সুনামগঞ্জের হাওর
ঋণ আতঙ্কে কৃষক, বাড়ি ছাড়ার চিন্তা
সংসারের খরচ সামলানো নিয়ে শঙ্কা
সাত একর জমির সবটুকুই ডুবে যাওয়ায় এখন অন্যের ধান শুকাতে কাজ করেন ইনচান আলী। গতকাল বৃহস্পতিবার বিকেলে দেখার হাওরের রৌয়ারপাড় এলাকা থেকে তোলা- সমকাল
পঙ্কজ দে, সুনামগঞ্জ
প্রকাশ: ০৮ মে ২০২৬ | ০৮:৪৫ | আপডেট: ০৮ মে ২০২৬ | ২১:১৮
| প্রিন্ট সংস্করণ
দীর্ঘ এক মাসের বেশি বৃষ্টি শেষে হাওরে এখন ঝলমলে রোদ। তবে সেই রোদ কৃষকের মনে শুধু কষ্ট বাড়িয়ে দিচ্ছে। স্বপ্নের বোরো ফসল ডুবে যাওয়ায় তা এখন কোনো কাজেই আসছে না। হাওরের ধান কাটা পর্বও প্রায় শেষ পর্যায়ে। অনেকেই নষ্ট হয়ে যাওয়া ধান থেকে যেটুকু পারছেন, তাই রোদে শুকিয়ে নিচ্ছেন। তবে কৃষকের মনে এখন ভর করেছে ঋণ আতঙ্ক। ঋণ করে চাষাবাদ করায় আগেভাগে ঘরবাড়ি ছাড়ার পরিকল্পনা করছেন তাদের কেউ কেউ।
এ অবস্থা সুনামগঞ্জের হাওরাঞ্চলে বিভিন্ন উপজেলায়। কৃষকরা বলেছেন, এক একর জমি করতে ৫০ হাজার টাকা খরচ হয়। বর্গা চাষিদের অনেকে ৮-১০ একর জমিও করেছেন। যারা বেশি জমি করেছেন, তারা বেশি ঋণ করেছেন। ঋণের চাপে এদের অনেকে এলাকা ছেড়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
গতকাল বৃহস্পতিবার দুপুরে সুনামগঞ্জের সদর উপজেলার মোল্লাপাড়া ইউনিয়নের দেখার হাওরের রৌয়ারপাড় এলাকায় সড়কের পাশে অল্প পরিমাণ ধান শুকাচ্ছিলেন হাছনপছন্দ গ্রামের ইনচান আলী। তিনি এবার প্রায় আট একর জমি করেছিলেন। ধান কেমন পেয়েছেন– জানতে চাইলে ইনচান আলী বলেন, এক কাঠা জমিও কাটতে পারিনি। শিয়ালমারা হাওরে জমি করেছিলাম। সব পানির নিচে ডুবে গেছে। জমি করার আগে বিভিন্ন জনের কাছ থেকে সাড়ে পাঁচ লাখ টাকা ঋণ করে চাষবাস করেছি।
এত টাকা কেন ঋণ করলেন, এখন দেবেন কীভাবে– জানতে চাইলে এই কৃষক বলেন, দুর্ঘটনায় আহত হয়েছিলাম, চিকিৎসা খরচ এবং জমিজমা চাষবাস করার খরচ মেটাতে এই ঋণ হয়েছে। ৬০০-৭০০ মণ ধান পেতাম। ঋণ শোধ করতে সমস্যা হতো না। ধান না পাওয়ায় মাথায় আকাশ ভেঙে পড়েছে। ওখানে যে ধান নাড়াচাড়া করছি দেখছেন, এগুলো অন্যজনের। আমি কোনো ধান কেটে আনতে পারিনি। অবসর আছি এ জন্য অন্যদের সাহায্য করছি।
তিনি আরও জানান, শিয়ালমারা হাওরে কোনো কৃষকের জমিই কেটে ধান আনতে পারেননি। যে ধান শুকাতে দেখছেন, এগুলো রৌয়ার হাওরের।
কথা বলার এক পর্যায়ে চোখের পানি ঝরছিল ইনচান আলীর। বললেন, আজকেও এক পাওনাদার এসে তুছতাছ (রাগ দেখানো) করে গেছে। তাকে এক লাখ টাকায় ২৫ মণ লাভের ধান এবং নগদ আরও এক লাখ ফেরত দেওয়ার কথা ছিল। বলেছিলাম, বাঁচলে টাকা পাবেন। সে রাগ করেছে। যে যন্ত্রণায় পড়ছি, চট্টগ্রাম বা কক্সবাজারে ছেলেকে নিয়ে চলে যাব।
ছেলেমেয়ে কয়জন জানতে চাইলে বললেন, পাঁচ ছেলেমেয়ের মধ্যে বড় ছেলেটি ১৭ বছরের। দশম শ্রেণিতে পড়ত। তাকে পড়ালেখা ছাড়িয়ে আমার সঙ্গে নিয়ে যাব। অষ্টম শ্রেণিতে পড়ুয়া মেয়ে পড়াও ছাড়িয়ে দেব। অন্য দুই ছেলেমেয়ে মাদ্রাসায় পড়ে। ছোট ছেলে প্রথম শ্রেণিতে পড়ে। তাদের মায়ের সঙ্গে বাড়িতে রেখে যাব।
পাশের গ্রাম গুয়ারছুড়ার সাহেব আলী নামে আরেক কৃষক জানালেন, সাড়ে তিন লাখ টাকা ঋণ করে জমি করেছেন। অর্ধেক জমিও কাটা হয়নি। যে ধান পেয়েছেন, তাতে ঋণ দেওয়াই সম্ভব নয়, সারা বছর সাতজনের সংসার চালাবেন কী করে?
