মাঠজুড়ে হরেক নামের নানা রঙের ঘোড়া
দিনাজপুরের ফুলবাড়ীর ঐতিহ্যবাহী বুড়াচিন্তামন মেলায় উঠেছে হরেক রঙের ঘোড়া সমকাল
ফুলবাড়ী (দিনাজপুর) প্রতিনিধি
প্রকাশ: ২৬ এপ্রিল ২০২৬ | ০৮:০৬
| প্রিন্ট সংস্করণ
দিনাজপুরের ফুলবাড়ী উপজেলার ঐতিহ্যবাহী বুড়াচিন্তামন ঘোড়ার মেলা জমে উঠেছে। মেলা ঘিরে এলাকাবাসীর মধ্যে আনন্দের কমতি নেই। দীর্ঘদিনের ঐতিহ্য লালন করতে পারা সবার দায়িত্ব বলেও মনে করে এলাকাবাসী।
প্রতিবছর বৈশাখ মাসের ৯/১০ তারিখে শুরু হয় মাসব্যাপী এই মেলা। বৈশাখ মাসের ১৩ তারিখ থেকে কেনাবেচার রসিদ কাটা হয় (ছাপা বের হয়)। ফুলবাড়ী শহর থেকে ৮-৯ কিমি দক্ষিণ-পশ্চিমে এবং বারাই হাট থেকে ৫-৬ কিমি দক্ষিণে ২ নম্বর আলাদীপুর ইউনিয়নে ২০২ বছর ধরে বসছে বুড়াচিন্তামন মেলা। মূল মেলা এক মাস হলেও পশুর মেলা হয় ১০ দিন। ঘোড়া ছাড়াও মহিষ, গরু, ভেড়া ও ছাগল বেচাকেনা হয় মেলায়। তবে এখন গরু-মহিষের সংখ্যা কমে যাওয়ায় মূলত ঘোড়ার মেলা হিসেবেই এটি বেশি প্রসিদ্ধ।
আয়োজকরা বলছেন, দেশের অন্যতম ঘোড়া বেচাকেনার মেলা এটি। এই মেলার জন্য নির্দিষ্ট রয়েছে আট একর জমি-মাঠ। এখানে মাদ্রাসা-স্কুলের প্রশস্ত মাঠে হাট বসে।
দুমকি, সিডর, দুর্বার, বিজলি, কিরণ মালা, রানী, সুইটি আরও কত বাহারি নাম ঘোড়ার! ওদের ক্ষিপ্রতা আর বুদ্ধিমত্তায়ও মেলে নামের সার্থকতা। ঘোড়াগুলোর দুলকি চলনে বিদ্যুৎ গতি, চোখের পলকে যেন মাইল পার। পছন্দের ঘোড়া পেতে ক্রেতাদের মধ্যে চলে রীতিমতো কাড়াকাড়ি আর দর কষাকষি। ক্রেতা, বিক্রেতা ও দর্শনার্থীদের পদচারণে মুখরিত ঐতিহ্যবাহী বুড়াচিন্তামন ঘোড়ার মেলা। দরদাম ঠিকঠাকের পর পাশের খেলার মাঠে ঘোড়া নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে ক্রেতাকে দেখানো হয় ঘোড়ার দৌড়।
রংপুর তারাগঞ্জ থেকে মজনু মিয়া পাঁচটি ঘোড়া নিয়ে বৃহস্পতিবার মেলায় এসেছেন। তাঁর বড় ঘোড়ার নাম ‘নিউ পাওয়ার টেন’। দাম চাচ্ছেন ৭ লাখ টাকা, সাড়ে ৫ লাখ পেলেও ছেড়ে দেবেন। দিনাজপুর টেগরা থেকে ঘোড়া নিয়ে এসেছেন হাসান আলী। ৪ লাখ টাকা দাম চাচ্ছেন।
মধ্যপাড়া, পার্বতীপুর থেকে এসেছেন জয়নাল আবেদিন (৫০)। ১৭ মাস বয়সের দৃষ্টিনন্দন ঘোড়াটি তিনি বিক্রি করতে এনেছেন। নাম রাখেননি। আড়াই লাখ টাকা দাম চাচ্ছেন। একই উপজেলার মধ্যপাড়া থেকে আরেকজন পিকআপে করে এনেছেন সাতটি ঘোড়া। নবাবগঞ্জ উপজেলার স্বপ্নপুরী থেকে আবুল কালাম এনেছেন একটি ঘোড়া। দাম চাচ্ছেন দেড় লাখ।
বগুড়া থেকে আজাদ হোসেন ‘সম্রাট’ নামের পাঁচ বছর বয়সী লাল ঘোড়া নিয়ে এসেছেন। দাম চাচ্ছেন ৩ লাখ টাকা। তিনি বলেন, এটি রেসিং ঘোড়া। দ্রুত দৌড়াতে পারে।
ঘোড় সওয়ারি কামরুজ্জামান ও সামছুল জানান, আগে তাদের বাপ-দাদারা এ মেলায় ঘোড়া কেনাবেচা করতেন, তারা আগলে রেখেছেন সেই পারিবারিক ঐতিহ্য। আগে ঘোড়ার হাট ও ক্রেতাদের আকৃষ্ট করতে ঘোড়দৌড়ের বিস্তীর্ণ মাঠ থাকলেও বর্তমানে সেটি সংকুচিত করা হয়েছে বলে ঘোড়া বেচাকেনায় কিছুটা সমস্যা হচ্ছে।
মেলার ইজারাদার সফিকুল ইসলাম, ওয়াজেদ আলী ও রুবেল হোসেন বলেন, ঐতিহ্যবাহী বুড়াচিন্তামন ঘোড়ার মেলা সুষ্ঠুভাবে করতে ২০০ জন ভলানটিয়ার (স্বেচ্ছাসেবক) কাজ করছেন।
আলাদীপুর ইউপির সাবেক চেয়ারম্যান দছিম উদ্দীন মণ্ডল জানান, এ মেলায় লালমনিরহাট, গাইবান্ধা, নীলফামারী, রংপুর, কুড়িগ্রাম, ঠাকুরগাঁও, বগুড়া, দিনাজপুর, পাবনা, জয়পুরহাট, নাটোরসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ঘোড়ার আমদানি হয়।
ঘোড়ার মেলা কমিটির সভাপতি শিক্ষক আফতাব উদ্দিন জানান, ২০২ বছরের পুরোনো এ মেলা শুরু থেকেই ঘোড়ার জন্য প্রসিদ্ধ ছিল। স্বাধীনতার পরও মেলায় নেপাল, ভুটান, ভারত, পাকিস্তানসহ মধ্যপ্রাচ্যের দেশ থেকে ঘোড়া আসত। সেসব এখন স্মৃতির পাতায় হলেও দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের মালিকরা এ মেলায় ঘোড়া নিয়ে আসেন।
ফুলবাড়ী থানার ওসি আ. লতিব শাহ জানান, বুড়াচিন্তামন ঘোড়ার মেলা নিরাপত্তায় প্রয়োজনীয় সংখ্যক পুলিশ থাকবে। ইউএনও আহমেদ হাছান বলেন, মেলায় উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে সার্বিক সহযোগিতা করা হচ্ছে।
- বিষয় :
- ঘোড়া
