বাংলাবান্ধা স্থলবন্দর
পাথর ভাঙা শিল্পে স্থবিরতা, বিপাকে ২০ হাজার শ্রমিক
সফিকুল আলম, পঞ্চগড়
প্রকাশ: ২৫ এপ্রিল ২০২৬ | ০৭:৪৯
| প্রিন্ট সংস্করণ
ভোর হতে না হতেই বাংলাবান্ধা স্থলবন্দর এলাকায় পাথর ভাঙা মাঠে শুরু হতো হাজারো শ্রমিকের আনাগোনা। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ত মেশিনের গর্জন। কিন্তু এখন সেই পাথর ভাঙা মাঠে চলছে নীরবতা। জ্বালানি তেলের তীব্র সংকটে থমকে গেছে মেশিনের চাকা, আর সেই সঙ্গে থমকে গেছে খেটে খাওয়া মানুষগুলোর জীবনের গতি।
সরেজমিন গতকাল শুক্রবার বাংলাবান্ধা স্থলবন্দর এলাকা ঘুরে দেখা যায়, সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে থাকা কয়েকশ পাথর ভাঙা মেশিনের অধিকাংশ আজ নিথর। মেশিন চালাতে না পেরে অলস বসে আছেন কয়েক হাজার শ্রমিক। তাদেরই একজন আমিরুল ইসলাম। দীর্ঘশ্বাস ফেলে তিনি বলেন, ‘একটি পাথর ভাঙা মেশিনে প্রতিদিন ১৮ থেকে ২০ লিটার তেল লাগে। আমরা লাইনে দাঁড়িয়ে পাঁচ লিটার তেল পাই। তিন দিন তেল একসঙ্গে করে একটি মেশিন চালাতে হচ্ছে। প্রতিদিন মেশিন চালাতে পারি না। তেল না পাওয়ায় পাথরের ব্যবসা বন্ধের উপক্রম।’
আরেক পাথর শ্রমিক জানান, এই এলাকায় প্রায় ৩০০-এর বেশি পাথর ভাঙা মেশিন আছে। এগুলোই তাদের আয়ের একমাত্র উৎস। মেশিন বন্ধ হওয়া মানেই পরিবার নিয়ে না খেয়ে থাকা।
জ্বালানি সংকটের ঢেউ লেগেছে পরিবহন খাতেও। মহানন্দা নদী থেকে পাথর উত্তোলনের পর তা ট্রাক্টর দিয়ে বিভিন্ন সাইটে নেওয়া হয়।
কিন্তু চাহিদামতো ডিজেল না পাওয়ায় সেই কাজও প্রায় বন্ধ।
ট্রাক্টরচালক আজিমদ্দিন ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, নদী এলাকা থেকে পাথর পরিবহনে আমাদের একটি ট্রলিতে দিনে ২০ থেকে ২৫ লিটার ডিজেল প্রয়োজন হয়। কিন্তু আমরা পেট্রোল পাম্পে দীর্ঘ সময় লাইনে দাঁড়িয়ে থেকে চাহিদামতো তেল পাই না। অনেক অনুরোধ করার পরও পাঁচ থেকে সাত লিটার করে ডিজেল দেয়। সময়মতো না যেতে পারলে সেই তেলও পাওয়া যায় না। ডিজেল ছাড়া আমরা একেবারে বসা। গাড়ি না চললে আমাদের পেট কীভাবে চলবে?
