তলিয়ে যাওয়া হাজারও একরের ফসল নিয়ে বিপদে কৃষক
তিন দিনের বর্ষণে তলিয়ে যাওয়া স্বপ্নের সোনালি ফসল রক্ষার চেষ্টায় এক নারী। রংপুরের পীরগঞ্জের মদনখালী ইউনিয়নের ধারাকোল বিল সমকাল
রংপুর অফিস ও তাড়াশ (সিরাজগঞ্জ) প্রতিনিধি
প্রকাশ: ০১ মে ২০২৬ | ০৮:১০
| প্রিন্ট সংস্করণ
রংপুরের পীরগঞ্জের মদনখালী ইউনিয়নের ধারাকোল গ্রামের পাশে অবস্থিত ধারাকোল বিলজুড়ে লাগানো অন্তত ৪০০ একরের পাকা ও আধাপাকা বোরোক্ষেত তলিয়ে গেছে। এতে ভুক্তভোগী সহস্রাধিক কৃষক দুশ্চিন্তায় পড়েছেন।
ভুক্তভোগী কৃষকরা জানান, চার দিন আগেও তাঁরা সোনালি ওই ধান ঘরে তোলার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। সেই ক্ষেত গত তিন দিনের বর্ষণে পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় সব স্বপ্ন ধূলিসাৎ হয়েছে।
কৃষকরা জানান, ধারাকোল বিলের জমিতে প্রতি বছর ব্যাপক বোরো ধান উৎপাদিত হয়। চলতি বছরেও অনুকূল আবহাওয়ায় ভালো ফলনের আশায় ছিলেন তাঁরা। অনেকে জমি থেকে পাকা ধান কাটার প্রস্তুতিও নিচ্ছিলেন। কেউ কেউ কাটা শুরু করেন। উঠতি ধানক্ষেত তলিয়ে যাওয়ায় তাঁরা এখন দিশেহারা হয়ে পড়েছেন।
ভুক্তভোগী অন্তত ১৫ জন কৃষক জানান, ধান চাষে খরচ জোগাতে বিভিন্ন সংস্থা থেকে অনেকে ঋণ নিয়েছেন। কেউ কেই জমি বন্ধক রেখে ঘরে ফসল তোলার আশায় দিন গুনছিলেন। আকস্মিক বৃষ্টিতে সেই ফসল তলিয়ে যাওয়ায় দুশ্চিন্তায় পড়েছেন। এ অবস্থায় পরিবার-পরিজন নিয়ে বেঁচে থাকা অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়বে বলে তাঁরা জানান।
ধারাকোল গ্রামের কৃষক সোনা মিয়া বলেন, ‘ধান নাগবার যায়া ২০ হাজার টাকা লোন তুলছি। ধান পাকি গেইছে, ৩-৪ দিন পর কাটনো হয়। এ্যালা গোটাল পাকা ধানবাড়ি পানিত ডুবি গেইছে। খালি ছটফটাওচি। লোন শোধ করমো কি দিয়া, খামো কি?’