গত বুধবার এই কৃষক ধান শুকানোর মাঠে হঠাৎ জ্ঞান হারান। সুনামগঞ্জ সদর হাসপাতালে নেওয়ার পর চিকিৎসকরা বলেছেন, দুশ্চিন্তায় তাঁর এমন অবস্থা হয়েছে। সাহেব আলী জানালেন, এলাকা ছেড়ে চলে যাওয়া ছাড়া আর কোনো গতি নেই।
গুয়ারছুড়ার গ্রামের নূর আলী, মাসুক মিয়া ও রইছ মিয়ার অবস্থাও একই রকম। এই কৃষকরা জানালেন, গুয়ারছুড়া, রৌয়ারপাড় ও হাছনপছন্দ এলাকায় অন্তত ২০ জন বর্গা চাষি ঋণ করে চাষবাস করে এমন বিপদে পড়েছেন।
এই গ্রামগুলোর কৃষকরা জানালেন, এই কঠিন অবস্থার মধ্যেও বেসরকারি ঋণদান সংস্থার ‘কিস্তি আপারা’ কিস্তি তুলতে বাড়ি বাড়ি যাচ্ছেন। এক কিষানি জানান, আজ (বৃহস্পতিবার) সকালেও টিএলএমএস নামের একটি উন্নয়ন সংগঠনের কর্মী কিস্তি নেওয়ার জন্য বাড়িতে এসেছেন। সব ধান পানির নিচে গেছে, টাকাপয়সা নেই বলায় উত্তেজিত হয়ে কিস্তি আপা বলেছেন, ধান গেলেও কিস্তি দিতে হবে।
ওই এলাকা থেকে কিস্তি তুলে সড়ক দিয়ে যাওয়ার সময় এই প্রতিবেদককে কৃষকরা উন্নয়ন সংগঠনের ওই কর্মী একা বেগমকে দেখিয়ে দেন। পরিচয় দিয়ে কিষান ও কিষানিরা এই দুঃসময়ে আপনাদের কিস্তি কীভাবে দেবে– জানতে চাইলে একা বেগম বলেন, এই এলাকায় আমাদের ছয় কোটি টাকা ঋণ দেওয়া আছে। কিস্তি দেবে না এখনও কেউ জানায়নি। তাছাড়া আমরা প্রবাসী ও কৃষি দুই ধরনের ঋণ দিয়ে থাকি বলেই অটোরিকশায় উঠে দ্রুত এলাকা ছাড়েন তিনি।
কৃষকরা জানান, সবাইকে ব্র্যাক, আশাসহ অন্য উন্নয়ন সংস্থার কিস্তিও দেওয়া লাগছে। জেলার মধ্যনগর উপজেলার বাসিন্দা হাওরের কৃষি ও কৃষক বাঁচাও সংগ্রাম পরিষদের সুনামগঞ্জ জেলার আহ্বায়ক চিত্তরঞ্জন তালুকদার বলেন, ‘টানে ও লামায় (নিচু এলাকায়) দুই এলাকায়ই কৃষকরা জমি করেন। যারা কেবল নিচু এলাকায় জমি করেছেন, তারা এলাকা ছেড়ে পালানো ছাড়া উপায় নেই।’
সুনামগঞ্জ জেলায় কৃষক রয়েছেন প্রায় চার লাখ। অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক মতিউর রহমান খান সমকালকে বলেন, তারা ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তালিকা করার কাজ করছেন। সরকার তাদের সহায়তা দেবে। এখন পর্যন্ত প্রাপ্ত তথ্যে ৯৮ হাজার কৃষকের নামের তালিকা হয়েছে। তালিকাকরণের কাজ চলছে। যাচাই-বাছাই শেষে ক্ষতিগ্রস্তের তালিকা চূড়ান্ত করা হবে।
