিত হন। তিনি ইউপি সদস্য থাকাবস্থায় ২০১৮ সালে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের রাজনৈতিক অধিশাখা-২ থেকে করা মাদক কারবারিদের এক তালিকায় ৯ নম্বরে সেতাফুর রহমান বাবুর নাম আসে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, রাজশাহীতে উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়ে একশ্রেণির অসাধু রাজনীতিক মাদক ব্যবসায় জড়িত। তারা ফেনসিডিল, হেরোইন, ইয়াবাসহ বিভিন্ন ধরনের মাদকের ব্যবসা করেন। মাদক ব্যবসা বা চোরাচালান এলাকায় নতুন নতুন মাদকসেবী সৃষ্টি করেছে। এসব মাদকসেবী অর্থের জোগান পেতে ছিনতাই, চাঁদাবাজি, খুনসহ বিভিন্ন অপরাধে জড়িয়ে পড়ছেন।
স্থানীয়রা জানায়, বাবুর বিরুদ্ধে একাধিক মাদক মামলা আছে। তিনি মাটিকাটা ইউনিয়নের ৭, ৮ ও ৯ নম্বর ওয়ার্ড যুবলীগের সহসভাপতি ছিলেন। ২০১৮ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দিন মাটিকাটা এলাকায় ভোটকেন্দ্র দখলে নিতে বিএনপির নেতাকর্মীদের ওপর হামলার ঘটনায় জেলা যুবদলের যুগ্ম আহ্বায়ক রবিউল ইসলাম অরণ্য কুসুমের বাবা নজরুল ইসলাম মারা যান। গণঅভ্যুত্থানের পর নিহত নজরুল ইসলামের বড় ছেলে মাসুম সরকার বাদী হয়ে সেতাফুর রহমান বাবুকে প্রধান আসামি করে হত্যা মামলা করেন। এছাড়া আওয়ামী লীগের আমলে ওই এলাকায় জিয়া পরিষদের কার্যালয়ও দখল করেছিলেন বাবু। ওই ঘটনাতেও তার বিরুদ্ধে গণঅভ্যুত্থানের পর আরও একটি মামলা হয়েছে।
মাটিকাটা ইউপি সচিব সাব্বির রহমান জানান, ২০২৩ সালের জানুয়ারি মাসে ১০০ গ্রাম হেরোইনসহ গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে যান ৮ নম্বর ওয়ার্ডের তৎকালীন ইউপি সদস্য সেতাফুর রহমান বাবু। এ কারণে তিনি ইউপি কার্যালয়ে অনুপস্থিত থাকেন। ওই সময় জেলা প্রশাসক স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ে চিঠি দিয়ে বিষয়টি অবহিত করেন। পরে তাকে ইউপি সদস্যের পদ থেকে বরখাস্ত করা হয়। তখন থেকেই তিনি বরখাস্ত অবস্থায় আছেন।
স্থানীয়রা জানান, গণঅভ্যুত্থানের পর গোদাগাড়ী ও রাজশাহী নগরীর বোয়ালিয়া থানায় সেতাফুর রহমান বাবুর বিরুদ্ধে মামলা হলে তিনি আত্মগোপন করেন। কয়েকদিন আগে তিনি হঠাৎ করে এলাকায় ফিরেছেন। এরপর তাকে জামায়াতে ইসলামীর অনুষ্ঠানমঞ্চে দেখা গেল। এ নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করছেন এলাকার সচেতন ব্যক্তিরা।
নিহত নজরুল ইসলামের ছেলে জেলা যুবদলের যুগ্ম আহ্বায়ক রবিউল ইসলাম অরণ্য কুসুম বলেন, ‘আমরা শুনছি যে জামায়াতের এই ইফতার মাহফিল আয়োজনের পুরো টাকাটাই দিয়েছে মাদক ব্যবসায়ী সেতাফুর রহমান বাবু। একারণে তাকে মঞ্চে বসতে দেয়া হয়েছে। তিনি বলেন, ‘আওয়ামী লীগের এই সন্ত্রাসী ভোটকেন্দ্র দখলে নিতে আমার বাবাকে হত্যা করেছে। তাকেই এখন দেখা যাচ্ছে জামায়াতের মঞ্চে, একেবারে এমপির পাশে। এটা খুব দুঃখজনক।’
এ বিষয়ে জানতে চাইলে জামায়াতের কেন্দ্রীয় নায়েবে আমির ও সংসদ সদস্য অধ্যাপক মুজিবুর রহমান বলেন, ‘আমি বাবুকে চিনিনা। কে কোথায় বসলো তা আমার জানার কথা নয়। তার নামে মামলা আছে কিনা তা আমার জানা নাই।’
গোদাগাড়ী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) হাসান বশিরকে একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি রিসিভ করেননি।
রাজশাহী জেলা পুলিশ সুপার মোহাম্মদ নাঈমুল হাছান বলেন, ‘বাবুর বিষয়ে খোঁজ-খবর নিয়ে দেখি। যদি কোন মামলা থাকে বা মাদক কারবারে জড়িত থাকে তাহলে অবশ্যই ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
- বিষয় :
- রাজশাহী
- জামায়াতে ইসলামী
- ইফতার
- যুবলীগ নেতা
