বনের আইনে ‘অবরুদ্ধ’ ১১৪৬ গ্রাম
ইজাজ আহ্মেদ মিলন, গাজীপুর
প্রকাশ: ২৩ এপ্রিল ২০২৬ | ০৮:৩০
| প্রিন্ট সংস্করণ
বৈধ মালিকানা থাকার পরও জমির খাজনা-নামজারি করা কিংবা স্থাপনা নির্মাণ করতে পারছে না গাজীপুরের ৮১৪টি মৌজার হাজার হাজার পরিবার। ২০ বছর ধরে নিজেদের জমি কেনাবেচাও বন্ধ রয়েছে। এতে জেলাটির এক হাজার ১৪৬টি গ্রাম যেন এক প্রকার অবরুদ্ধ হয়ে আছে। ২০০৬ সালের ২৩ মে থেকে চলছে জমি নিয়ে এমন দুর্ভোগ।
গাজীপুর জেলায় মৌজা ৮১৪টি, গ্রাম ১ হাজার ১৪৬টি। এর প্রতিটিতেই বন বিভাগের আওতাধীন কিছু না কিছু জমি রয়েছে। সিএস, এসএ ও আরএস– এই তিনটি রেকর্ডের যে কোনো একটির কোনো এক দাগে কোথাও যদি বন বিভাগের এক ফুট জায়গাও থাকে, তাহলেও ওই দাগের অন্তর্ভুক্ত জমির মালিকরা আর কোনো কাজ করতে পারেন না। কাজ করলেও বন বিভাগের কর্মকর্তারা গিয়ে ভেঙে দেন স্থাপনা। দায়ের করেন মামলা। মৃত ব্যক্তিকে কখনও কখনও আসামি করা হয়।
জানা যায়, বন বিভাগের গেজেটভুক্ত জমির সঙ্গে একই দাগে ব্যক্তি মালিকানাধীন জমি অন্তর্ভুক্ত থাকায় ১৯২৭ সালের বন আইনের ২০ ধারার আওতায় এসব জমিতে নামজারি, হস্তান্তর ও খাজনা আদায় কার্যক্রম বন্ধ রাখা হয়েছে। ২০০৬ সালে এই আইন বলবৎ হয় ওই অঞ্চলে। ফলে সাধারণ মানুষ দীর্ঘকাল ধরে চরম ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন। যে আইনে ব্যক্তি মালিকরা তাদের জমির খাজনা পরিশোধ ও নামজারি করতে পারছেন না, সেই আইনেই আবার বন বিভাগ তাদের নিজস্ব অংশে নিয়মিত খাজনা প্রদান করছে বলে জানান ভুক্তভোগীরা।
গাজীপুর সদরের ভবানীপুর মুক্তিযোদ্ধা কলেজের ইতিহাস বিভাগের সহকারী অধ্যাপক এমদাদুল হক বলেন, আমি ও আমার পরিবার দীর্ঘদিন ধরে এই যন্ত্রণা পোহাচ্ছি। আমাদের সব ধরনের বৈধ কাগজপত্র থাকার পরও জমির খাজনা-খারিজ, স্থাপনা নির্মাণ ও বেচাকেনা করতে পারছি না। শুধু আমি নই, শ্রীপুর মৌজার শত শত পরিবার এভাবে ভোগান্তির শিকার হচ্ছে। তিনি বলেন, এসএ-১৭৬৬ নম্বর দাগে মোট জমির পরিমাণ ১৮২ বিঘা। এর মধ্যে বন বিভাগের জায়গা মাত্র সাত বিঘা। বন বিভাগ সরকারের সেই জায়গা চিহ্নিত করে গাছপালা রোপণ করে দখলে রেখেছে। এর পরও বাকি জমিতে জোতদাররা যেতে পারছেন না। খাজনা খারিজ করতে পারছেন না। জমি কেনাবেচাও বন্ধ। তিনি বলেন, আমার জমিতে স্থাপনা করতে গেলে বন বিভাগ আমার বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করে। ওই মামলায় আমার প্রয়াত বাবাকেও আসামি করে। শুধু আমি নই, এ রকম হাজার হাজার মানুষ আজ অসহায় হয়ে পড়েছে।
গড়গড়িয়া মাস্টার বাড়ি এলাকার খোরশেদ আলম বলেন, ৭ নম্বর কেওয়া মৌজায় ২০১৯ ও ২০২০ নম্বর দাগে মোট জমির পরিমাণ ৫৪ বিঘা। সেখানে বনের গেজেটভুক্ত জমির পরিমাণ চার বিঘার কম হবে। অথচ বন বিভাগ ওই ৫৪ বিঘা জোত জমিতে কাউকে কিছু করতে দিচ্ছে না। তবে বনের লোকজনকে টাকা দিয়ে ম্যানেজ করলে আবার সব সম্ভব। তিনি বলেন, ব্যক্তি মালিকানাধীন জমিতে সংবিধান অনুযায়ী ভোগদখল, নামজারি ও রাজস্ব কার্যক্রম চালু করলে এই ভোগান্তি থেকে আমরা মুক্তি পাই।
