সরেজমিন: রংপুর
কাউন্টারে টিকিট নেই মিলছে কালোবাজারে
ফিরতিপথে গুনতে হচ্ছে দ্বিগুণ ভাড়া
সিট খালি নেই লিখে রেখে প্রতারণা করা হচ্ছে যাত্রীদের। রংপুরের কামারপাড়ায় সমকাল
স্বপন চৌধুরী, রংপুর
প্রকাশ: ২৬ মার্চ ২০২৬ | ০৯:৩৮ | আপডেট: ২৬ মার্চ ২০২৬ | ১১:০৩
| প্রিন্ট সংস্করণ
রংপুরে ঈদ করতে আসা বিভিন্ন পেশার মানুষ বাস টিকিট না পেয়ে ভোগান্তিতে পড়েছেন। আগামী সোমবার পর্যন্ত রংপুর-ঢাকা পথের সব বাসের টিকিট শেষ হয়ে গেছে। তবে কাউন্টারে না থাকলেও চড়া দামে কালোবাজারে ঠিকই মিলছে টিকিট। এ ক্ষেত্রে দ্বিগুণেরও বেশি দাম হাঁকা হচ্ছে।
নিয়মনীতি না থাকায় বাস কাউন্টারের কর্মচারীদের কাছে একরকম জিম্মি হয়ে পড়েছেন যাত্রীরা। ঢাকা পর্যন্ত সাধারণ বাসের টিকিট বিআরটিএ নির্ধারিত ৮৬০ টাকা হলেও কালোবাজারে তা এক হাজার ২০০ থেকে এক হাজার ৫০০ টাকায় কিনতে হচ্ছে। এ ছাড়া বিলাসবহুল গাড়ির ক্ষেত্রেও বাস মালিকরা ঈদ-পরবর্তী ১০ দিন ভাড়া বাড়িয়ে দিয়েছেন।
কাউন্টারে ঝোলানো টিকিটের মূল্য তালিকায় দেখা যায়, পুরোনো এসি বাসের টিকিট এক হাজার টাকার জায়গায় এক হাজার ৮০০ টাকা এবং এক হাজার ৫০০ টাকার হুন্দাই বাসের টিকিট করা হয়েছে দুই হাজার ৪০০ টাকা। অত্যাধুনিক নতুন বাসের ভাড়া করা হয়েছে তিন হাজার টাকা। গতকাল বুধবার দুপুরে রংপুর নগরীর কামারপাড়ায় বাসস্ট্যান্ডের বিভিন্ন কাউন্টারে গিয়ে এমন চিত্র দেখা গেছে।
যাত্রীদের অভিযোগ, ঢাকায় ফেরার অগ্রিম টিকিট বিক্রির আগাম ঘোষণা দেওয়া হয়নি। বেশির ভাগ কাউন্টারে টিকিট বিক্রিই হয়নি। কালোবাজারে টিকিট বিক্রির মাধ্যমে যাত্রীদের জিম্মি করে টাকা হাতিয়ে নেওয়া হচ্ছে। ঢাকায় একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা মনছুর আলী স্ত্রীসহ ঈদ করতে রংপুরে এসেছেন। ঢাকায় ফেরার টিকিট পাচ্ছিলেন না। বৃহস্পতিবার তাঁকে কর্মস্থলে যেতেই হবে। সব কাউন্টারে ঘুরেও মেলেনি টিকিট। বাধ্য হয়ে তিনি শ্যামলী পরিবহনের দুটি টিকিট কালোবাজারে তিন হাজার টাকায় কিনে বিকেল ৩টার গাড়িতে ওঠেন। যদিও সাধারণ টিকিটের মূল্য ৮৬০ টাকা।
মনছুর আলী বলেন, ‘ঈদের পর কর্মস্থল ঢাকায় ফিরতে অনলাইনে কোনো বাসের টিকিট নেই। সকাল ৮টায় বাসস্ট্যান্ডে এসেও টিকিট পাইনি। কাউন্টার থেকে জানানো হচ্ছে, সোমবার পর্যন্ত অগ্রিম টিকিট শেষ। অথচ নির্ধারিত সময়ে বাস ছাড়ার আগে কাউন্টারের বাইরে দ্বিগুণ দামে কালোবাজারে টিকিট পাওয়া যাচ্ছে।’ এসআর ট্রাভেলসের কাউন্টারে গাড়ির অপেক্ষায় থাকা চাকরিজীবী হারুন অর রশিদ বলেন, ‘ঈদ করতে এসে বিপাকে পড়েছি। চাকুরি বাঁচাতে দ্বিগুণ দামে গাড়ির টিকিট সংগ্রহ করেছি। কর্মস্থলে যোগ দিতে দুর্ভোগ মেনে নিয়েই ঢাকায় ফিরতে হবে।’ বিকেল সাড়ে ৩টার গাড়িতে রংপুর ছাড়েন তিনি।