কৃষি কর্মকর্তা সুমন আহমেদ জানান, ক্ষয়ক্ষতির তালিকা এখনও করা হয়নি। তবে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের সরকারিভাবে সহায়তা দেওয়া হবে।
চলনবিল এলাকায় বোরো ধান কাটার মৌসুমের শুরুতেই তীব্র শ্রমিক সংকটে পড়েছেন কৃষকরা। সাম্প্রতিক ঝড় ও ভারী বৃষ্টিতে শত শত বিঘা জমির পাকা ধান নুয়ে পড়েছে। এর সঙ্গে জমিতে পানি জমে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে। ফলে অধিক মজুরি দিয়েও শ্রমিক না পেয়ে দিশেহারা হয়ে পড়েছেন কৃষকরা।
তাড়াশ উপজেলার জাহাঙ্গীরগাঁতি এলাকার কৃষক আব্দুস সামাদ চলতি মৌসুমে ১২ বিঘা জমিতে ব্রি-২৯ জাতের বোরো ধানের আবাদ করেছেন। কিন্তু কয়েক দিনের ঝড়বৃষ্টিতে তাঁর প্রায় ৬০ শতাংশ জমির পাকা ধান নুয়ে পড়েছে। জমিতে পানি জমে থাকায় ধান কাটাও কঠিন হয়ে পড়েছে।
আব্দুস সামাদ জানান, ‘চার দিন ধরে শ্রমিক খুঁজছি, কিন্তু কেউ নুয়ে পড়া ভেজা ধান কাটতে রাজি হচ্ছে না। যারা রাজি হচ্ছে তারা বিঘাপ্রতি ৭ হাজার ৫০০ থেকে ৮ হাজার টাকা দাবি করছে, যা গত বছরের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ।’
স্থানীয় কৃষকরা জানান, গত বছর এ অঞ্চলে ধান কাটার স্বাভাবিক মজুরি ছিল বিঘাপ্রতি ৪ হাজার থেকে ৪ হাজার ৫০০ টাকা। এবার তা বেড়ে ৬ হাজার থেকে ৮ হাজার টাকায় দাঁড়িয়েছে। নুয়ে পড়া ধান কাটতে আরও বেশি পারিশ্রমিক দিতে হচ্ছে।
চলনবিল অঞ্চলের ১০টি উপজেলায় এ বছর ১ লাখ ১৯ হাজার হেক্টর জমিতে বোরো ধানের আবাদ হয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ৫০ শতাংশ জমির ধান পেকে গেছে এবং কাটার উপযোগী হয়েছে। তবে সাম্প্রতিক ঝড়-বৃষ্টিতে নিচু জমির প্রায় ৬০ শতাংশ ধান নুয়ে পড়েছে। জমিতে পানি জমে থাকায় এসব ধান পচে যাওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
তাড়াশের সেরাজপুর এলাকার শফিউল হক বাবলু বলেন, ‘ধান নুয়ে পড়েছে, পুরোপুরি পাকেওনি। কাটতে পারছি না, আবার অপেক্ষা করলে পচে যাবে। অর্ধেক ফসলও ঘরে তুলতে পারব না।’
কালীদাসনীলি গ্রামের কৃষক মজনু মিয়া বলেন, চলনবিল এলাকায় ধান কাটার শ্রমিকের বড় অংশ আসে আশপাশের বিভিন্ন উপজেলা থেকে। তবে বর্তমানে বিকল্প কর্মসংস্থান বেড়ে যাওয়ায় অনেক শ্রমিক আর ধান কাটার মতো কষ্টসাধ্য কাজে আসছেন না। তাদের অনেকেই এখন অটোরিকশা, ভ্যান বা অন্যান্য কাজে বেশি আয় করছেন।’
এদিকে যান্ত্রিক পদ্ধতিতে ধান কাটার খরচও বেড়েছে। হারভেস্টার দিয়ে বিঘাপ্রতি ধান কাটতে গত বছর যেখানে ৪ হাজার থেকে ৪ হাজার
২০০ টাকা লাগত, সেখানে এবার ৭ হাজার টাকার বেশি খরচ হচ্ছে। তবে জমিতে পানি থাকলে হারভেস্টার ব্যবহার করা সম্ভব না। দ্রুত শ্রমিক সংকট নিরসন না হলে এবং ক্ষতিগ্রস্ত ধান কাটার ব্যবস্থা না হলে বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়বেন কৃষকরা। এতে ধান উৎপাদনেও নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা আছে।
তাড়াশ কৃষি কর্মকর্তা শমিষ্ঠা সেন গুপ্তা বলেন, ‘কৃষকদের পরামর্শ দিচ্ছি— যেসব জমির ধান ৮০ শতাংশ পেকে গেছে, সেগুলো দ্রুত কেটে ফেলতে।’
- বিষয় :
- কৃষক
