ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

২২ শিশু-কিশোরী নিখোঁজ সন্দেহে পাচার চক্র

২২ শিশু-কিশোরী নিখোঁজ সন্দেহে পাচার চক্র
×

 তানভীর হোসাইন, ময়মনসিংহ

প্রকাশ: ০৩ মে ২০২৬ | ০৮:৪৩ | আপডেট: ০৩ মে ২০২৬ | ১০:০০

| প্রিন্ট সংস্করণ

বুকে তিন বছরের শিশুসন্তানের ছবি। চোখেমুখে বিষাদ নিয়ে এক বাজার থেকে অন্য বাজারে ছুটছেন মা ও বাবা। যাঁকে দেখছেন, তাঁর সামনে মেয়ের ছবি বাড়িয়ে দিচ্ছেন জিজ্ঞেস করছেন, ‘আমার মেয়েরে দেখছেন কেউ? অনেক ছোট, পথ চেনে না, ঠিকানাও বলতে পারে না!’ 

১৫ দিন হলো শিশুটির খোঁজ এখনও মেলেনি। শুধু এই শিশুটি নয়, সাম্প্রতিক সময়ে ময়মনসিংহের মুক্তাগাছায় একের পর এক শিশু, কিশোর ও কিশোরী নিখোঁজ হওয়ার ঘটেছে। গত দুই মাসের কম সময়ে ২২টি নিখোঁজের ঘটনায় থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) হয়েছে। এর মধ্যে তিনজন ছেলে এবং ১৯ জন মেয়ে। অভিভাবকরা বলছেন, পাচারকারী চক্রের হাতে পড়েছে তাদের কারও কারও সন্তান। এতে এলাকায় উদ্বেগ ও আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। 

মুক্তাগাছা থানা পুলিশের তথ্যমতে, নিখোঁজের সংখ্যা উল্লেখযোগ্য হারে বাড়তে শুরু করে গত মার্চ মাস থেকে। এরপর ২২টি জিডি হয়েছে। এর মধ্যে উদ্ধার হয়েছে ছয়জন। মার্চে আটটি জিডির বিপরীতে চারজন উদ্ধার হয়েছে। এপ্রিলে ১৪টি জিডির বিপরীতে দুজনকে পাওয়া গেছে। 

যারা উদ্ধার হয়েছে, তাদের নিখোঁজ ও উদ্ধারের বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য পুলিশ বা পরিবারের কাছে পাওয়া যাচ্ছে না।
থানায় জিডির বাইরেও কয়েকটি নিখোঁজের ঘটনার তথ্য পেয়েছে সমকাল। এই শিশু, কিশোর ও কিশোরীরা নিখোঁজের ১০-১৫ দিন পেরিয়ে গেলেও থানায় জিডি হয়নি। 
থানায় যাদের জন্য জিডি করা হয়েছে, এদের মধ্যে তিন বছর বয়সী শিশু একজন, ১১ থেকে ১৫  বছর বয়সী শিশু ১০, ১৬ থেকে ২০ বছর বয়সী সাত, ২০ বছর ঊর্ধ্বে চারজন। এই ২২ জনের মধ্যে ১০ জনের পরিবারের সঙ্গে কথা বলেছে সমকাল।

গত ৭ এপ্রিল মুক্তাগাছা থেকে নিখোঁজ হয় ১৫ বছর বয়সী এক কিশোরী। পরে ঢাকা থেকে তাকে উদ্ধার করে পুলিশ। জানতে চাইলে এই কিশোরীর বাবা সমকালকে জানান, তাঁর মেয়ে হারিয়ে যাওয়ার পাঁচ দিন পর ঢাকা থেকে উদ্ধার হয়। একটি পাচারকারী দল তাকে মুক্তাগাছা থেকে ঢাকায় নিয়ে যায়। সেখান থেকে তাকে ভারতে পাঠিয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা করছিল। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তাকে উদ্ধার করে। পরিবারের কথা চিন্তা করে মামলা করেননি বলে জানান তিনি। 

উদ্ধার হওয়া কিশোরী সমকালকে জানায়, সে স্থানীয় একটি বিদ্যালয়ে দশম শ্রেণিতে পড়ে। তাকে ফাঁদে ফেলে মুক্তাগাছা থেকে কৌশলে ঢাকায় নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। 
মুক্তাগাছা পৌর এলাকার ব্যবসায়ী আল আমিন বলেন, একটি এলাকায় এত স্বল্প সময়ে এত শিশু-কিশোর নিখোঁজ হওয়া কোনো স্বাভাবিক ঘটনা নয়। প্রশাসন ও জনপ্রতিনিধিদের সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়ার পাশাপাশি বাজার, মেলা ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নজরদারি বাড়ানোর দাবি জানান তিনি।