এনা পরিবহনের কাউন্টারে অপেক্ষমাণ ঢাকাগামী যাত্রী গার্মেন্টকর্মী হালিমা বেগম ও নয়নতারা জানান, দুদিন ধরে ঘুরছেন টিকিটের জন্য। তবে তাদের আশ্বাস দিয়েও টিকিট দেওয়া হয়নি। ঈদের পর রংপুর থেকে ঢাকাগামী এসআর ট্রাভেলস, শাহ আলী পরিবহন, হানিফ এন্টারপ্রাইজ, আগমনী এক্সপ্রেস, নাবিল পরিবহন, শ্যামলী পরিবহন, শাহ ফতেহ আলী পরিবহন, এনা পরিবহনসহ কোনো গাড়ির কাউন্টারেই টিকিট মিলছে না।
বিকেলে নাবিল পরিবহনের কাউন্টারে ঢুকে বৃহস্পতিবার রাত ১১টার গাড়ির টিকিট সংগ্রহ করেন বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা সিফাত আশরাবি। তিনি বলেন, ‘কালোবাজারে বেশি দামে সাধারণ বাসের টিকিট না নিয়ে সাধারণ এসি বাসের টিকিট কিনলাম। এক হাজার টাকার বদলে দাম রাখা হয়েছে এক হাজার ৮০০ টাকা।’ এ ব্যাপারে নাবিল পরিবহনের কাউন্টার ব্যবস্থাপক সাখাওয়াত হোসেন বলেন, ‘সাধারণ বাসের টিকিট নেই এটা ঠিক, তবে এসি বাসের টিকিট থাকলেও ঈদ উপলক্ষে মালিকপক্ষ দাম বাড়িয়েছে। আমাদের কিচ্ছু করার নেই।’ বর্ধিত দাম কাউন্টারের নোটিশ বোর্ডে টাঙানো হয়েছে বলেও জানান তিনি।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, রংপুরের কামারপাড়ার বাসস্ট্যান্ড থেকে ঢাকা, চট্টগ্রাম, সিলেটসহ দেশের বড় বড় শহরে প্রতিদিন দুই শতাধিক এসি ও নন-এসি বাস চলাচল করে। বিপুল সংখ্যক মানুষ স্বজনের সঙ্গে ঈদ উদযাপন করতে রংপুরে আসেন। তবে কর্মস্থলে ফিরতে বিড়ম্বনায় পড়তে হয়।
এসআর পরিবহনের কাউন্টার ব্যবস্থাপক মো. শফি জানান, ঈদের পর যাত্রীর চাপ বেশি থাকে। অনেক ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট সময়ে ঢাকা থেকে বাস এসে না পৌঁছানোর কারণে রংপুর থেকে ছেড়ে যেতেও দেরি হয়। এনা পরিবহনের সুপারভাইজার লিমন মিয়া জানান, প্রতি ঈদে এমনিতে যাত্রী পরিবহনে হিমশিম খেতে হয়। তবে কালোবাজারে টিকিট বিক্রির ব্যাপারে সদুত্তর দিতে পারেননি তিনি।
এ ব্যাপারে যোগাযোগ করা হলে এসআর ট্রাভেলসের মালিক গোলাম মোহাম্মদ সিরাজের পক্ষে তাঁর ব্যবস্থাপক আব্দুস সোবহান বলেন, টিকিট আগে বিক্রি হয়ে গেলে কিছু করার থাকে না।
রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের উপকমিশনার (ডিবি) সনাতন চক্রবর্তী জানান, অভিযোগ পেয়ে গতকাল দুপুরে কামারপাড়ার বাসস্ট্যান্ডে অভিযান চালানো হয়। এ সময় মাহমুদ আলম নামের এক টিকিট কালোবাজারিকে হাতেনাতে ধরা হয়।
বিআরটিএ রংপুরের সহকারী পরিচালক শফিকুল আলম সরকার জানান, নন-এসি গাড়ির টিকিটের মূল্য (রংপুর-ঢাকা) ৮৬০ টাকা নির্ধারণ করেছে সরকার। যাত্রী সাধারণের হয়রানি ঠেকাতে বিআরটিএ নিয়মিত তদারকি করছে, বসানো হচ্ছে ভ্রাম্যমাণ আদালত।
- বিষয় :
- বাস
- বাস টার্মিনাল