এই শিল্পের সঙ্গে জড়িত প্রায় ২০ হাজার শ্রমিকের অনেকেই এখন দিশেহারা। নদী থেকে পাথর তোলা শ্রমিক রবিউল ইসলাম জানান, আগে সারাদিনে ৮০০ থেকে এক হাজার টাকা আয় হলেও এখন মহাজনরা পাথর কিনতে চাচ্ছেন না। কারণ হিসেবে তারা বলছেন, তেলের অভাবে পাথর পরিবহন করা যাচ্ছে না। মহাজনরা পাথর সরাতে না পেরে শ্রমিকদের পাওনা টাকাও দিতে পারছেন না।
নীলফামারীর ডোমার থেকে এসে এখানে কাজ করা নারী শ্রমিক মীনা বেগম আকুতি জানিয়ে বলেন, স্বামী-সন্তানসহ এখানেই ভাড়া বাড়িতে থেকে পাথর ভাঙার কাজ করি। শুনেছি যুদ্ধের
জন্য তেল পাওয়া যাচ্ছে না। তেলের অভাবে আমাদের মেশিন চলে না। এক দিন কাজ করলে দুই দিন বসে থাকতে হয়। আমাদের তেলের একটা ব্যবস্থা করেন ভাই।’
আমদানিকারক আনছার আলী নিজেও পাথর ক্রাসিং মেশিনের মালিক। তিনি জানান, তেলের অভাবে মেশিন বন্ধ থাকায় অনেক শ্রমিক বসে আছেন। ফলে ব্যবসায়ী ও শ্রমিক উভয়ই চরম ক্ষতির মুখে পড়েছেন।
দেশের একমাত্র চতুর্দেশীয় এই বন্দর দিয়ে ভারত ও ভুটান থেকে প্রচুর পাথর আমদানি হয়। ভৌগোলিক কারণে অত্যন্ত সম্ভাবনাময় এই বন্দর দিয়ে খাদ্যপণ্য, ইলেকট্রনিক্স ও পাটজাত পণ্য রপ্তানি হলেও মূল চালিকাশক্তি পাথর শিল্প।
চলমান এই সংকটে শুধু শ্রমিক নন, বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়েছেন ব্যবসায়ীরাও। বাংলাবান্ধা স্থলবন্দরের আমদানি-রপ্তানিকারক গ্রুপের আহ্বায়ক কমিটির সদস্য মানিক প্রধান বলেন, আমরা ভারত ও ভুটান থেকে বোল্ডার পাথর আমদানি করে স্টোন ক্রাশার মেশিনে ভেঙে বিক্রি করি। বর্তমানে ডিজেল সংকটের কারণে
আমাদের মেশিনগুলো বন্ধ হয়ে আছে। আমদানি করা পাথর বিক্রি করতে পারছি না। ফলে শুধু শ্রমিক নয়, পাথর ব্যবসায়ীসহ আমরাও ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছি।
সংকট নিরসনে প্রশাসনের দ্বারস্থ হয়েও কোনো সুরাহা পাননি অভিযোগ করে মানিক প্রধান বলেন, চাহিদামতো তেল পাওয়ার আশায় আমরা জেলা প্রশাসকের সঙ্গে দেখা করেছিলাম। কিন্তু এই বিষয়ে আমরা কারও পক্ষ থেকে কোনো সহযোগিতা পাইনি। এ ছাড়া বৈশ্বিক পরিস্থিতির কারণে ভুটানেও পাথরের দাম বেড়ে গেছে। অতিরিক্ত দামে পাথর এনে লোকসানের মুখে পড়তে হচ্ছে ব্যবসায়ীদের। সব মিলিয়ে বর্তমানে পাথর আমদানি প্রায় ৩৫ থেকে ৪০ শতাংশ কমে গেছে বলে জানান তিনি।
তবে বন্দরে আমদানি-রপ্তানিতে জ্বালানি সংকটের কোনো প্রভাব পড়েনি বলে দাবি করেন বাংলাবান্ধা স্থলবন্দর লিমিটেডের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আবুল কালাম আজাদ। তিনি বলেন, এখানে আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রম স্বাভাবিক রয়েছে। গত অর্থবছরের তুলনায় এবার রপ্তানি বেড়েছে এবং আমদানিও বাড়বে বলে আমরা আশা করছি।
তিনি বলেন, বর্তমানে এখানে তৈরি খাদ্য, ইলেকট্রনিক, পাট ও পাটজাত বিভিন্ন পণ্য রপ্তানি হচ্ছে। এই বন্দর দিয়ে সবচেয়ে বেশি পাথর আমদানি হয়। এর বাইরে গম, আখের মোলাসেস আমদানি হচ্ছে।
- বিষয় :
- স্থলবন্দর