গাজীপুরের ৮১৪টি মৌজার দীর্ঘদিনের এ সমস্যার কথা জাতীয় সংসদে তুলে ধরেছেন গাজীপুর-৩ আসনের সংসদ সদস্য অধ্যাপক ডা. এস এম রফিকুল ইসলাম। গত ৩১ মার্চ সংসদ অধিবেশনে তিনি ভূমিমন্ত্রী মিজানুর রহমান মিনুর কাছে জানতে চান, গাজীপুর সদর ও শ্রীপুরে সাধারণ মানুষ ও বন বিভাগের নামে তিনটি রেকর্ডীয় জমি রয়েছে। এসব জমি গেজেটভুক্ত থাকার কারণে ভূমি উন্নয়ন করতে দিতে পারছে না। বন বিভাগের স্টেটমেন্ট অনুযায়ী বণ্টন করলে হয়রানির হাত থেকে সাধারণ মানুষ রক্ষা পাবে।
জবাবে ভূমিমন্ত্রী জানান, ভূমি মন্ত্রণালয়ের এক নির্দেশনায় ১৯২৭-এর ২০ ধারার বিধানমতে সংরক্ষিত বনভূমি হিসেবে চূড়ান্ত ঘোষণা না করা পর্যন্ত ১৯২৭-এর ৪ ধারা মোতাবেক গেজেটভুক্ত বনভূমি হস্তান্তর, নামজারী, জমা-খারিজ, রেকর্ড সংশোধন ইত্যাদি কার্যক্রম বন্ধ রাখার নির্দেশনা প্রদান করা হয়। বন বিভাগ ইতোমধ্যে অধিকাংশ জমি গেজেটভুক্ত করেছে এবং কিছু জমি গেজেটভুক্তির কার্যক্রম চলমান রয়েছে। বন বিভাগের দাবি সিএস অনুসারে হওয়ায় এসএ বা আরএস রেকর্ডে ভুলক্রমে ব্যক্তি নামে এসেছে মর্মে বন বিভাগ কর্তৃক রেকর্ড সংশোধনের একাধিক মামলা দেওয়ানি আদালতে দায়ের করা হয়েছে। দেওয়ানি আদালতের রায়ের পরিপ্রেক্ষিতে কিছু জমি ব্যক্তি পক্ষে রায় হলেও সেক্ষেত্রে আপিল ও সিভিল রিভিশন করা হয়েছে। যার ফলে স্বার্থসংশ্লিষ্ট জমিতে ভূমি উন্নয়ন কর গ্রহণসহ অন্যান্য কার্যক্রম স্থগিত রয়েছে। দাগভিত্তিক সীমানা নির্ধারণের কাজ চলমান রয়েছে বলে জানান তিনি।
পরিবেশবাদী ও বাংলাদেশ রিভার ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান মনির হোসেন সমকালকে বলেন, স্টেটস অব এনভাইরনমেন্টের তথ্যমতে ২০০০ সালে গাজীপুরে বনভূমির পরিমাণ ছিল ৩৯ হাজার ৯৪৩ হেক্টর। ২০২৩ সালে জেলায় বনভূমির পরিমাণ এসে দাঁড়ায় ১৬ হাজার ১৭৪ হেক্টর। তিনি বলেন, বনভূমি কমে গেলেও সাধারণ মানুষের ওপর জুলুম বেড়েছে। নিজেদের জোত জমিতে কেউ কিছু করতে পারছে না।
ঢাকা বিভাগীয় বন কর্মকর্তা মো. বশির আল মামুন বলেন, বন বিভাগ গেজেটভুক্ত জমিতে বাধা দিতে বাধ্য। সরকারি আইন তো মানতেই হবে। তা না হলে বন বিভাগ ও পুলিশের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
গাজীপুর জেলা প্রশাসক মো. নূরুল করিম ভূঁইয়া বলেন, এটা দীর্ঘদিনের একটা সমস্যা। সরকারের স্বার্থ রক্ষা করা যেমন আমাদের দায়িত্ব, তেমনি সাধারণ মানুষের অধিকার রক্ষাও আমাদের দায়িত্ব। বিষয়টি নিয়ে আমরা গভীরভাবে ভাবছি। সমাধানের একটা পথ খোঁজা হচ্ছে। আশা করি শিগগিরই মানুষ ভোগান্তি থেকে মুক্তি পাবে।
- বিষয় :
- আইন