এ বিষয়ে সচেতনতামূলক কর্মকাণ্ডের পাশাপাশি জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় আইনগত সহায়তা দেওয়া হবে বলে জানান ময়মনসিংহ জেলা প্রশাসক মো. সাইফুর রহমান। তিনি বলেন, এতগুলো শিশু নিখোঁজের বিষয়টি আমার জানা ছিল না। এ অপরাধের সঙ্গে যে বা যারা জড়িত, তাদের খুঁজে বের করে দ্রুত প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে।

মেলা থেকে হারায় তিন বছরের শিশুটি
গত ২৮ এপ্রিল শিশুটির বাড়ি গিয়ে জানা যায়, সে বাবা-মায়ের তিন সন্তানের মধ্যে সবার ছোট। গত ১৮ এপ্রিল কামারিয়া থেকে সীমান্তবর্তী টাঙ্গাইলের মধুপুর উপজেলায় আত্মীয়ের বাড়িতে বেড়াতে গিয়েছিল। সেদিন বিকেলে মধুপুরের শোলাকুড়ি মেলায় শিশুটি দাদি, নানি, বোন, ভগ্নিপতির সঙ্গে বেড়াতে যায়। ভিড়ের মধ্যে হঠাৎ করেই নিখোঁজ হয় সে। মাইকে বারবার ঘোষণা এবং খোঁজাখুঁজির পরও তার কোনো সন্ধান মেলেনি। ঘটনার পরদিন মুক্তাগাছা ও মধুপুর থানায় জিডি করা হয়। এলাকাজুড়ে পোস্টারও লাগানো হয়েছে। 
পরিবারের অভিযোগ, পুলিশের কাছ থেকে কাঙ্ক্ষিত সহযোগিতা পাচ্ছেন না তারা। চেচুয়া বাজারের ব্যবসায়ী সাব্বির আহমেদ রাকিব আক্ষেপ করে বলেন, শিশুটির বাবা প্রতিদিন ছবি বুকে নিয়ে এই বাজারে আসেন। দৃশ্যটি দেখলে বুক ভেঙে যায়। 

সন্তান হারিয়ে পাগলপ্রায় মা
মুক্তাগাছা পৌর এলাকার পাশে কুতুবপুর গ্রাম থেকে নিখোঁজ হয় আট বছরের এক ছেলেশিশু। ১৬ এপ্রিল বাড়ির পাশ থেকেই নিখোঁজ হয় সে। তার বাবা নেই। তিন ভাইবোনের মধ্যে সে সবার ছোট। ছেলের শোকে মা এখন পাগলপ্রায়। পরিবারটি এখনও থানায় জিডি করেনি। 
২৮ এপ্রিল সকালে তাদের বাড়িতে গেলে কান্নায় ভেঙে পড়েন শিশুটির স্বজনরা। শিশুটির খালা সমকালকে বলেন, একই সময়ে এলাকায় আরও শিশু নিখোঁজ হওয়ায় তাদের মধ্যে আতঙ্ক বিরাজ করছে।

মাদ্রাসায় যাওয়ার পথে নিখোঁজ দুই কিশোর
৮ নম্বর দাওগাঁও ইউনিয়নের দড়িকাটবাওলা গ্রামের ১৩ বছরের এক কিশোর ২৬ এপ্রিল সকালে বাড়ি থেকে হাফিজিয়া মাদ্রাসার উদ্দেশে রওনা দেয়। কিন্তু সে আর পৌঁছায়নি। বিকেল গড়িয়ে রাত হলেও মাদ্রাসায় না যাওয়ায় শিক্ষকরা পরিবারকে খবর দেন। পরদিন রাতে থানায় জিডি করতে গেলে পুলিশ তাদের আরও কয়েক দিন খোঁজাখুঁজি করার পরামর্শ দেয়।
একই গ্রামের আরেক কিশোর একই দিন নিখোঁজ হয়। দুই কিশোরই একই মাদ্রাসার ছাত্র ছিল। এক কিশোরের বাবা জানান, আশপাশের বেশ কয়েকটি উপজেলায় খোঁজ নিয়েও ছেলের সন্ধান মেলেনি। তার মা এখন এতটাই বিপর্যস্ত, ১২-১৩ বছরের কোনো কিশোরকে দেখলেই নিজের সন্তান ভেবে জড়িয়ে ধরে কান্নায় ভেঙে পড়ছেন। 

