মেয়েকে নিয়ে সাঁতরে পন্টুনের কাছে আসেন শাকিলা, আনতে পারেননি ছেলেকে
বারবার ছেলের লাশের কাছে ছুটে যাচ্ছিলেন শাকিলা। ছবি-সমকাল
সৌমিত্র শীল চন্দন, রাজবাড়ী
প্রকাশ: ২৬ মার্চ ২০২৬ | ১৬:০২ | আপডেট: ২৬ মার্চ ২০২৬ | ১৮:০৯
ঈদের ছুটিতে ননদ নিশি এসেছিলেন বাবার বাড়ি বেড়াতে। ঢাকায় ঘুরতে যাওয়ার শখ ছিল ভাবী শাকিলার। তাই ছুটি শেষে শাকিলা, তার ছেলে সাবিত, মেয়ে সাবিহা, ননদ নিশি ও নিশির একমাত্র মেয়ে সোহানা সৌহার্দ্য পরিবহনের একটি বাসে রাজবাড়ী থেকে ঢাকার উদ্দেশ্যে রওনা হন। কিন্তু কে জানত এ যাত্রাই হবে তার সন্তান ও ভাতিজির শেষ যাত্রা!
প্রতিবেশী মরিয়ম আক্তার কান্না জড়িত কন্ঠে জানান, দৌলতদিয়ায় পন্টুন থেকে বাসটি পদ্মায় পড়ে যাওয়ার পর শাকিলা এক হাতে মেয়েকে নিয়ে অন্য হাতে সাঁতরে পল্টুনের কাছে আসেন। দাঁড়িয়ে থাকা লোকজনকে বলেন, 'ভাই আমার মেয়েটাকে ধরেন, আমি বাস থেকে ছেলেকে নিয়ে আসি। তখন পল্টুনে দাঁড়িয়ে থাকা লোকজন মেয়ের সঙ্গে মাকেও টেনে উপরে নিয়ে আসেন। কারণ তারা বুঝেছিলেন শাকিলা ছেলেকে উদ্ধারে গেলে আর ফিরে আসতে পারবেন না। পল্টুনে তোলার পরপরই অজ্ঞান হয়ে যান শাকিলা।
এই দুর্ঘটনায় শাকিলার ছেলে সাবিতের (৮) ও ননদের মেয়ে সোহানা (১০) প্রাণ হারিয়েছে। বেঁচে ফিরেছেন শাকিলার মেয়ে সাবিহা ও ননদ নিশি।

এলাকাবাসী জানায়, শাকিলা বেগম দাদশী ইউনিয়নের আগমাড়াই গ্রামের শরিফুল ইসলামের স্ত্রী। শরিফুল পেশায় রেস্তোরাঁ ব্যবসায়ী। সাবিত স্থানীয় একটি বিদ্যালয়ের প্রথম শ্রেণিতে পড়ত।
প্রতিবেশীরা জানান, শরিফুলের বোন নিশি আক্তার ঢাকায় গার্মেন্টে চাকরি করেন। স্বামী ও একমাত্র সন্তান সোহানাকে নিয়ে ঢাকায় থাকেন তিনি। ঈদের ছুটিতে নিশি এসেছিলেন বাবার বাড়ি বেড়াতে। ছুটি শেষে বুধবার বিকেলে ভাবী, ভাতিজা আর ভাতিজিকে নিয়ে ঢাকায় ফেরার পথে এই দুর্ঘটনা ঘটে।
বৃহস্পতিবার দুপুরে আগমারাই গ্রামে শরিফুলের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, দুই শিশুর মরদেহ পাশাপাশি রাখা। সেখানে লোকে লোকারণ্য। শরীফুল সন্তানের কাছে বসে কান্না করছেন। শরিফুলের স্ত্রী শাকিলা শোকে নির্বাক। মাঝে মধ্যে বিলাপ করছেন ছেলের জন্য। স্বজনরা তাকে সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করছেন।
মেয়ে হারানো নিশি একদৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকছেন। যেন কাঁদতে কাঁদতে চোখের পানি শুকিয়ে গেছে। মাঝে মধ্যে তিনিও মূর্ছা যাচ্ছেন।
