গাইবান্ধায় দেড় কোটি টাকা নিয়ে উধাও ‘আল আনসার ওয়েলফেয়ার’
এনজিওর অর্থ আত্মসাতের ঘটনায় চরম বিপাকে পড়েছেন গ্রামের ভুক্তভোগীরা। ছবি: সমকাল
গাইবান্ধা প্রতিনিধি
প্রকাশ: ০৬ মে ২০২৬ | ১৬:২৯ | আপডেট: ০৬ মে ২০২৬ | ১৭:৫৭
গাইবান্ধায় বিনামূল্যে পাকা ঘর, নলকূপ ও গবাদিপশু দেওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে সহস্রাধিক পরিবারের কাছ থেকে অন্তত দেড় কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে ‘আল আনসার ওয়েলফেয়ার ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ’ নামের একটি সামাজিক সংগঠনের বিরুদ্ধে।
প্রতিষ্ঠানটির পরিচালক মাওলানা শহিদুল ইসলাম এই বিপুল অর্থ আত্মসাৎ করে গা-ঢাকা দিয়েছেন। অর্থ খুইয়ে এ ঘটনার বিচার ও অর্থ ফেরতের দাবি জানিয়েছেন ভুক্তভোগীরা।
ভুক্তভোগী ও স্থানীয়দের বরাতে জানা গেছে, অভিযুক্ত শহিদুল ইসলাম বগুড়া সদরের বৃন্দাবন পাড়ার আকবর আলীর ছেলে। তিনি গাইবান্ধা সদর উপজেলার বল্লমঝাড় ইউনিয়নের মধ্য নারায়ণপুর এলাকার একটি মহিলা মাদ্রাসার অধ্যক্ষ মাওলানা আল আমিনের সঙ্গে সখ্যতা গড়ে তুলে এলাকায় যাতায়াত শুরু করেন। নিজেকে একটি বড় সংগঠনের কর্মকর্তা পরিচয় দিয়ে তিনি সাধারণ মানুষের আস্থা অর্জন করেন।
অভিযুক্ত শহিদুল ইসলাম শুধু সদর উপজেলা নয়, গাইবান্ধার পলাশবাড়ী ও ফুলছড়ি উপজেলাতেও একইভাবে কয়েক হাজার মানুষের কাছ থেকে প্রায় দুই কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।
সরেজমিনে জানা যায়, মধ্য নারায়ণপুর এলাকায় পাকা ঘরের বদলে আটটি ঘরের শুধু চালা বসিয়েই কাজ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। খোলাবাড়ি গ্রামের ভুক্তভোগী বজলার রহমান বলেন, ‘ঘর পাওয়ার আশায় ধারদেনা করে শহিদুল ইসলামকে টাকা দিয়েছিলাম। এখন তিনি পলাতক। আমরা কীভাবে এই ক্ষতি সামাল দেবো জানি না।'
আরেক ভুক্তভোগী জামের তল গ্রামের সোহেল মিয়া জানান, ‘হুজুরকে বিশ্বাস করে বিরাট ভুল করেছি। তিনি যে এভাবে টাকা নিয়ে পালিয়ে যাবেন, কল্পনাও করিনি। কীভাবে টাকা ফেরত পাওয়া যাবে, তাও জানি না। স্থানীয় আল আমিন হুজুরের মাধ্যমে আমরা শহিদুল হুজুরকে টাকা দিয়েছি।'
এই ঘটনায় মধ্যস্থতাকারী হিসেবে প্রতারিত হয়েছেন বলে দাবি করেছেন মাদ্রাসার অধ্যক্ষ হাফেজ আল আমিন। তিনি জানান, তার মাধ্যমে ৩৬৬ ব্যক্তির টাকা শহিদুল ইসলামের হাতে গেছে। ২০ হাজার করে হলেও টাকার অংকে যার পরিমাণ দাঁড়ায় ৭৩ লাখ ২০ হাজার টাকা। বিপুল পরিমাণ টাকার পাওনাদারদের চাপে এবং টাকা উদ্ধারের আশায় তিনি আদালতে মামলা করেছেন।
এ ব্যাপারে অভিযুক্ত মাওলানা শহিদুল ইসলামের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও মুঠোফোন বন্ধ থাকায় তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
এর আগে গত ১ মে উচ্চ মুনাফা ও সহজ শর্তে ঋণ দেওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে গ্রাহকদের কাছ থেকে কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়ে উধাও হয়ে যায় ‘তিশা ফাউন্ডেশন’ নামে একটি এনজিও। এতে শতাধিক গ্রাহক চরম বিপাকে পড়েছেন। এই এনজিওর পরিচালক জসিম মিয়া সাতদিনের মধ্যেই কোটি টাকা আত্মসাৎ করে কর্মকর্তাসহ পালিয়ে যান।
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, ১০ হাজার টাকা সঞ্চয়ে ১ লাখ এবং ১ লাখ টাকায় ১০ লাখ পর্যন্ত ঋণ দেওয়ার আশ্বাস দিয়ে বিভিন্ন ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে গিয়ে গ্রাহকদের কাছ থেকে টাকা সংগ্রহ করে সংস্থাটির কর্মকর্তারা। নির্ধারিত সময়ে ঋণ নিতে এনজিওর ভাড়া করা কার্যালয়ে গিয়ে গ্রাহকেরা দেখেন, অফিসে তালা ঝুলছে। কর্মকর্তারাও লাপাত্তা। বাড়ির মালিক সাইফুল ইসলাম তাদের কোনো পরিচয়ই দিতে পারেননি। তার নিজের ছেলে এই প্রতারণার সঙ্গে জড়িত বলে দাবি ভুক্তভোগীদের।
পরদিন ২ মে ভুক্তভোগীদের পক্ষে গাইবান্ধা সদর থানায় প্রতিকার চেয়ে লিখিত অভিযোগ করেন গাইবান্ধা শহরের সবুজ পাড়ার স্যানিটারি ব্যবসায়ী রতন মিয়া।
এ ব্যাপারে জানতে তিশা ফাউন্ডেশনের ব্রাঞ্চ ম্যানেজার জসিম মিয়ার মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগ করা হলেও তার সংযোগটি বন্ধ পাওয়া যায়।
গাইবান্ধা সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আব্দুল্লাহ আল মামুন বলেন, 'প্রতারকচক্রটিকে শনাক্ত ও গ্রেপ্তারে কাজ চলছে। দ্রুত তাদের আইনের আওতায় আনা হবে।'
গাইবান্ধা সামাজিক সংগ্রাম পরিষদের আহ্বায়ক সিরাজুল ইসলাম বাবু বলেন, এ ধরনের প্রতারণা ঠেকাতে পুলিশের পাশাপাশি সামাজিক সচেতনতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এক্ষেত্রে সমাজের সব শ্রেণি-পেশার মানুষের মাঝে সচেতনতা বৃদ্ধি করা প্রয়োজন।
গাইবান্ধার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম) শরীফ আল রাজিব বলেন, ‘এসব থেকে সবাইকে সচেতন থাকতে হবে। এর আগে তিশা ফাউন্ডেশনের প্রতারণার ঘটনায় সদর থানায় অভিযোগ এসেছে। আমরা ঘটনা তদন্ত করে আসামিদের আইনের আওতায় আনার কাজ করছি। আল আনসার ওয়েলফেয়ার ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ’ নামের প্রতিষ্ঠানের প্রতারণার বিষয়টি জানা নেই। ভুক্তভোগীদের পক্ষ থেকে লিখিত অভিযোগ পেলে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে এবং প্রত্যেক অপরাধীকে গ্রেপ্তার করা হবে।