৮ দিন ধরে নিখোঁজ ৯ বছরের শিশু
২৪ এপ্রিল দুপুরে বাড়ি থেকে বের হওয়ার পর ৯ বছর বয়সী এক শিশু আর ফিরে আসেনি। একমাত্র সন্তানের কোনো সন্ধান না পেয়ে পাগলপ্রায় বাবা-মা ও স্বজন। 
বাড়িতে গেলে শিশুটির চাচা বলেন, আমরা সম্ভাব্য সব জায়গায় খোঁজ নিয়েছি। আশপাশের কোনো গ্রাম বা এলাকা বাকি রাখিনি। ওর বাবা-মা কান্নাকাটি করতে করতে অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। আমরা এখনও থানায় কোনো জিডি করিনি। 

থানায় জিডি তবু কাটছে না উদ্বেগ
থানায় করা জিডির তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, গত ১৮ ফেব্রুয়ারি নিখোঁজ হওয়া উপজেলার এক কিশোরীকে ২৫ মার্চ উদ্ধার করা হয়। আরেক গ্রামের এক কিশোরী ১ মার্চ নিখোঁজ হলে তার মা থানায় জিডি করেন।

চারীপাড়া গ্রামের সাকিবুল হাসান শামীম (২৭) ১৪ ফেব্রুয়ারি নিখোঁজ হন এবং ৫ মার্চ তাঁর স্ত্রী জুঁই আক্তার থানায় ডায়েরি করেন। অন্য একটি গ্রামের এক কিশোরী ২৪ মার্চ নিখোঁজ হওয়ার পর ২৯ মার্চ তাকে উদ্ধার করে পুলিশ।

শ্যামপুর গ্রামের এক কিশোরী ২৯ মার্চ নিখোঁজ হলে পুলিশ তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় তাকে পাবনা থেকে উদ্ধার করে পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দেয়। তবে ৩০ মার্চ নিখোঁজ হওয়া কিশোরী ও মুজাটি গ্রামের তরুণীর (১৯) এখনও সন্ধান মেলেনি। ২৮ মার্চ বিনোবাড়ী গ্রামের এক কিশোরী নিখোঁজ হলে উদ্ধারের পর ১১ এপ্রিল তার জিডি প্রত্যাহার করা হয়। 
আরেক কিশোরীর মা জানান, পুলিশ প্রেমঘটিত বলে দাবি করে। কিন্তু তাঁর মেয়ের সঙ্গে কোনো ছেলের সম্পর্ক নেই। তবে ঠিক কী কারণে তাঁর মেয়ে নিখোঁজ, তা তিনি বলতে পারছেন না। পুলিশ তাঁর মেয়েকে উদ্ধার করে দেবে এমন আশায় দিন গুনছেন তিনি।

২ এপ্রিল নন্দীবাড়ী গ্রামের এক কিশোরী, ৬ এপ্রিল বাঁশাটি এক গ্রামের তরুণী (৩০) এবং ৫ এপ্রিল মাইজহার গ্রামের এ তরুণী (১৭) নিখোঁজ হন। ৪ এপ্রিলও এক কিশোরী নিখোঁজ হয়, তবে তাকে উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে।

আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) সিনিয়র কো-অর্ডিনেটর আবু আহমেদ ফয়জুল কবির সমকালকে বলেন, নিশ্চিতভাবেই এটি উদ্বেগজনক। অল্প সময়ের মধ্যে একটি নির্দিষ্ট এলাকায় এত সংখ্যক শিশু নিখোঁজ হওয়া কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; বরং এটি একটি সম্ভাব্য সংগঠিত ঝুঁকি, সামাজিক অবহেলা অথবা অপরাধ চক্রের সক্রিয়তার ইঙ্গিত বহন করতে পারে।

যা বলছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা
মুক্তাগাছা থানার ওসি (তদন্ত) জুলুস খান পাঠান বলেন, নিখোঁজের প্রতিটি ঘটনা আমরা অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করছি। পুলিশ সম্ভাব্য সব জায়গায় অনুসন্ধান কার্যক্রম চালাচ্ছে।
অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আবদুল্লাহ আল মামুন জানান, কিশোরীদের ক্ষেত্রে অনেক সময় প্রেমঘটিত কারণে স্বেচ্ছায় পালিয়ে যাওয়ার ঘটনা ঘটে, যা প্রযুক্তির মাধ্যমে শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়ে। তবে  শিশু নিখোঁজের বিষয়গুলো পুলিশ সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করে দ্রুত খুঁজে বের করার চেষ্টা করছে।

 

আরও পড়ুন

×