শরিফুলের স্বজন সিরাজুল ইসলাম কাঁদতে কাঁদতে বলেন, 'এ দৃশ্য দেখা যায়না! একটা সুখী পরিবারে এমন কালো ছায়া নেমে আসবে কল্পনাও করেনি কেউ।'
এ পর্যন্ত ২৬ মরদেহ উদ্ধার
দৌলতদিয়া ফেরিঘাটে পদ্মায় পড়ে যাওয়া সৌহার্দ্য পরিবহনের বাস থেকে এ পর্যন্ত নারী শিশুসহ ২৬ জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে।
তারা হলেন- রাজবাড়ী পৌরসভার ভবানীপুর লালমিয়া সড়কের মৃত ইসমাঈল হোসেন খানের স্ত্রী রেহেনা আক্তার (৬১), ছেলে আহনাফ তাহমিদ খান (২৫), সোহেল মোল্লার মেয়ে সোহা আক্তার (১১), সজ্জনকান্দার মৃত ডা. আবদুল আলীমের মেয়ে জহুরা অন্তি (২৭), কাজী মুকুলের মেয়ে কাজী সাইফ (৩০), কেবিএম মুসাব্বিরের ছেলে তাজবিদ (৭), দাদশী রামচন্দ্রপুরের সোবাহান মণ্ডলের মেয়ে লিমা আক্তার (২৬), আগমারাই গ্রামের শরিফুল ইসলামের ছেলে সাবিত হাসান (৮), মিজানপুর বড়চর বেনি নগরের মান্নান মন্ডলের স্ত্রী জোস্ন্যা (৩৫), গোয়ালন্দ ছোট ভাকলার চর বারকিপাড়ার রেজাউল করিমের স্ত্রী মর্জিনা আক্তার (৩২), মেয়ে সাফিয়া আক্তার রিন্থি (১২), কালুখালী বোয়ালিয়ার ভবানীপুরের বিল্লাল হোসেনের মেয়ে ফাইজ শাহানূর (১১), রতনদিয়া মহেন্দ্রপুর বেলগাছির আব্দুল আজিজের স্ত্রী নাজমিরা জেসমিন (৩০), ছেলে আব্দুর রহমান (৬), বালিয়াকান্দি পশ্চিম খালখোলার আরব খানের ছেলে (গাড়ি চালক) আরমান খান (৩১), কুষ্টিয়া মজমপুরের মো. আবু বক্কর সিদ্দিকের স্ত্রী মর্জিনা খাতুন (৫৬), খাগড়বাড়ীয়ার হিমাংশু বিশ্বাসের ছেলে রাজীব বিশ্বাস (২৮), খোকসা সমাজপুর ধুশুন্দুর দেলোয়ার হোসেনের ছেলে ইস্রাফিল (৩), সমসপুরের গিয়াসউদ্দিন রিপনের মেয়ে আয়েশা সিদ্দিকা (১৩), ঝিনাইদহ শৈলকূপা থানার কাচেরকোল খন্দকবাড়িয়ার নুরুজ্জামানের মেয়ে আরমান (৭ মাস), গোপালগঞ্জ কোটালীপাড়া আমতলী নোয়াধার মৃত জাহাঙ্গীর আলমের স্ত্রী মুক্তা খানম (৩৮), দিনাজপুর পার্বতীপুর থানার পলাশবাড়ী মথুয়ারাই মৃত নূর ইসলামের স্ত্রী নাছিমা (৪০), ঢাকা আশুলিয়ার বাগধুনিয়া পালপাড়ার মো. নুরুজ্জামানের স্ত্রী আয়েশা আক্তার সুমা (৩০), রাজবাড়ীর কালুখালীর মজনু শেখের ছেলে উজ্জ্বল শেখ (৫০), একই উপজেলার মদাপুর গ্রামের আফসার শেখের ছেলে আশরাফুল (২৪) এবং বোয়ালিয়া এলাকার মৃত সানাউল্লাহর ছেলে জাহাঙ্গীর (৫৫)।
রাজবাড়ী জেলা প্রশাসন ও পুলিশ প্রশাসন থেকে নিহতদের পরিচয় নিশ্চিত করা হয়েছে। মরদেহ গুলো রাজবাড়ী সদর হাসপাতাল মর্গ থেকে স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।
