ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

শ্রমিকের মজুরি ১১০০ টাকা, এক মণ ধানের দাম ৮৫০

শ্রমিকের মজুরি ১১০০ টাকা, এক মণ ধানের দাম ৮৫০
×

দেবাশীষ ভট্টাচার্য, শেরপুর

প্রকাশ: ০৬ মে ২০২৬ | ০৮:২১ | আপডেট: ০৬ মে ২০২৬ | ১২:৩১

| প্রিন্ট সংস্করণ

‘এক মণ ধান বিক্রির টাকার সঙ্গে আরও ২৫০ টাকা যোগ কইরা শ্রমিকের মজুরি দিতেছি। সব জিনিসের দাম বাড়ে, বাড়ে না শুধু কৃষকের ধানের দাম। আমরা বাঁচমু কীভাবে।’ আক্ষেপ করে কথাগুলো বলেন, নালিতাবাড়ীর কলসপাড় ইউনিয়নের বালুঘাটা গ্রামের কৃষক ইসমাইল হোসেন। 

গতকাল মঙ্গলবার নালিতাবাড়ী পৌরশহরের একটি বাজারে শক্তি-১ জাতের ২০ মণ ধান বিক্রি করেন তিনি। ১ মণ ধানের দাম পান ৮৫০ টাকা। তিনি জানান, তাঁর উৎপাদন খরচ হয়েছে ১ হাজার টাকার বেশি। এমন অবস্থা শেরপুরের সব কৃষকের।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর জানায়, চলতি মৌসুমে শেরপুরে ৯১ হাজার ৮১১ হেক্টর জমিতে বোরো ধান চাষ হয়েছে। এর মধ্যে সাম্প্রতিক অতিবৃষ্টি, শিলাবৃষ্টি, ঝড় ও উজানের ঢলের পানিতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ২৪৫ হেক্টর জমির ধান। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা ঝিনাইগাতী ও নকলা উপজেলা। এই দুই উপজেলায় প্রায় শতাধিক হেক্টর জমির ধান কোথাও আংশিক, কোথাও পুরোপুরি বিনষ্ট হয়েছে।
এদিকে জেলায় একযোগে সবার ধান কাটা শুরু হওয়ায় বাজারে চাহিদার চেয়ে ধানের আমদানি বেশি। এই সুযোগে কম দরে ধান কেনার চেষ্টা করছেন ব্যবসায়ীরা। আবার ভেজা ধান এক মণে ৫ কেজি করে বেশি নিচ্ছেন।

নকলা উপজেলার সবচেয়ে বেশি ধান হয় উরফা ইউনিয়নে। এখানকার হাওরা বিল, বাউসি বিল, খৈলাকুড়া মরাগাংসহ কয়েকটি এলাকার প্রায় ৩৫০ একর জমির ধান সাম্প্রতিক বৃষ্টিতে তলিয়ে যায়। বাউসি বিলে ধান চাষ করেছিলেন কৃষক আমজাদ হোসেন। তিনি জানান, তাঁর দুই একর জমির ধান পানির নিচে ছিল। দৈনিক ১২০০ টাকা মজুরি ও এক বেলা খাবার দিয়ে শ্রমিক নিয়ে ধান কাটছেন। ধান একটু ভেজা থাকায় বাজারে দাম নেই। এক মণ ধান ৪০ কেজি। কিন্তু ভেজা থাকায় পাইকাররা ৫ কেজি করে বেশি নেয়। তিনি ৪৫ কেজি ধান ৮০০ টাকায় বিক্রি করেছেন। তিনি বলেন, ‘আমাদের দুঃখের কথা কেউ ভাবে না, শোনে না। ভবিষ্যতে সম্ভবত ধান চাষ বাদ দিতে হবে।’
ধানের দাম কমে যাওয়ায় হতাশা প্রকাশ করেছেন ঝিনাইগাতীর নলকুড়া গ্রামের কৃষক আব্দুর রহমান। তিনি বলেন, ‘ধারদেনা করে ধান চাষ করছি। অহন ধানের দাম নাই, ঋণের টাকা শোধ করাই কঠিন হয়ে যাবে। তাই দুশ্চিন্তায় আছি।’

ঝিনাইগাতী উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা ফরহাদ হোসেনের ভাষ্য, তাঁর উপজেলায় ১৪ হাজার ৬০০ হেক্টর জমিতে বোরো ধান চাষ হয়েছে। এর মধ্যে সাম্প্রতিক অতিবৃষ্টিতে বিনষ্ট হয়েছে প্রায় ১৪ হেক্টর জমির ধান। তিনি বলেন, বর্তমানে শ্রমিকের মজুরি অনেক বেশি। বাজারে ধানের দাম কম। খাদ্য বিভাগ সরকারি মূল্যে ধান কেনার জন্য কৃষকের তালিকা করছে। সেখানে আবেদন করে ধান দিতে পারলে কৃষক ন্যায্য মূল্য পাবেন।
নকলা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা আবদুল ওয়াহেদ খান বলেন, মাঠ পর্যায়ে শ্রমিক ও উৎপাদন খরচের তুলনায় বাজারে ধানের দাম কম। আবহাওয়ার কারণেও কৃষকের সমস্যা হচ্ছে। 
ধানের বাজার কৃষকের অনুকূলে আনতে শেরপুর কৃষি বিপণন অধিদপ্তর কী করছে? এই প্রশ্নের জবাবে ওই অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক ফাতেমা খাতুন জানান, বাজারে দাম কম, তাই তারা সরকার নির্ধারিত ১ হাজার ৪৪০ টাকা দরে ধান বিক্রি করার জন্য কৃষকদের পরামর্শ দিচ্ছেন। ধানের প্রতিদিনের বাজার দর সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠাচ্ছেন তারা। ন্যায্য মূল্য প্রাপ্তির বিষয়টি তাদের হাতে নেই।
শেরপুর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক সাখাওয়াত হোসেনের ভাষ্য, সাম্প্রতিক বৈরী আবহাওয়ার কারণে জেলায় ২৪৫ হেক্টর জমির আংশিক ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ধান কাঁচা, তাই বাজারে দাম পাচ্ছেন না কৃষক। সব জায়গায় একসঙ্গে ধান কাটা শুরু হওয়ায় বাজারে প্রভাব পড়েছে।

আরও পড়ুন

×